৪২ বছর ধরে নদীতে মাছ ধরেও ভাগ্যের পরিবর্তন হয়নি ৫৯ বছরের বৃদ্ধ মেছে রহম আলি শেখের।
৩৮ বছর আগে সাঁড়াশিয়া গ্রামে পৈতৃক বসত বাড়ি যমুনা নদীর করাল গ্রাসে বিলীন হয়ে গেলে এখন পর্যন্ত নিজস্ব জায়গায় বাড়ি না করতে পেরে পরিবার পরিজন নিয়ে বেদুইনের মতো যাযাবর জীবন যাপন করছে রহম আলি শেখ। একাধিকবার তাঁর ওয়ার্ডের পুরুষ ও মহিলা ইউপি সদস্যরা তাঁর জাতীয় পরিচয় পত্র এবং ছবি নিয়ে আশ্রয়ণ প্রকল্পের তালিকায় নামধাম দিলেও ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে অজ্ঞাত কারণে তাঁর মাথা গোঁজার ঠাঁই হয়নি আশ্রয়ণ প্রকল্পের জায়গা এবং একখানা সরকারি পাকা ঘর। বয়সের ভারে নুয়েপড়া রহম আলি এখন ১০ সদস্যের পরিবার নিয়ে ৯ চালা টিনের একখানা ছাপড়া ঘরে কোনোমতে অর্ধাহারে-অনাহারে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে।
বলছিলাম পাবনার বেড়া উপজেলার হাটুরিয়া – নাকালিয়া ইউনিয়নের নতুন পেচাকোলা গ্রামের মৃত জয়নাল বিডিআরের বাড়ির জায়গায় আশ্রয় নিয়ে বসবাসরত মৃত হারেস শেখের সন্তান রহম আলি শেখের কথা। রহম আলি শেখ এ প্রতিবেদককে বলেন তাঁর বয়স যখন ১৬-১৭ বছর তখন থেকে তাঁর বাবার সঙ্গে নদীতে মাছ ধরতে যেত। সেই সময়ে সিরাজগঞ্জের মতি সাহেবের ঘাটে নগেন চৌধুরীর কাছে গাং ঘাইরা ও বাচা মাছ কাল ছাড়া বরশি দিয়ে মাছ ধরার কৌশল তার কাছ থেকে শিক্ষা নেয়। তিনি বলেন প্রায় প্রতিদিন বিকেল থেকে সারারাত ছোট্ট একটি ডিঙি নৌকা করে যমুনা নদীর মধ্যে নোঙর করে হাস-মুরগীর মাংস মসলা দিয়ে সিদ্ধ করে তাঁর সঙ্গে নদীর পানিতে থাকা জলজ প্রাণী মৃত শুশুকের তেল মিশ্রণ করে পানিতে আধার বা চাঁর ফেলে দিলে নদীর পানিতে থাকা গাং ঘাইরা ও বাচা মাছ গুলো আধারের মিষ্টি ঘ্রাণে আধার খেতে খেতে মাছগুলো ঝাকে-ঝাকে উজিয়ে নৌকার কাছে চলে আসে। এ সময় একহাত পরিমাণ নাইলন সুতা দিয়ে তৈরি কালছাড়া হুক সিস্টেম বড়শি দিয়ে খোচা মেরে মেরে মাছগুলো নৌকাতে তোলেন। রহম আলি বলেন এক সময়ে এ পদ্ধতিতে একথেকে তিন ঘন্টার ব্যবধানে একদেরমণ মাছ ধরা পরত। যার বর্তমান বাজার মূল্য প্রতি কেজি ৪০০-৫০০ টাকা দরে বিক্রি হয়। বর্তমানে নদীতে মাছ কমে যাওয়ায় এবং তাঁরমত আরও অনেকেই একই পদ্ধতিতে মাছ ধরার কারণে আগের মতো আর মাছ পাওয়া যায় না। যার ফলে ১০ সদস্যের বড় পরিবারের ভরণ-পোষণ করা তাঁর পক্ষে প্রায় অসম্ভব হয়ে পরেছে। রহম আলীর স্ত্রী সুজাতা খাতুন বলেন, এত বছর ধরে নদীতে মাছ ধরে টাকা পয়সা যা রোজগার করেছে তাঁর সবই সংসারের পিছনে খরচ করেছে। আজ পর্যন্ত একটি টাকাও সঞ্চয় এবং মাথা গোঁজার মতো কোন ঠাঁই করতে পারেনি। ১ বছর হলো তাদের একমাত্র মেয়েটার স্বামী মারা যাওয়ায় ৩ সন্তান নিয়ে বিধবা হয়ে মেয়েটি তাদের এই অভাবী সংসারে এসে অভাবের ওজন আরও ভারী হয়ে গিয়েছে। এ যেন মরার ওপর খাড়ার ঘাঁ। সুজাতা বলেন সংসারে অভাবের কারণে আমি বসে না থেকে মহাজনের কাছ থেকে পাট এনে তা দিয়ে সুতা কেটে মুজুরী হিসেবে যে টাকা পাই তা দিয়ে কোন রকমে দিনাতিপাত চলছে।রহম আলি প্রসঙ্গে পেচাকোলা গ্রামের বাসিন্দা ও হাটুরিয়া নাকালিয়া ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক এমএ ছালাম মোল্লা বলেন, রহম আলির বিষয়ে মানবিক দিক বিবেচনা করে আমরা সরকারি দল হিসেবে সার্বিক সহযোগিতা দেওয়ার চেষ্টা করবো।মেছে রহম আলি শেখের বিষয়ে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান মো.আব্দুল হামিদ সরকারের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি তাকে এমনি চিনি-জানি। আপনার মাধ্যমে জানতে পারলাম তাঁর নিজস্ব কোনো জায়গা জমি নেই। সে আমার কাছে কোনদিন তাঁর এ সমস্যার কথা বা কোন বিষয় নিয়ে আসেননি। তাঁর এ দুরাবস্থা জানলে আরও অনেক আগেই একটা ব্যবস্থা করতাম। তিনি আরও বলেন রহম আলির বিষয়টি খুব তারাতাড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মহোদয়কে আমি অবহিত করব।
