গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে একটি ইটভাটার বিষধোঁয়ায় প্রায় ২০০ বিঘা জমির ধানখেত ছারখার হয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। হঠাৎ নির্গত তীব্র ধোঁয়ার প্রভাবে ধানগাছের পাতা লালচে হয়ে শুকিয়ে যাচ্ছে, নতুন ছড়াও নষ্ট হচ্ছে। এতে ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছেন শতাধিক কৃষক, দেখা দিয়েছে ক্ষোভ ও উৎকণ্ঠা। একই কারণে ভাটাসংলগ্ন এলাকায় গাছ থেকে ছোট ছোট আম ঝরে যাচ্ছে বলেও জানা গেছে।
জানা গেছে, আরবিসি ব্রিকসের এই ভাটার ধোঁয়ায় গত বছরও ধোপাডাঙ্গা এলাকার ধান ও গাছপালা নষ্ট হয়েছিল। ক্ষতিপূরণের আশ্বাস মিললেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। এবারও ভাটা থেকে নির্গত বিষাক্ত ধোঁয়ায় প্রায় ২০০ বিঘা জমির ধানসহ আশেপাশের গাছপালা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ওই ইটভাটার দুই দিকেই আবাদি জমি। পূর্ব এবং পশ্চিম দিকে মানুষের বসতবাড়ি। ধোঁয়ার কারণে ভাটার উত্তর পাশে প্রায় ২০০ বিঘা জমির ধানগাছের পাতা লালচে হয়ে মরে যাচ্ছে। ধানের নতুন ছড়া সাদা হয়ে যাচ্ছে।
এলাকাবাসী জানান, ওই ভাটার পাশে ধানখেতগুলোর ধান আর কিছু দিনের মধ্যই পাকা শুরু হবে। সোমবার ভোরে এলাকাবাসী হঠাৎ গরম অনুভব করেন। অনেকে ঘর থেকে বের হয়ে গরমের সঙ্গে প্রচণ্ড দুর্গন্ধের কারণে বমি অনুভব করেন। পরে দেখা যায় আরবিসি ইটভাটা থেকে ধোঁয়া ছেড়ে দেওয়ায় এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। মঙ্গলবার সকালে এলাকাবাসী দেখেন খেতের ধানগাছের পাতা লালচে আকার ধারণ করেছে। এসব গাছ আস্তে আস্তে মরে যাচ্ছে।
উপজেলার ধোপাডাঙ্গা ইউনিয়নের বজড়া হলদিয়া গ্রামের কৃষক তোফাজ্জল হোসেন অভিযোগ করেন, ওই ভাটার ধোঁয়ায় তাঁর এক বিঘা জমির ধান পুড়ে গেছে। প্রতিবেশী শমসের আলীর ৬৬ শতাংশ, সাবু মিয়ার ২৬ শতাংশ এবং শফিকুলের ১৯ শতাংশ জমির ধান নষ্ট হয়ে গেছে।
ধোপাডাঙ্গার ছাগলকাটি বিলের জোসনা বেওয়া কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘হামি বিধবা, প্রতিবন্দীসহ দুইজন ছোল হামার। সারা বছর জমির ধানের ওপর হামি সব করি। ভাটার ধুমা আসে, হামার সব ধান নষ্ট হয়া গেছে। এখন হামি কী খায়ে বাঁচমো।’
আরেক নারী শরিফা বেগম বলেন, ‘আমার স্বামী কৃষিকাজ করে। এই ভাটার ধোঁয়ার কারণে হামার দুই বিঘা জমির ধান নষ্ট হয়ে গেছে। হামার পাকা আবাদে ইটভাটা মই দিয়ে নষ্ট করার মতো করছে।’
আজাহার নামের আরেক কৃষক বলেন, ‘ওই ইটভাটা বিলের দেড়-দুই বিঘা জমির ধান একবারে পুড়ে ফেলাছে। তোমরা হামাদের ব্যবস্থা করে দেন। ক্ষতিপূরণ না পালে বাবা ছাড়ে দিবা লই।’
এ বিষয়ে আরবিসি ইটভাটার মালিক আলতাফ হোসেনের বক্তব্য নিতে গেলে সাংবাদিকদের উপস্থিতি টের পেয়ে তিনি সটকে পড়েন। পরে তাঁর ব্যবহৃত মুঠোফোনে একাধিবার ফোন দিলেও বন্ধ পাওয়া যায়।
সুন্দরগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রাশিদুল ইসলাম বলেন, কৃষি অফিস থেকে একজন উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাকে ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়েছিল। ইতিমধ্যে ক্ষতি হওয়া ধানের জমিসহ কৃষকদের তালিকা করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, প্রচণ্ড গরমের সময় হঠাৎ বাতাস বইলে ইটভাটার ধোঁয়ায় ফসলের এ ধরনের ক্ষতি হয়। ইটভাটার কাছের জমির ক্ষতি বেশি হয়। ইটভাটার মালিকের সঙ্গে কথা হয়েছে কৃষকদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিষয়ে।
গাইবান্ধা পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক উত্তম কুমার বলেন, ‘এ বিষয়ে অভিযোগ পেয়েছি। কৃষি অফিসারকে সঙ্গে নিয়ে ওই এলাকা পরিদর্শন করে ইটভাটার মালিকের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
