রাজনীতি নিষিদ্ধ যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (যবিপ্রবি) ক্যাম্পাসে নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রসংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ-এর বিভিন্ন স্লোগানসম্বলিত পোস্টার ও দেয়াললিখন দেখা গেছে।
শুক্রবার (০৮ মে) সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ সড়ক, মুন্সী মেহেরুল্লাহ হল ও শহীদ মশিউর রহমান হলের দেয়ালে এসব লিখন দেখতে পান শিক্ষার্থীরা। পরে বিষয়টি দ্রুতই ক্যাম্পাসজুড়ে সমালোচনার সৃষ্টি করে।
দেয়াললিখন ও পোস্টারগুলোতে “জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু”, “শেখ হাসিনা আসছে, বাংলাদেশ কাঁপছে”, “জামায়াত-শিবির রাজাকার, এই মুহূর্তে ক্যাম্পাস ছাড়”, “যৌন হয়রানির বিচার চাই” এবং “শিবিরের হাত থেকে যবিপ্রবি বাঁচাও”সহ বিভিন্ন স্লোগান দেখা যায়।
এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড প্রোডাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ২০২০-২১ সেশনের শিক্ষার্থী শিহাব উদ্দিন সরকার বলেন, প্রশাসনের দুর্বলতা ও নীরব ভূমিকার সুযোগে বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠন ক্যাম্পাসে প্রবেশের চেষ্টা করছে। এরই ধারাবাহিকতায় নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগ দেয়াললিখন ও পোস্টারিং করেছে। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও সুস্থ শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে প্রশাসনকে আরও কঠোর ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে, যেন কোনো ধরনের রাজনৈতিক কার্যক্রম ক্যাম্পাসে স্থান না পায়। পাশাপাশি যারা ছাত্রলীগের স্লোগান, দেয়াললিখন ও পোস্টারিংয়ের সঙ্গে জড়িত, তাদের দ্রুত শনাক্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।
পেট্রোলিয়াম অ্যান্ড মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ২০২০-২১ সেশনের শিক্ষার্থী রাফি বলেন, রাজনীতিমুক্ত ক্যাম্পাসে স্বৈরাচারী আমলে ছাত্রলীগের স্বেচ্ছাচারিতা দেখেছেন শিক্ষার্থীরা। তাদের নতুন কমিটি গঠনের সম্ভাবনাকে সামনে রেখে বিভিন্ন কৌশলে নিজেদের অবস্থান জানানোর চেষ্টা চলছে। জুলাই ক্যালিগ্রাফিতে হামলা থেকে শুরু করে লিফলেট বিতরণ—সব মিলিয়ে ক্যাম্পাসে তারা সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছে। প্রশাসনিক ব্যর্থতার কারণেই তারা এমন সাহস পাচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। বিভিন্ন স্থানে সিসিটিভি ক্যামেরা থাকা সত্ত্বেও বিতাড়িত সংগঠনের সদস্যরা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ তুলে তিনি প্রশাসনের দ্রুত পদক্ষেপ দাবি করেন। অন্যথায় সাধারণ শিক্ষার্থীরা প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলবে বলেও জানান তিনি।
ফিশারিজ অ্যান্ড মেরিন বায়োসাইন্স বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী মেহেদী হাসান নিশাত বলেন, স্বৈরাচারী শেখ হাসিনার সরকারের ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগ কোটা আন্দোলনের সময় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের কারণে নিষিদ্ধ হয়েছে। তারপরও যবিপ্রবিতে তাদের নামে কার্যক্রম পরিচালনা করা উদ্বেগজনক। প্রশাসনের কাছে জড়িতদের শনাক্ত করে শাস্তির আওতায় আনার দাবি জানান তিনি। পাশাপাশি প্রশাসন ব্যর্থ হলে শিক্ষার্থীরা নিজেরাই এসব কর্মকাণ্ড প্রতিহত করতে প্রস্তুত থাকবে বলেও উল্লেখ করেন।
একই বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মো. আশিকুর রহমান বলেন, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ একটি নিষিদ্ধ সন্ত্রাসী সংগঠন। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে কেন্দ্রীয় নির্দেশনা পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তারা পোস্টারিং ও প্রচারণা চালাচ্ছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। ৫ আগস্ট-পরবর্তী প্রশাসনের অবহেলা ও অতিরিক্ত উদারতার ফলেই এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। দ্রুত সময়ের মধ্যে জড়িতদের বিচারের আওতায় এনে ক্যাম্পাসে তাদের কার্যক্রম বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবিও জানান।
এ বিষয়ে যবিপ্রবির প্রক্টর হামিদুর রহমান বলেন, তিনি বিষয়টি সম্পর্কে অবগত আছেন। এ ঘটনায় হল প্রভোস্টদের সঙ্গে ইতোমধ্যে আলোচনা হয়েছে এবং তারা বিষয়টি গুরুত্বসহকারে দেখছেন। ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করতে হলগুলোর সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করা হবে। কোনো ধরনের আলামত পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলেও জানান তিনি।
মুন্সী মেহেরুল্লাহ হলের প্রভোস্ট ড. মো. আব্দুর রউফ সরকার বলেন, বিষয়টি জানার সঙ্গে সঙ্গেই সহকারী হল প্রভোস্টদের ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়েছে। এ ঘটনায় আগামীকাল জরুরি সভার আয়োজন করা হয়েছে। কারা দেয়ালে এ ধরনের লিখন করেছে, তাদের শনাক্তে কাজ চলছে। বর্তমানে পঞ্চম তলা পর্যন্ত সিসিটিভি ক্যামেরার ব্যবস্থা না থাকায় কিছুটা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তবে এ বিষয়ে উপাচার্যের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে এবং খুব শিগগিরই পুরো হল সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় আনা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
শহীদ মশিউর রহমান হলের প্রভোস্ট ড. মো. মজনুজ্জামান বলেন, তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে বিষয়টি জানতে পেরেছেন। এর সঙ্গে কারা জড়িত তা খতিয়ে দেখতে খুব দ্রুতই হল প্রশাসনের পক্ষ থেকে একটি কমিটি গঠন করা হবে।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ২৩ অক্টোবর রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে সিনিয়র সচিব ড. মোহাম্মদ আবদুল মোমেন স্বাক্ষরিত এক গেজেটে সরকার ‘সন্ত্রাসবিরোধী আইন, ২০০৯’-এর ধারা ১৮-এর উপধারা (১)-এ প্রদত্ত ক্ষমতাবলে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ-কে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। একই সঙ্গে আইনটির তফসিল-২-এ ‘বাংলাদেশ ছাত্রলীগ’-কে নিষিদ্ধ সত্তা হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়।