মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেসের পতন নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। আনন্দবাজার পত্রিকার একটি বিশ্লেষণে মোট আটটি প্রধান কারণ তুলে ধরা হয়েছে, যেগুলো তৃণমূলের দুর্বলতার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
১. প্রতিষ্ঠান বা ক্ষমতার বিরোধিতা
একটানা ১৫ বছর সরকারে থাকা একটি দলের বিরুদ্ধে প্রত্যাশিতভাবেই প্রতিষ্ঠান বা স্থিতাবস্থা বিরোধিতা তৈরি হয়েছিল। দলের নিচুতলার নেতাদের ‘সৌজন্যে’ তা অনেক এলাকায় বাড়াবাড়ির পর্যায়ে পৌঁছেছিল।
কোথাও ‘সিন্ডিকেট’ চালানো নেতাদের মাতব্বরি, কোথাও শাসকনেতা বা জনপ্রতিনিধির সম্পত্তি-সমৃদ্ধির চমকপ্রদ বাড়বাড়ন্ত, কোথাও সরকারি সুবিধার প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তিতে ভারসাম্যহীনতা। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পর্কেও জনতা খুব একটা শ্রদ্ধাশীল ছিল না। তবে সেসব অসন্তোষ ২০২১ সালেও কম ছিল না। সে কারণেই অনেকে মনে করেছিলেন, তখনই সরকার বদলে যাবে।
তবে তৃণমূল আগের চেয়েও বেশি আসন নিয়ে ২০২১ সালে ক্ষমতায় ফিরেছিল। জিতে ফেরার পরে সংশোধনমূলক পদক্ষেপের অবকাশ ছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সামনে। তারা জনতার অসন্তোষের নিরসন ঘটাতে পারতেন। কিন্তু তা তারা করেননি।
২. আর্থিক দুর্নীতি
তৃণমূলের ১৫ বছরের শাসনকালে সবচেয়ে বড় অভিযোগ উঠেছে দুর্নীতির। ক্ষমতায় আসার পরে পরেই চিটফান্ড কাণ্ডের কালি লেগেছিল তৃণমূল নেতৃত্বের গায়ে। পরে নারদকাণ্ডে নগদে ঘুষ নেওয়ার ভিডিও হইচই ফেলে দেয়। শেষ পাঁচ বছরে শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি, পুর নিয়োগ দুর্নীতি, রেশন দুর্নীতি, কয়লা-গরু-বালি-পাথর পাচার, চোরাচালান, তোলাবাজি-সহ গুচ্ছ দুর্নীতির অভিযোগ ঘিরে ধরেছিল তৃণমূলকে।
নিয়োগ দুর্নীতি, রেশন দুর্নীতি, গরু ও কয়লা পাচারে একের পর এক তৃণমূল নেতা ও জনপ্রতিনিধি গ্রেপ্তার হতে থাকেন। সাধারণ জনতার কাছে মমতার ভাবমূর্তি বড়সড় ধাক্কা খায়। তবে এর আগে তার কোনো আঁচ সরকারের উপর পড়েনি। ২০১৬ সালের ভোটের অব্যবহিত আগে নারদ কাণ্ড ঘটলেও মমতা বেশি আসন নিয়ে ক্ষমতায় ফিরেছিলেন। ২০২১ সালেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। তবে ২০২১ সালের ভোটের পর তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের বান্ধবীর বাড়ি থেকে কোটি কোটি টাকা উদ্ধার হয়। সেই টাকার পাহাড়ের ছবি ছড়িয়ে পড়ায় ঘোর বিড়ম্বনায় পড়েছিলেন মমতা-সহ দলের শীর্ষনেতৃত্ব। ইডির হাতে গ্রেপ্তার হওয়া পার্থকে তড়িঘড়ি মন্ত্রিত্ব থেকে সরানো হয়। তার দলীয় পদও কেড়ে নেওয়া হয়। কিন্তু তার পরে রেশন দুর্নীতিতে জেলে যেতে হয় মন্ত্রী জ্যোতিপ্রিয় মল্লিককে।
৩. এসআইআর
অনেকের মতে, ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) তৃণমূলের জন্য ধাক্কা হয়েছে। প্রথমত, এসআইআর-এ সে সব নাম তালিকা থেকে ঝেড়েপুঁছে বাদ গেছে, যে ভোটারেরা অস্তিত্বহীন, ভুয়া, মৃত, স্থানান্তরিত বা একাধিক স্থানে ভোটার হিসাবে নথিভুক্ত। ভোটার তালিকায় থেকে যাওয়া এই সব ভুয়া নাম দেখিয়ে শাসকদল যে ভুয়া ভোট দিয়ে থাকে, তা পশ্চিমবঙ্গের যেকোনো নির্বাচনে বহু বছরের বাস্তবতা। এই প্রক্রিয়া চালু করেছিল সিপএম। তৃণমূল ক্ষমতায় আসার পরে সেই পরিকল্পনাকে আরো সজুত করেছিল।
সেই তৃণমূলে ‘ভোট ম্যানেজার’ হিসাবে প্রতিষ্ঠা পেয়ে গিয়েছিলেন মুকুল রায়। কিন্তু এ বছরে এসআইআর প্রক্রিয়ার ফলে ভুয়ো নামগুলি তালিকা থেকে বাদ পড়ায় ‘ভূতুড়ে’ ভোটারদের সহায়তা নেওয়ার অবকাশ তৃণমূলের ছিল না। নথি সংক্রান্ত অসঙ্গতির কারণে যাঁদের নাম বাদ গিয়েছিল, তাঁদের বড় অংশই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের।
৪. তোষণের অভিযোগ
তৃণমূলের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক তোষণের অভিযোগে লাগাতার সরব ছিল বিজেপি। গত পাঁচ বছরে বেশ কয়েকটি সাম্প্রদায়িক হিংসার ঘটনা সত্ত্বেও অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ না-হওয়া সংক্রান্ত অভিযোগ সংখ্যাগুরু জনতার উপর প্রভাব ফেলেছিল। মুর্শিদাবাদে হরগোবিন্দ দাস, চন্দন দাসের হত্যাকাণ্ড সে প্রভাব আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল।
প্রতিবেশী বাংলাদেশে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনাও পশ্চিমবঙ্গে প্রভাব ফেলেছিল বলে অনেকের অভিমত। বিজেপি-আরএসএস প্রচার শুরু করে, তৃণমূল ক্ষমতায় থাকলে পশ্চিমবঙ্গেও বাংলাদেশের মতো পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা। ভোটের ফলাফল বলছে, বিজেপি-আরএসএসের সেই প্রচার জমি পেয়েছিল। তৃণমূল তার পাল্টা ভাষ্য তৈরি করতে পারেনি।
৫. হাতছাড়া প্রশাসন
নির্বাচন কমিশন সুকৌশলে এসআইআর পর্ব থেকেই রাজ্যের প্রশাসনে তাদের ‘প্রভাব’ তৈরি করতে শুরু করেছিল। তা ঠেকাতে তৃণমূল তথা রাজ্য সরকার বার বার উচ্চ থেকে উচ্চতর আদালতের দ্বারস্থ হতে থাকে। কিন্তু একের পর এক মামলা করেও এসআইআর প্রক্রিয়ার নিয়ন্ত্রণ তৃণমূল তথা মমতার সরকার হাতে নিতে পারেনি। উল্টে সেই প্রক্রিয়ায় বিচারবিভাগের হস্তক্ষেপের পরিসর তৈরি হয়ে গিয়েছিল। অনেকেই মনে করেন, তার ফলে রাজ্যের প্রশাসনে তৃণমূলের নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ ক্রমশ কমতে শুরু করেছিল।
নির্বাচনের দিনক্ষণ ঘোষণা করেই নির্বাচন কমিশন রাতারাতি ব্যাপক রদবদল শুরু করেছিল রাজ্যের প্রশাসনে। মুখ্যসচিব, স্বরাষ্ট্রসচিব বা ডিজি, কমিশনার স্তর থেকে শুরু করে এসডিও, বিডিও বা আইসি, ওসি স্তর পর্যন্ত ব্যাপক রদবদল করা শুরু হয়। প্রয়োজনমতো বেশ কিছু সরকারি কর্মী এবং প্রশাসনিক কর্তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক পদক্ষেপ করাও শুরু হয়।
৬. ‘সন্ত্রাস’ প্রতিরোধ
পুলিশ-প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ হাতে নিয়ে এবং বিপুল সংখ্যক কেন্দ্রীয় বাহিনী এনে ভোটের আবহে কমিশন ‘মৌলিক বদল’ এনেছিল। বামফ্রন্ট জমানা হোক বা তৃণমূল যুগ, এ রাজ্যের ভোটে শাসকদল বরাবর বিরোধী পক্ষকে দমিয়ে রাখতেই অভ্যস্ত। সে অভ্যাস থেকেই ‘সন্ত্রাস’-এর আবহ তৈরি হয়। এ বার ভোটের অনেক আগে থেকে কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন, তাদের নিয়মিত টহলদারি নিশ্চিত করা, রাস্তায় রাস্তায় সাঁজোয়া গাড়ির দাপট, হিংসার আঁচ পেলেই বাহিনীর রুদ্রমূর্তি শাসকদলকে প্রথম থেকেই খানিকটা বেকায়দায় ফেলে দিয়েছিল।
হুমকি দেওয়ার বদলে নিজেদেরই যে পাল্টা হুমকির মুখে পড়তে হবে, সেটা তৃণমূল নেতৃত্ব ভাবেননি। কেন্দ্রীয় বাহিনীর ‘অত্যাচার’-এর বিরুদ্ধে তৃণমূল প্রচার শুরু করেছিল বটে। কিন্তু তখন দেরি হয়ে গিয়েছিল বলে দলেরই একাংশ মনে করেন। ওই অংশ আরও মনে করেন, এমন পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য দল আগে থেকে প্রস্তুত ছিল না। ফলে প্রচার এবং জনসংযোগ পর্বে বিরোধীদের বাধা দেওয়া বা দমিয়ে রাখা তৃণমূলের পক্ষে সম্ভব হয়নি।
৭. নির্বিঘ্ন ভোটগ্রহণ
গত ১৫ বছরে যে রাজ্য ছ’দফা, সাতদফা বা আটদফায় ভোটগ্রহণ দেখতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিল, সেই পশ্চিমবঙ্গে দু’দফায় ভোট নিলে ভোটগ্রহণ আদৌ নির্বিঘ্নে হবে কি না, তা নিয়ে অনেকেরই সংশয় ছিল। কিন্তু রাজ্যের পুলিশ, প্রশাসন এবং কেন্দ্রীয় বাহিনীর মধ্যে মসৃণ সমন্বয় রেখে নির্বাচন কমিশন ভোটগ্রহণ করিয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গে ভোটদানের হারের সমস্ত অতীতে রেকর্ড ভেঙে গিয়েছে। প্রচারপর্বে তো বটেই, ভোটগ্রহণের দিনও কোনও প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি। এমনকি, গুরুতর জখম হওয়ার ঘটনাও ঘটেনি। শান্তিপূর্ণ এবং নিয়ন্ত্রিত আবহে সেই ভোটে ছাপ্পা ভোট, বুথ জ্যাম বা ভয় দেখিয়ে বিরোধী ভোটারদের বুথে পৌঁছতে না-দেওয়ার পরম্পরাও ছিল না।
৮. আইপ্যাক কাণ্ড
ভোটের মুখে বেকায়দায় পড়েছিল তৃণমূলের পরামর্শদাতা সংস্থা আই-প্যাক। একটা সময়ে ওই সংস্থাকে নিয়ে দলের প্রবীণ নেতাদের একাংশের আপত্তি থাকলেও কালক্রমে পুরো দলই আই-প্যাকের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিল। কিন্তু ভোটের অব্যবহিত আগে আই-প্যাক ঘোষণা করে, তারা পশ্চিমবঙ্গে তাদের সমস্ত কাজকর্ম বন্ধ রাখছে। তৃণমূল দ্রুত পরিস্থিতি সামাল দিয়েছিল বটে।
কিন্তু আই-প্যাকের কাজ বন্ধ করার বিষয়টি দলের উপর একটি ‘ধারণাগত ছাপ’ যে ফেলেছিল, তা তৃণমূলের একাধিক নেতা একান্ত আলোচনায় মেনে নিয়েছিলেন। কারণ, অভিষেক দলে যে ভাবে ‘কর্পোরেট’ সংস্কৃতি আমদানি করেছিলেন, তাতে আই-প্যাক প্রায় তৃণমূলের ‘মেরুদণ্ড’ হয়ে উঠেছিল।