গত বছর ডেঙ্গুর ভয়াবহ পরিস্থিতির কারণে দেশের অন্যতম আলোচিত জেলায় পরিণত হয়েছিল উপকূলীয় বরগুনা। জেলার হাসপাতালগুলোতে ছিল ডেঙ্গু রোগীর উপচে পড়া ভিড়। একের পর এক প্রাণহানিতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছিল পুরো জেলায়। সেই বছর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে প্রাণ হারান প্রায় অর্ধশত মানুষ। ভয়াবহ সেই স্মৃতি কাটতে না কাটতেই চলতি বছর আবারও বাড়তে শুরু করেছে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা। মৌসুম শুরুর আগেই রোগী বাড়তে থাকায় নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে জনমনে।
সিভিল সার্জন কার্যালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ১ জুন পর্যন্ত বরগুনা জেলায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন ১২২ জন। বর্তমানে জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন ৭ জন রোগী। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ৪ জন ডেঙ্গু রোগী বরগুনা সদর হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এখন পর্যন্ত চলতি বছরে কোনো মৃত্যুর খবর না পাওয়া গেলেও পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন স্বাস্থ্য বিভাগ ও সাধারণ মানুষ।
স্বাস্থ্য বিভাগ বলছে, বর্ষা মৌসুম শুরুর আগেই আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তে থাকায় এখন থেকেই সতর্কতা জরুরি। শহরের বিভিন্ন এলাকায় জমে থাকা পানি, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ এবং কার্যকর মশক নিধন কার্যক্রমের অভাব ডেঙ্গু বিস্তারের অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
গত বছরের ভয়াবহ ডেঙ্গু পরিস্থিতির কথা মনে করলেই আতঙ্কিত হয়ে পড়েন বরগুনাবাসী। ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে গত বছর মারা যান বরগুনার সফল নারী উদ্যোক্তা ও সাংবাদিক রাকিবুল ইসলাম রাজনের স্ত্রী মোনালিসা জেরিন। তার মৃত্যু নিয়ে সে সময় ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি হয়েছিল জেলায়। স্থানীয়দের অভিযোগ, তার মৃত্যুর পর স্বাস্থ্য বিভাগ ও প্রশাসন কিছুটা তৎপরতা দেখালেও পরে কার্যকর কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ আর চোখে পড়েনি।
এ বিষয়ে মোনালিসা জেরিনের স্বামী সাংবাদিক রাকিবুল ইসলাম রাজন বলেন,“গত বছর ডেঙ্গু আমার পরিবারকে শেষ করে দিয়েছে। আমার স্ত্রী ছোট একটা সন্তান রেখে চলে গেছে। হাসপাতালে ভর্তি থাকার পরও আমরা তেমন কোনো চিকিৎসাসেবা পাইনি। একজন স্বামী হিসেবে আমি সেই অসহায় সময়ের কথা কখনো ভুলতে পারবো না। তখন অনেক আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল, বলা হয়েছিল বরগুনায় ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে বড় ধরনের কাজ হবে। কিন্তু বাস্তবে এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান তেমন কোনো কার্যকর উদ্যোগ আমরা দেখিনি।”
তিনি আরও বলেন, “এই বছর আবার ডেঙ্গু বাড়ছে, এটা আমাদের জন্য আতঙ্কের। আমি চাই না আমার মতো আর কোনো পরিবার প্রিয়জন হারাক। বরগুনায় যেন মৃত্যুর মিছিল শুধু সংখ্যায় পরিণত না হয়। প্রশাসন, স্বাস্থ্য বিভাগ ও সাধারণ মানুষ সবাইকে একসাথে সচেতন হতে হবে। শহর পরিষ্কার রাখতে হবে, মশার বিস্তার রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। এখনই উদ্যোগ না নিলে পরিস্থিতি ভয়াবহ হতে পারে।”
বরগুনা জেনারেল হাসপাতাল ঘুরে দেখা গেছে, প্রতিদিনই জ্বর, শরীর ব্যথা, বমি ও দুর্বলতা নিয়ে রোগীরা চিকিৎসা নিতে আসছেন। চিকিৎসকরা বলছেন, অনেকেই প্রথমদিকে ডেঙ্গুর লক্ষণকে সাধারণ জ্বর ভেবে অবহেলা করেন। পরে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে হাসপাতালে ভর্তি হতে হচ্ছে।
এ বিষয়ে বরগুনার সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মাদ আবুল ফাত্তাহ বলেন, “ডেঙ্গু পরিস্থিতি এখনো নিয়ন্ত্রণে থাকলেও আত্মতুষ্টির সুযোগ নেই। মানুষকে আরও সচেতন হতে হবে। বাড়ির আশপাশে কোথাও যেন পানি জমে না থাকে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। জ্বর হলে দ্রুত পরীক্ষা করিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।”
স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। পাশাপাশি
হাসপাতালগুলোতে আলাদা ডেঙ্গু কর্নার চালু রাখা হয়েছে। তবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রশাসনের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সচেতন অংশগ্রহণই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।