রংপুর: লালমনিরহাটের সিন্দুরমতি দিঘি খনন করে অভাবনীয় প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন উদ্ধার হয়েছে। চলমান খননকাজ চালানোর সময় স্থানীয়রা প্রাচীন মূর্তি, মূল্যবান মুদ্রা ও পোড়ামাটির তৈরি গৃহস্থালি সামগ্রী দেখতে পান। পরে প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের একটি বিশেষজ্ঞ দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে এবং দিঘির তলদেশে চারটি প্রাচীন ইটের তৈরি ঘাট আবিষ্কার করে। নির্মাণশৈলী ও কারিগরি দক্ষতা বিশ্লেষণ করে বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন, এই স্থাপনাগুলো প্রায় ৮০০ বছর পুরনো, যা ইতিহাসের এক উল্লেখযোগ্য নিদর্শন।
৮০০ বছরের পুরনো ইতিহাসের রহস্য উন্মোচন
বছরের পর বছর ধরে পলি জমার কারণে অগভীর হয়ে পড়া জলাশয়টি পুনরুদ্ধারের জন্য জেলা প্রশাসনের তরফে চলমান খনন কাজ চলছে। কর্তৃপক্ষ তীরগুলো প্রশস্ত করার, আশেপাশের অঞ্চলের উন্নতি এবং সাইটের চারপাশে পর্যটন অবকাঠামো বিকাশের পরিকল্পনাও করেছে। সম্প্রতি রংপুর বিভাগীয় প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের একটি দল সরেজমিনে এই দিঘি পরিদর্শন করে। তারা নিচে চারটি প্রাচীন ইটের ঘাট খুঁজে পান। প্রতিটি ঘাট প্রায় ১৮ ফুট চওড়া এবং ৬৮ ফুট লম্বা।
প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের ফিল্ড অফিসার আবু সাঈদ ইনাম তানভিরুল ইসলাম এই আবিষ্কারের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘আমরা চারটি প্রাচীন ইটের ঘাট খুঁজে পেয়েছি। এগুলোর নির্মাণশৈলী দেখে মনে হচ্ছে, এটি ৮০০ বছরের পুরনো স্থাপনা।’
প্রায় ১৬ একর আয়তনের এই দিঘি এখন উপজেলার পঞ্চগ্রাম ইউনিয়নের সিন্দুরমতি গ্রামে অবস্থিত। খননকাজের সঙ্গে জড়িত স্থানীয়রা জানান, পলি জমে দিঘি ভরাট হয়ে গিয়েছিল। পানি সংরক্ষণ ও দর্শনার্থীদের জন্য আকর্ষণ তৈরি করতে প্রশাসন এই খনন শুরু করে।
প্রাচীন নিদর্শন: মুদ্রা থেকে মূর্তি
খননের সময় আবিষ্কৃত মূল্যবান প্রত্নবস্তুগুলোর মধ্যে রয়েছে, বিভিন্ন ধাতব ও পাথরের মূর্তি ও প্রতিকৃতি, তামা ও রৌপ্যের তৈরি বহু মূল্যবান প্রাচীন মুদ্রা, পিতল, ব্রোঞ্জ ও মাটির তৈরি হাঁড়ি, কলসি ও অন্যান্য সামগ্রীসহ বিভিন্ন গৃহস্থালি সামগ্রী।
প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের রংপুরের সহকারী প্রত্নতাত্ত্বিক প্রকৌশলী হাসনুল হাবিব সারাবাংলাকে জানান, উদ্ধারকৃত বেশিরভাগ নিদর্শন স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে রয়েছে। তবে যেগুলো তারা সংগ্রহ করতে পেরেছেন, সেগুলো বিশ্লেষণ করে জাদুঘরে সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
সরকারি তথ্য বলছে, ১৯৭৫ সালে সরকারি উদ্যোগে এই দিঘি সংস্কারের সময়ও প্রাচীন মুদ্রা ও মূর্তি পাওয়া গিয়েছিল, যা বর্তমানে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে। এটি প্রমাণ করে যে, এই অঞ্চলটি একসময় সভ্যতা ও বাণিজ্যের কেন্দ্র ছিল।
জনশ্রুতি ও ঐতিহ্য: সিন্দুরমতি নামের ইতিহাস
এই দিঘি ঘিরে রয়েছে হৃদয়গ্রাহী ইতিহাস ও লোকশ্রুতি। ইতিহাস অনুসারে, জমিদার রাজ নারায়ণ চক্রবর্তী এলাকার জলকষ্ট দূর করতে এই দিঘি খনন করেছিলেন। কিন্তু খননের পর দিঘিতে পানি উঠছিল না। স্বপ্নাদেশ পেয়ে তিনি রাম নবমীর দিন দিঘির মাঝখানে পূজার আয়োজন করেন। পূজা শেষ হওয়ার আগেই হঠাৎ তীব্র বেগে পানি উঠতে থাকে। সবাই তীরে উঠলেও জমিদারের দুই কন্যা ‘সিন্দুর’ ও ‘মতি’ পানিতে তলিয়ে যান এবং দেবত্ব প্রাপ্ত হন বা মারা যান। তাদের নাম অনুসারেই দিঘির নাম হয় সিন্দুরমতি।
ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক তাৎপর্য
সিন্দুরমতি দিঘি হিন্দু সম্প্রদায়ের কাছে একটি পবিত্র তীর্থস্থান হিসেবে বিবেচিত। প্রতি বছর চৈত্র মাসের রাম নবমী উপলক্ষ্যে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ভক্তরা এখানে সমবেত হন এবং পুণ্য স্নান করেন। পাশাপাশি এখানে সিন্দুরমতি মন্দির, শিব মন্দির ও কালী মন্দিরের মতো বেশ কয়েকটি মন্দির স্থাপিত হয়েছে, যা এই এলাকাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে পরিণত করেছে। আশি বছর বয়সী স্থানীয় শিক্ষক হরগোবিন্দ বর্মণ সারাবাংলাকে বলেন, ‘সিন্দুরমতি দিঘি শুধু একটি জলাশয় নয়, এটি আমাদের বিশ্বাস, ঐতিহ্য ও ইতিহাসের অংশ।’
পর্যটন কেন্দ্রে রূপান্তরের পরিকল্পনা
লালমনিরহাটের জেলা প্রশাসক মুহাম্মদ রাশেদুল হক প্রধান সারাবাংলাকে বলেন, ‘খনন ও সংস্কার কাজ শেষে এখানকার চারপাশের পরিবেশ সুন্দর করে গড়ে তোলা হবে। আমরা এটিকে একটি পূর্ণাঙ্গ পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছি।’
লালমনিরহাটের সদর উপজেলার সংসদ সদস্য দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু সারাবাংলাকে বলেন, ‘এই স্থানটিকে উন্নত পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সরকার এরই মধ্যে এখানকার জমি দখলমুক্ত করতে এবং দর্শনার্থীদের জন্য নিরাপত্তা জোরদারে উদ্যোগ নিয়েছে।’