মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরানের বিরুদ্ধে ‘পছন্দের যুদ্ধ’ যুক্তরাষ্ট্রের লড়াই করার ক্ষমতার ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করেছে। পেন্টাগনের একটি অভ্যন্তরীণ হিসাব অনুযায়ী, মার্কিন সামরিক বাহিনী টমাহক ক্রুজ মিসাইল এবং প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর মিসাইলসহ হাজার হাজার অত্যাধুনিক অস্ত্র ব্যবহার করে ফেলেছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলার জবাবে ইরানের প্রতিক্রিয়া যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের মজুত অস্ত্র ব্যাপকভাবে ব্যবহার করতে বাধ্য করে। এই অস্ত্রগুলো মূলত চীন ও রাশিয়ার মতো শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য যুদ্ধে ব্যবহারের জন্য সংরক্ষিত ছিল।
এ পর্যন্ত হোয়াইট হাউস যুদ্ধের মোট ব্যয়ের আনুষ্ঠানিক হিসাব প্রকাশ করেনি। তবে দুটি স্বাধীন সংস্থার হিসেবে, এই ব্যয় ২৮ বিলিয়ন থেকে ৩৫ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে, যা প্রতিদিন প্রায় ১ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি। প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুদ্ধের প্রথম দুই দিনেই প্রায় ৫.৬ বিলিয়ন ডলারের গোলাবারুদ ব্যবহার করা হয়।
ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র ব্যবহারের চিত্র
দেশটির প্রতিরক্ষা বিভাগের অভ্যন্তরীণ হিসাব উদ্ধৃত করে নিউ ইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ১,১০০টি এয়ার-টু-সারফেস স্ট্যান্ডঅফ মিসাইল-এক্সটেন্ডেড রেঞ্জ বা জ্যাসম-ইআর ব্যবহার করেছে, যা তাদের অবশিষ্ট ১,৫০০ মিসাইলের প্রায় সমান। জ্যাসম-ইআর মিসাইলের পাল্লা ৬০০ মাইলের বেশি এবং এটি শত্রুর আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার বাইরে থেকে শক্ত লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম। এ ধরনের প্রতিটি মিসাইলের মূল্য প্রায় ১.১ মিলিয়ন ডলার।
টমাহক দীর্ঘপাল্লার ক্রুজ মিসাইল ১৯৯১ সালের প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে এবং ভবিষ্যৎ সংঘাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। সিএসআইসির এক গবেষণা অনুযায়ী, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের মজুতে প্রায় ৩ হাজারটি টমাহক মিসাইল রয়েছে।
নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, পেন্টাগন এই যুদ্ধে ১,২০০টির বেশি প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর মিসাইল ব্যবহার করেছে, যার প্রতিটির মূল্য ৪ মিলিয়ন ডলারের বেশি। জানা গেছে, ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র মোট ৬০০টি প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর উৎপাদন করেছিল। এছাড়া, যুক্তরাষ্ট্র ১,০০০টির বেশি প্রিসিশন স্ট্রাইক এবং এটিএসিএমএস স্থলভিত্তিক মিসাইল ব্যবহার করেছে, যার ফলে তাদের অস্ত্রভাণ্ডার উদ্বেগজনকভাবে কমে গেছে।
যুদ্ধের ৩৮ দিনে মোট কত অস্ত্র ব্যবহার হয়েছে তা পেন্টাগন প্রকাশ করেনি। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তারা ১৩ হাজারটির বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। কর্মকর্তারা নিউ ইয়র্ক টাইমসকে জানান, এই সংখ্যাটি ব্যবহার করা বোমা ও মিসাইলের পরিমাণ পুরোপুরি তুলে ধরে না, কারণ যুদ্ধবিমান, আক্রমণকারী বিমান ও আর্টিলারি সাধারণত বড় লক্ষ্যবস্তুতে একাধিকবার আঘাত হেনেছে।
যুদ্ধে উন্মোচিত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সীমাবদ্ধতা
ইরান যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক অস্ত্র সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর বড় প্রভাব ফেলেছে। পেন্টাগন মধ্যপ্রাচ্যে অভিযানের সহায়তায় এশিয়া ও ইউরোপ থেকে বোমা, মিসাইল ও অন্যান্য সামরিক সরঞ্জাম সরিয়ে নিয়েছে। ফলে অন্যান্য অঞ্চলে সম্ভাব্য সংঘাতের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তুতি কমে গেছে, বিশেষ করে রাশিয়া ও চীনের মতো প্রতিপক্ষের ক্ষেত্রে।
এই যুদ্ধ পেন্টাগনের ব্যয়বহুল অস্ত্রের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতাও সামনে এনেছে, বিশেষ করে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ক্ষেত্রে। এতে সস্তা অস্ত্র, বিশেষ করে আক্রমণাত্মক ড্রোন দ্রুত উৎপাদনের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। পেন্টাগন ইতোমধ্যে অস্ত্রভাণ্ডার পুনর্গঠনের জন্য কংগ্রেসের কাছে অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দ চেয়েছে এবং অপেক্ষায় রয়েছে আনুষ্ঠানিক অনুমোদনের।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক অস্ত্রভাণ্ডার আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে সময় লাগতে পারে। রোড আইল্যান্ডের সিনেটর ও আর্মড সার্ভিসেস কমিটির শীর্ষ ডেমোক্র্যাট জ্যাক রিড নিউ ইয়র্ক টাইমসকে বলেন, ‘বর্তমান উৎপাদন হারে আমরা যা ব্যয় করেছি তা পুনরুদ্ধার করতে কয়েক বছর সময় লাগতে পারে।’
সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা এবং অবসরপ্রাপ্ত মেরিন কর্নেল মার্ক এফ ক্যানসিয়ান বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রের মজুত যথেষ্ট থাকলেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্থল হামলা ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মজুত যুদ্ধের আগেই কম ছিল, এখন তা আরও কমে গেছে।’
সূত্র: এনডিটিভি।
সালাউদ্দিন/সাএ
