সুনামগঞ্জের আকাশজুড়ে এখন ঘন কালো মেঘের আনাগোনা। সোমবার সকাল থেকেই জেলাজুড়ে চলছে ভারী বর্ষণ ও মুহুর্মুহু বজ্রপাত।
সেই সাথে উজানের পাহাড়ি ঢলের তোড়ে বাড়ছে নদ-নদীর পানি। প্রকৃতি ও পরিস্থিতির এই বৈরীতায় জেলার ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমির সোনালী বোরো ধান নিয়ে গভীর সংকটে পড়েছেন হাওরপারের কৃষকরা। যে কোনো সময় ধেয়ে আসা ঢলে ফসল তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় এখন দিশেহারা তাঁরা।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, গতকাল রোববার পর্যন্ত জেলায় গড়ে ৫২ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে। কিন্তু অসময়ে শুরু হওয়া এই ভারী বর্ষণ যেন কৃষকের স্বপ্নের পথে দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছে। অধিকাংশ হাওরেই এখনো ধান পুরোপুরি পাকেনি।
সদর উপজেলার দেখার হাওরের কৃষক হিরা মিয়া আক্ষেপ করে বলেন, যেভাবে বজ্রসহ বৃষ্টি হচ্ছে, হাওরে যাওয়াই এখন প্রাণঘাতী। ভয় আর শঙ্কা মাথায় নিয়েই আমরা ধান কাটার চেষ্টা করছি। কিন্তু ধান শুকানোর সুযোগ নেই, মাড়াই করার জায়গাও নেই। এ যেন মরার ওপর খাঁড়ার ঘা।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামীকাল মঙ্গলবার থেকে টানা তিন দিন সুনামগঞ্জসহ উজানে ভারতের চেরাপুঞ্জিতে ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। এই বৃষ্টিপাত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন পাউবোর কর্মকর্তারা।
সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মামুন হাওলাদার জানান, টানা বৃষ্টিতে হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধের মাটি নরম হয়ে গেছে। পাউবো এবার ১৪৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ৭১০টি প্রকল্পের মাধ্যমে ৬০২ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ নির্মাণ ও সংস্কার করলেও, উজানের ঢলের প্রচণ্ড চাপ এই বাঁধগুলোর জন্য বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় ২৭ এপ্রিল সোমবার দুপুরে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে জরুরি বৈঠক করেছে জেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি। জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমান জানান, ধান কাটার বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, আমরা ব্যাপকভাবে প্রচারণা চালাচ্ছি যেন কৃষকরা দ্রুত ধান কেটে নেন। দুর্যোগ মোকাবিলায় সেনাবাহিনী, পুলিশ ও বিজিবিসহ সংশ্লিষ্ট সব দপ্তরে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
তবে বাস্তবে মাঠ পর্যায়ের চিত্র ভিন্ন। কৃষকরা জানাচ্ছেন, হাওরে পানি জমে যাওয়ায় অনেক স্থানে কম্বাইন্ড হারভেস্টার মেশিন চালানো যাচ্ছে না। আবার শ্রমিকের তীব্র সংকট এবং রোদের অভাবে কাটা ধান মাড়াই ও শুকানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
চলতি মৌসুমে জেলায় প্রায় ১৪ লাখ মেট্রিক টন ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। মৌসুমের শুরুতে বৃষ্টির অভাবে ধান পাকতে দেরি হওয়ায় এখন শেষ সময়ে এসে বৈরী আবহাওয়ার কবলে পড়েছে হাওর। এখন দেখার বিষয়, প্রকৃতির এই রুদ্ররূপের বিরুদ্ধে লড়াই করে কৃষকরা তাদের কতটুকু ফসল ঘরে তুলতে পারেন।
সব মিলিয়ে, সুনামগঞ্জের প্রতিটি হাওরপারের মানুষের চোখ এখন আকাশের দিকে প্রার্থনা শুধু একটাই, ঢল আর বৃষ্টির দাপট যেন তাদের সারা বছরের সম্বলটুকু কেড়ে না নেয়।
