দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে তামাকের ভয়াবহ ছোবল থেকে বাঁচাতে তামাকজাত পণ্যের মূল্য ও করবৃদ্ধির বিকল্প নেই। তাই আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরে কর আহরণ সহজ করার জন্য বাজারে বিদ্যমান সিগারেটের স্তর চারটি থেকে নামিয়ে তিনটিতে এনে মূল্য বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। এছাড়া দুটি স্তরকে একত্রিত করে দশ শলাকার এক প্যাকেটের দাম ১০০ টাকা, উচ্চ স্তরের দশ শলাকার এক প্যাকেটের দাম ১৫০ টাকা ও অতি উচ্চ স্তরের দশ শলাকার এক প্যাকেটের দাম ২০০ টাকা এবং সকল স্তরের সিগারেটের ওপর বিদ্যমান ৬৭ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক এবং প্রতি ১০ শলাকার প্যাকেটে ৪ টাকা হারে নির্দিষ্ট করারোপ করতে হবে। এতে যেমন স্বল্প আয়ের ধূমপায়ী ধূমপান ছাড়তে বিশেষভাবে উৎসাহিত হবে, তেমনি তরুণ প্রজন্ম ধূমপান শুরু করতেও নিরুৎসাহিত হবে।
মঙ্গলবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে নারী মৈত্রী আয়োজিত ‘তামাকের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে তরুণদের সুরক্ষায় তামাকজাত দ্রব্যে কর বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা’ শীর্ষক আলোচনা সভায় অংশ নেওয়া বক্তাদের বক্তব্যে তা উঠে আসে।
সভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার সানজিদা ইসলাম তুলি বলেন, “সাম্প্রতিক সময়গুলোতে আমরা তরুণদের শক্তি দেখতে পেয়েছি। বর্তমান সরকারও তরুণ নেতৃত্বের প্রতি আস্থাশীল। একদিকে তরুণরা যেমন দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, আবার তামাক কোম্পানিগুলো নিজেদের মুনাফার লোভে ওই তরুণদেরকেই আসক্তির পথে ঠেলে দিচ্ছে। এই তামাক কোম্পানিকে লাভবান রেখে আর যাই হোক, জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা সম্ভব নয়। বর্তমান সরকার যেমন জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় বদ্ধপরিকর, তেমনি তামাক নিয়ন্ত্রণেও তাদের নির্দিষ্ট লক্ষ্য রয়েছে। আসন্ন বাজেটে তামাকজাত দ্রব্যে কর ও মূল্য বৃদ্ধি করে সে লক্ষ্যে আরও এগিয়ে যাওয়া সম্ভব। আমি সংসদ অধিবেশনে বিষয়টি উপস্থাপন করব। সেই সাথে আমি সরকারকে এ বিষয়ে জোরালো পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানাচ্ছি।”
নারী মৈত্রী তামাকবিরোধী মায়েদের ফোরামের আহ্বায়ক শিবানী ভট্টাচার্য বলেন, “বাজারে চাল-ডাল, তেল-নুন-সবকিছুর দামই বাড়ছে, কিন্তু বিড়ি-সিগারেটের দাম তেমন বাড়ে না, তাই এগুলো এখনো সবার, বিশেষ করে তরুণ আর নিম্ন আয়ের মানুষের হাতের নাগালেই রয়ে গেছে। এই জন্য তামাকসেবন কমছে না, বরং আরও বাড়ছে। সরকারের অংশ হিসেবে বর্তমান সরকারের কাছে আমার দাবি—তামাকপণ্যের দাম বাড়ান, জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করুন।”
বিষয়ভিত্তিক প্রেজেন্টেশনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইন্সটিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. শাফিউন নাহিন শিমুল বলেন, “দেশে তামাকপণ্যের খুচরামূল্য বা ভিত্তিমূল্য খুবই কম। তাই করহার বেশি হলেও তা তামাকের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ ও সরকারের রাজস্ব আয় বৃদ্ধিতে তেমন কোনো অবদান রাখে না। এই ত্রুটিপূর্ণ কর-কাঠামোই স্ববিরোধ তৈরি করেছে এবং এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে তামাক কোম্পানিগুলো রাজস্ব বোর্ডকে কর না বাড়ানোর ব্যাপারে প্রভাবিত করে থাকে। সম্পূরক শুল্ক না বাড়িয়ে কেবল মূল্যস্তর বৃদ্ধির মাধ্যমে সিগারেটের দাম বাড়ানো হলে বর্ধিত মূল্যের একটি বড় অংশ তামাক কোম্পানির পকেটে চলে যায়। কিন্তু এই প্রস্তাবনা অনুসারে মূল্য বৃদ্ধি ও করারোপ করলে প্রায় ৫ লক্ষ প্রাপ্তবয়স্ক ধূমপান থেকে বিরত থাকতে উৎসাহিত হবে; ৩ লক্ষ ৭২ হাজারের বেশি তরুণ ধূমপান শুরু করতে নিরুৎসাহিত হবে; এবং ৮৫ হাজার কোটি টাকার বেশি তামাক কর রাজস্ব পাওয়া যাবে। অর্থাৎ আগের অর্থবছরের চেয়ে ৪৪ হাজার কোটি টাকা বাড়তি রাজস্ব আয় হবে।”
এসময় নারী মৈত্রীর নির্বাহী পরিচালক শাহীন আকতার ডলির সভাপতিত্বে নারী মৈত্রী তামাকবিরোধী মায়েদের ফোরাম, শিক্ষক ফোরাম, সাংবাদিক ফোরাম ও ইয়ূথ ফোরামের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
কুশল/সাএ