হরমুজ প্রণালি আগামী মাসে খুলে গেলেও চলতি বছরের বেশির ভাগ সময় বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের আশপাশেই থাকবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে মার্কিন বিনিয়োগ ব্যাংক জেপি মরগান।
সোমবার প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে ব্যাংকটি বলেছে, মধ্যপ্রাচ্যে তেলের সরবরাহ দ্রুত স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরবে না। ফলে বাজারে অস্থিরতা আরো দীর্ঘ হতে পারে।
বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, এমন পূর্বাভাসের মধ্যেই তেলের দাম আবারও বেড়েছে। কারণ, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের দেওয়া যুদ্ধবিরতি প্রস্তাবের জবাবকে ‘সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য’ বলে মন্তব্য করেছেন।
ইরানের আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা তাসনিম জানিয়েছে, পাকিস্তানের মাধ্যমে ওয়াশিংটনের কাছে নিজেদের অবস্থান জানিয়েছে তেহরান। সেখানে অবিলম্বে যুদ্ধ বন্ধ এবং ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের আর কোনো হামলা না হওয়ার নিশ্চয়তা চেয়েছে ইরান।
এরপর আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম একপর্যায়ে ৪ শতাংশের বেশি বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০৫ দশমিক ৯৪ ডলারে ওঠে। পরে তা কিছুটা কমে প্রায় ১০৫ ডলারে স্থির হয়।
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি রুট হরমুজ প্রণালি ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই কার্যত অচল হয়ে আছে। এর ফলে বৈশ্বিক তেল ও গ্যাস সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস জানিয়েছে, ওয়াশিংটনের প্রস্তাবে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করা এবং ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি স্থগিতের শর্ত ছিল।
এদিকে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত ‘সরিয়ে না নেওয়া পর্যন্ত’ যুদ্ধ শেষ হবে না।
এপ্রিলের শুরুতে শান্তি আলোচনার সুযোগ দিতে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা হলেও মাঝেমধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। পরে ২১ এপ্রিল ট্রাম্প যুদ্ধবিরতির মেয়াদ অনির্দিষ্টকালের জন্য বাড়িয়ে দেন।
যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই জ্বালানি বাজারে ব্যাপক অস্থিরতা চলছে। ৮ এপ্রিল যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ১০০ ডলারের ওপরে অবস্থান করছে।
জেপি মরগান তাদের বিশ্লেষণে বলেছে, ‘আমাদের বর্তমান মূল্যায়ন অনুযায়ী, এ বছরের বাকি সময়জুড়ে তেলের দাম ১০০ ডলারের আশপাশে থাকবে। আর ২০২৬ সালে গড় দাম হতে পারে ৯৭ ডলার।’
ব্যাংকটি আরো বলেছে, হরমুজ প্রণালি খুলে গেলেও পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হবে না। তখন সংকট প্রণালি থেকে সরে গিয়ে ট্যাংকারের স্বল্পতা, শোধনাগারের সক্ষমতা ও বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর চাপ তৈরি করবে।
বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও গ্যাস সরবরাহ সাধারণত হরমুজ প্রণালি দিয়ে যায়। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার জবাবে ওই পথ ব্যবহারকারী জাহাজে হামলার হুমকি দেয় ইরান।
রবিবার সৌদি আরবের জ্বালানি প্রতিষ্ঠান আরামকো জানায়, চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে তাদের আয় আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৫ শতাংশের বেশি বেড়েছে।
আরামকোর প্রধান আমিন নাসের বলেন, তাদের আন্তঃদেশীয় পাইপলাইন বড় ধরনের সরবরাহ রক্ষা করতে সহায়তা করেছে এবং ইরান যুদ্ধের কারণে সমুদ্রপথে যে সংকট তৈরি হয়েছে, তা মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
গত মাসে ব্রিটিশ জ্বালানি প্রতিষ্ঠান বিপি জানায়, বছরের প্রথম প্রান্তিকে তাদের মুনাফা দ্বিগুণের বেশি হয়েছে। একই ধরনের মুনাফা বৃদ্ধির কথা জানিয়েছে শেলও।
সোমবার বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে বৈঠকে আমিন নাসের বলেন, ‘আজই যদি হরমুজ প্রণালি খুলে যায়, তবুও বাজার স্বাভাবিক হতে কয়েক মাস লাগবে। আর যদি আরও কয়েক সপ্তাহ দেরি হয়, তাহলে এই সংকট ২০২৭ সাল পর্যন্ত গড়াতে পারে।’
তিনি আরো বলেন, বাজার ইতোমধ্যে প্রায় ১০০ কোটি ব্যারেল তেলের নজিরবিহীন ঘাটতির মুখে পড়েছে।
সালাউদ্দিন/সাএ