প্রতিরক্ষা খাতে প্রতিবছর বিপুল অর্থ ব্যয় এবং অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা মোকাবিলায় কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে সৌদি আরব।
দেশটির বিমানবন্দর, তেল শোধনাগার, পাইপলাইনসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হিমশিম খাচ্ছে রিয়াদ।
বিশেষ করে রাজধানীর প্রধান বিমানবন্দরে সাম্প্রতিক হামলার খবর সৌদি আরবের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। সামরিক শক্তিতে এগিয়ে থাকলেও বিস্তীর্ণ ভূখণ্ডের সব গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা একযোগে সুরক্ষিত রাখা দেশটির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (সিপ্রি) হিসাবে, গত বছর প্রতিরক্ষা খাতে প্রায় ৮ হাজার ৩০০ কোটি ডলার ব্যয় করেছে সৌদি আরব। সামরিক ব্যয়ে বিশ্বের শীর্ষ দেশগুলোর অন্যতম রিয়াদ।
দেশটির অস্ত্রভান্ডারে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান, প্যাট্রিয়ট ও থাড ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা। পাশাপাশি ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্য থেকে সংগ্রহ করা বিভিন্ন আধুনিক অস্ত্রও রয়েছে।
তবে সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, সৌদি আরবের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা এর বিশাল ভৌগোলিক বিস্তৃতি। রাজধানী, বিমানবন্দর কিংবা একটি তেল শোধনাগার রক্ষার পাশাপাশি দেশজুড়ে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হচ্ছে দেশটিকে।
পূর্ব দিক থেকে ইরান, উত্তর দিক থেকে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী এবং দক্ষিণে ইয়েমেনের হুতিদের সম্ভাব্য হামলা মোকাবিলায় প্রতিরক্ষাব্যবস্থা বিভিন্ন অঞ্চলে ভাগ করে রাখতে হচ্ছে।
ফলে সব স্থাপনায় সমান নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, হুতিরা এখন শুধু প্রচলিত ক্ষেপণাস্ত্রের ওপর নির্ভর করছে না। ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ও দূরপাল্লার ড্রোন একসঙ্গে ব্যবহার করে প্রতিপক্ষের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে চাপে রাখার কৌশল নিয়েছে তারা।
এই কৌশলের সঙ্গে ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার ব্যবহৃত পদ্ধতির মিল রয়েছে। সেখানে একযোগে বিপুলসংখ্যক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে ব্যস্ত রাখা হয়।
ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র তুলনামূলক নিচু দিয়ে উড়তে পারে। ফলে কিছু পরিস্থিতিতে রাডারের মাধ্যমে সেগুলো শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
অন্যদিকে হুতিদের দাবি, তাদের নতুন প্রজন্মের কিছু ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র গতিপথ পরিবর্তন করে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বের কোনো আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থাই শতভাগ হামলা প্রতিহত করার নিশ্চয়তা দিতে পারে না। ফলে অধিকাংশ ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন ধ্বংস করা সম্ভব হলেও অল্প কয়েকটি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানলে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে।
ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ইরানের ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ রয়েছে।
জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞদের অতীতের বিভিন্ন প্রতিবেদনে ইয়েমেনে উদ্ধার করা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের যন্ত্রাংশের সঙ্গে ইরানি প্রযুক্তির মিল পাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া হুতিদের কাছে অস্ত্র, প্রযুক্তি, অর্থ ও প্রশিক্ষণ পৌঁছানোর বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকেরা।
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, হুতিদের ব্যবহৃত ‘হাতেম-২’ ও ‘প্যালেস্টাইন-২’ ক্ষেপণাস্ত্রের নকশায় ইরানি প্রযুক্তির প্রভাব রয়েছে।
এর আগে হুতিদের একটি ক্ষেপণাস্ত্র ইসরায়েলের বেন গুরিয়ন বিমানবন্দরের কাছে আঘাত হানার ঘটনায় তাদের দূরপাল্লার হামলার সক্ষমতা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনা তৈরি হয়েছিল।
তবে হুতিদের সব অস্ত্রের সক্ষমতা ও প্রযুক্তিগত বৈশিষ্ট্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
হুতিরা মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর অন্যতম। তবে তেহরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকলেও ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও আঞ্চলিক সংঘাত নিয়ে তাদের নিজস্ব লক্ষ্য রয়েছে।
২০১৫ সালে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে হস্তক্ষেপ করার পর দুই পক্ষের মধ্যে দীর্ঘ সংঘাত শুরু হয়।
২০২২ সালে যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে সংঘাতের তীব্রতা কিছুটা কমলেও স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধান আসেনি।
সাম্প্রতিক উত্তেজনার মধ্যে হুতিরা সৌদি সামরিক অভিযান বন্ধ এবং ইয়েমেনের ক্ষয়ক্ষতির জন্য ক্ষতিপূরণ দাবি করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে ইরান দুই পক্ষের মধ্যে মধ্যস্থতার আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন, সৌদি আরব ও হুতিদের মধ্যে আলোচনা শুরু করতে প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে তেহরান প্রস্তুত।
তবে হুতিদের রাজনৈতিক ব্যুরোর সদস্য মোহাম্মদ আল-বুখাইতির বক্তব্য অনুযায়ী, স্বল্পমেয়াদি যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে।
চলমান নিরাপত্তাঝুঁকি শুধু সৌদি আরবের সামরিক স্থাপনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। দেশটির অর্থনৈতিক উন্নয়ন পরিকল্পনাও নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।
যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের ‘ভিশন ২০৩০’ পরিকল্পনার অন্যতম লক্ষ্য তেলনির্ভরতা কমিয়ে সৌদি আরবকে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ, পর্যটন ও প্রযুক্তির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত করা।
এ লক্ষ্যে দেশটিতে বিমানবন্দর, পর্যটনকেন্দ্র, তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামো ও শিল্পকারখানায় বিপুল বিনিয়োগ করা হচ্ছে।
কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলার আশঙ্কা দীর্ঘস্থায়ী হলে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
বিশেষ করে বিমানবন্দর, তেল স্থাপনা, পানি শোধনাগার ও ডেটা সেন্টারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সৌদি সরকারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ইয়েমেনের পাহাড়ি ভূখণ্ড এবং হুতিদের দীর্ঘ যুদ্ধের অভিজ্ঞতা সৌদি আরবের জন্য বাড়তি চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, শুধু বিমান হামলার মাধ্যমে হুতিদের সামরিক সক্ষমতা পুরোপুরি ধ্বংস করা কঠিন। অতীতেও দীর্ঘ সামরিক অভিযানের পর গোষ্ঠীটি নিজেদের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় হুতিদের বিভিন্ন সামরিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত এবং কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ কমান্ডার নিহত হলেও গোষ্ঠীটির সামগ্রিক কার্যক্রম বন্ধ হয়নি।
এ কারণে বড় ধরনের স্থল অভিযান কিংবা বিমান হামলা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নতুন করে সংঘাত বিস্তারের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
হুতিদের হামলা মোকাবিলায় আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক মিত্রদের সহায়তা বাড়ানোর চেষ্টা করছে সৌদি আরব।
তবে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সংঘাতে বিপুল পরিমাণ আকাশ প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ব্যবহৃত হওয়ায় নতুন অস্ত্র সরবরাহেও সীমাবদ্ধতা তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, সৌদি আরবের সামনে এখন দুটি কঠিন পথ রয়েছে। একদিকে পাল্টা হামলা জোরদার করে হুতিদের সামরিকভাবে দুর্বল করার চেষ্টা, অন্যদিকে আলোচনার মাধ্যমে সংঘাত নিয়ন্ত্রণে আনা।
প্রথম পথ বেছে নিলে আরও ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। আর সমঝোতায় গেলে হুতিদের রাজনৈতিক ও সামরিক অবস্থান আরও শক্তিশালী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (সিএসআইএস) বিশ্লেষক মাইকেল র্যাটনির মূল্যায়ন অনুযায়ী, সৌদি আরবের ওপর হামলার রাজনৈতিক জবাব দেওয়ার চাপ থাকলেও শেষ পর্যন্ত কূটনৈতিক সমাধানের পথেই ফিরতে হতে পারে।
ফলে বিপুল সামরিক ব্যয় ও আধুনিক অস্ত্র থাকা সত্ত্বেও সৌদি আরবের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—হুতিদের হামলা প্রতিহত করার পাশাপাশি কীভাবে দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
Scale Your Newsportal
Blazing-fast frontend, robust backend & ad monetization ready.
Scale Your Newsportal
Blazing-fast frontend, robust backend & ad monetization ready.