ওয়াই কম্বিনেটরের ২০২৬ প্রতিযোগিতার ফল ব্যাচে জায়গা পেয়েছে সান ফ্রান্সিসকোভিত্তিক স্টার্টআপ টিলিয়ন। এর চার সহপ্রতিষ্ঠাতা হলেন মো. শাহরিয়ার ইসলাম আরহাম, কাজী ফারদিনুল হক, আরমান লুথরা ও আব্দুল বাছিত তন্ময়। চারজনের মধ্যে তিনজনই বাংলাদেশি। তাঁদের লক্ষ্য এআই এজেন্ট যেন মানুষের মতোই নির্বিঘ্নে ওয়েবে কাজ করতে পারে।
ভাবুন তো, প্রতিদিন সকালে আপনাকে ১০টি ওয়েবসাইটে লগইন করতে হয়। একই ফরম পূরণ করতে হয় বারবার। এক পাতা থেকে তথ্য তুলে আরেক পাতায় বসাতে হয়। কাজগুলো কঠিন নয়, কিন্তু একঘেয়ে আর সময়খেকো। এই কাজ এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) এজেন্টকে দিয়ে করানোর চেষ্টা চলছে বিশ্বজুড়ে। কিন্তু একটি–দুটি নয়, একসঙ্গে হাজার হাজার এজেন্ট যখন ওয়েবে নামে, তখনই গোলমাল বাধে। এই জট খোলার কাজ করছে টিলিয়ন। আর সেই দলের চার সদস্যের তিনজনই বাংলাদেশের তরুণ।
বিশ্বের অন্যতম নামী স্টার্টআপ একসিলারেটর ওয়াই কম্বিনেটর (ওয়াইসি) টিলিয়নকে বেছে নিয়েছে তাদের ২০২৬ সালের ফল ব্যাচে। এয়ারবিএনবি, স্ট্রাইপ ও রেডিটের মতো প্রতিষ্ঠানের যাত্রা শুরু হয়েছিল এই ওয়াইসি থেকেই। বাংলাদেশের চালডালও আছে সেই তালিকায়। বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, আবেদনকারীদের মাত্র ১ শতাংশ এখানে সুযোগ পায়।
হাজার হাজার কাজ একসঙ্গে সামলাতে গিয়ে এজেন্টগুলো প্রায়ই আটকে যায়। সাইট লোড হতে দেরি হলে বা ব্রাউজার সেশন অস্থির হলে মাঝপথে কাজ থেমে যায়। টিলিয়ন এই সমস্যার সমাধানে এজেন্টদের জন্য আলাদা ব্রাউজার অবকাঠামো তৈরি করছে। ওয়াইসির প্রোফাইলে একে বলা হয়েছে ‘সেলফ–হিলিং’ বা নিজে নিজে ত্রুটি সারিয়ে নেওয়ার মতো অবকাঠামো। মানুষের তদারকি ছাড়াই এটি প্রতিদিন কয়েক মিলিয়ন এজেন্ট কার্যক্রম চালাতে পারে।
মানুষের জন্য বানানো ওয়েব, এজেন্টের জন্য নয়
ইন্টারনেটের প্রতিটি সাইট তৈরি হয়েছে একটি ধারণা মাথায় রেখে। পর্দার ওপাশে একজন মানুষ বসে আছেন, একটির পর একটি পাতায় ক্লিক করছেন। এআই এজেন্টের কথা সেখানে কেউ ভাবেনি।
ফলে হাজার হাজার কাজ একসঙ্গে সামলাতে গিয়ে এজেন্টগুলো প্রায়ই আটকে যায়। সাইট লোড হতে দেরি হলে বা ব্রাউজার সেশন অস্থির হলে মাঝপথে কাজ থেমে যায়। টিলিয়ন এই সমস্যার সমাধানে এজেন্টদের জন্য আলাদা ব্রাউজার অবকাঠামো তৈরি করছে। ওয়াইসির প্রোফাইলে একে বলা হয়েছে ‘সেলফ–হিলিং’ বা নিজে নিজে ত্রুটি সারিয়ে নেওয়ার মতো অবকাঠামো। মানুষের তদারকি ছাড়াই এটি প্রতিদিন কয়েক মিলিয়ন এজেন্ট কার্যক্রম চালাতে পারে। একটি সেশন বিগড়ে গেলে আরেকটি সেশন কাজটি তুলে নিয়ে এগিয়ে যায়। গ্রাহকেরা এটি ব্যবহার করেন বড় পরিসরে তথ্য সংগ্রহ, স্বয়ংক্রিয় কর্মপ্রবাহ ও নিয়মিত পর্যবেক্ষণের কাজে। একসঙ্গে অসংখ্য ব্রাউজার ভাড়া নেওয়া যায়, আর নিজেদের ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করতে লাগে মাত্র এক লাইন কোড।
এই প্রযুক্তির কেন্দ্রে আছে ‘ফোর্ট্রেস’ নামের একটি ওপেন সোর্স ইঞ্জিন। এটি তৈরি হয়েছে ক্রোমিয়াম ব্রাউজার ইঞ্জিনের ওপর ভিত্তি করে। প্রতিষ্ঠাতাদের যুক্তিটা সরল। ইন্টারনেট মানুষের তৈরি সবচেয়ে বড় সম্পদ অথচ এজেন্টরা সেখানে দ্বিতীয় শ্রেণির ব্যবহারকারী। প্রতিটি এজেন্ট কাজ করে কোনো না কোনো মানুষের হয়েই। তাই এজেন্টকে দূরে রাখা মানে আসলে মানুষকেই বঞ্চিত করা।
টিলিয়নের চার সহপ্রতিষ্ঠাতা মো. শাহরিয়ার ইসলাম আরহাম, কাজী ফারদিনুল হক, আরমান লুথরা ও আব্দুল বাছিত তন্ময়। লুথরা ভারতীয়, অন্য তিনজন বাংলাদেশি। চারজনই কিশোর বয়স থেকে নানা প্রতিযোগিতায় সাফল্য পেয়ে আসছেন।
চারজনের দল, প্রতিপক্ষ ৩০ কোটি ডলারের উদ্যোগ
একই ধরনের কাজ করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান ব্রাউজারবেজ। সর্বশেষ প্রকাশিত হিসাবে তাদের বাজারমূল্য প্রায় ৩০ কোটি ডলার। সেখানে টিলিয়নের দলে সদস্য মাত্র চারজন। তবু কম্পিউটএসডিকের স্বাধীন ও উন্মুক্ত নিয়মে টিলিয়ন একাধিকবার প্রথম হয়েছে, পেছনে ফেলেছে ব্রাউজারবেজকে। টিলিয়নের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী—
ফোর্ট্রেস ব্যবহার করছেন ১৭০টির বেশি প্রতিষ্ঠানের প্রকৌশলী।
পাইপ ও ডকারের উন্মুক্ত পরিসংখ্যান বলছে, ফোর্ট্রেস ডাউনলোড হয়েছে এক লাখের বেশি বার।
ব্যবহারকারীর সংখ্যা এক লাখ ছাড়িয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটি আরও দাবি করেছে, ১০০ কোটি ডলার মূল্যের একটি এআই ল্যাব এবং ফরচুন ৫০০ তালিকার প্রতিষ্ঠানও তাদের প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। টিলিয়নের সহপ্রতিষ্ঠাতা মো. শাহরিয়ার ইসলাম ও কাজী ফারদিনুল হক বলেন, এত ছোট একটি দল বেঞ্চমার্কের শীর্ষে উঠবে, তা কেউ ভাবেনি। হাজার হাজার এজেন্টকে কোনো ব্যর্থতা ছাড়া চালিয়ে যাওয়া তো আরও দূরের কথা ছিল।
কৈশোর থেকেই জয়ের অভ্যাস
টিলিয়নের চার সহপ্রতিষ্ঠাতা মো. শাহরিয়ার ইসলাম আরহাম, কাজী ফারদিনুল হক, আরমান লুথরা ও আব্দুল বাছিত তন্ময়। লুথরা ভারতীয়, অন্য তিনজন বাংলাদেশি। চারজনই কিশোর বয়স থেকে নানা প্রতিযোগিতায় সাফল্য পেয়ে আসছেন।
মো. শাহরিয়ার ইসলাম বিতর্ক, বিজ্ঞান মেলা ও রোবোটিকসে জাতীয় পর্যায়ে চ্যাম্পিয়ন। নিজের লেখা সফটওয়্যারের মাধ্যমে হাজারো শিক্ষার্থীর চাকরির ব্যবস্থা করেছেন। ছাত্রাবাসের কক্ষে বসেই গড়েছেন এমন ব্রাউজার অবকাঠামো, যা টেক্কা দিয়েছে শতকোটি ডলারের প্রতিষ্ঠানকে। পর্দার বাইরে সাংস্কৃতিক আয়োজনে ব্যস্ত থাকেন।
কাজী ফারদিনুল হক এ লেভেলের ফলের ভিত্তিতে জায়গা করে নিয়েছিলেন বিশ্বের সেরা শিক্ষার্থীদের তালিকায়। পরে কাজ করেছেন অ্যামাজন ওয়েব সার্ভিসেসে। সেখানে একটি যন্ত্রে কয়েক শ এআই মডেল চালানো এবং অগ্রণী মডেলকে বাস্তব ব্যবহারে আনার কাজে যুক্ত ছিলেন। ফুটবল তাঁর প্রিয় খেলা।
আরমান লুথরা অলিম্পিয়াডে পদকজয়ী। শতকোটি ডলারের সরকারি বাজেটের পেছনে থাকা রেমিট্যান্স অ্যালগরিদম লিখেছেন তিনি। পরে ওয়াশিংটনের একটি থিঙ্কট্যাংক তাঁকে ডেকে নেয় সবচেয়ে জটিল ডেটা সমস্যা সমাধানের জন্য। অবসরে ছবি আঁকেন।
আবদুল বাছিত অলিম্পিয়াডে জাতীয় পর্যায়ে একাধিক শিরোপা জিতেছেন, নেতৃত্ব দিয়েছেন নটর ডেম কলেজের প্রযুক্তি ক্লাব এনডিআইটিসির। যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াবাশ কলেজে পড়ার সময় জিতেছেন দেশজুড়ে নানা হ্যাকাথন, যার মধ্যে আছে বিশ্বের অন্যতম বড় কলেজ হ্যাকাথন ইউসি বার্কলের ক্যালহ্যাকস। স্নাতক পর্যায়েই প্রকাশ করেছেন এআই গবেষণা। তাঁর তৈরি উন্মুক্ত এআই মডেল রোবটকে তার দেখা, শোনা ও অনুভব করা—সবকিছু মনে রাখতে সাহায্য করে। এর একটি মডেল বৈশ্বিক বেঞ্চমার্কে বিশ্বের শীর্ষ মডেলগুলোর কাতারে উঠেছে। ছবি তুলতে ভালোবাসেন।
বিশ্বজুড়ে এআইয়ে বিনিয়োগ ও গবেষণা বাড়ছে। তাতে শুধু চূড়ান্ত পণ্য নয়, পণ্য বানানোর অবকাঠামো ও ডেভেলপার টুলেরও চাহিদা তৈরি হচ্ছে। টিলিয়ন সেই প্রবণতারই অংশ। ওয়াইসির কর্মসূচির মধ্য দিয়ে এখন প্রযুক্তিটিকে আরও বড় পরিসরে নেওয়ার সুযোগ তাঁদের সামনে।
একঘেয়ে কাজ এজেন্টের, সৃজনশীলতা মানুষের
বিশ্বজুড়ে এআইয়ে বিনিয়োগ ও গবেষণা বাড়ছে। তাতে শুধু চূড়ান্ত পণ্য নয়, পণ্য বানানোর অবকাঠামো ও ডেভেলপার টুলেরও চাহিদা তৈরি হচ্ছে। টিলিয়ন সেই প্রবণতারই অংশ। ওয়াইসির কর্মসূচির মধ্য দিয়ে এখন প্রযুক্তিটিকে আরও বড় পরিসরে নেওয়ার সুযোগ তাঁদের সামনে।
আবদুল বাছিত প্রথম আলোকে বলেন, এআইয়ের পরবর্তী বড় অগ্রগতি আরও বুদ্ধিমান উত্তর নয়; বরং এমন এআই, যা নির্ভরযোগ্যভাবে কাজ করতে পারে। টিলিয়ন সেটাই গড়ছে।
প্রতিষ্ঠাতারা মনে করেন, টিলিয়ন সফল হলে মানুষ ফিরে পাবে সেই ঘণ্টাগুলো, যা নষ্ট হয় বারবার লগইন করতে কিংবা শততমবারের মতো একই ফরম পূরণ করতে। তবে সেই ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে বাস্তব ব্যবহারে প্রযুক্তিটি কতটা নির্ভরযোগ্য ও নিরাপদ থাকে এবং গ্রাহকের চাহিদা কতটা মেটাতে পারে, তার ওপর।
লুথরার কথায় পথটা পরিষ্কার, ‘আমরা এমন একটি পৃথিবী দেখতে পাই, যেখানে একঘেয়ে কাজগুলো করবে এজেন্ট, আর মানুষ সময় দিতে পারবে সৃজনশীলতায়।’
সূত্র: প্রথম আলো · তথ্য-প্রযুক্তি





