তীব্র খরা, কৃষকের বার্ধক্য আর দেশীয় শ্রমিকের আকালে শ্বাসরুদ্ধ পর্তুগালের কৃষি। তবুও স্মার্ট সেচ ব্যবস্থা , সরকারি প্রণোদনার অক্সিজেন, প্রায় ৫০ হাজার বাংলাদেশিসহ প্রবাসী শ্রমিকের ঘাম আর আগ্রাসী বাণিজ্য কূটনীতির চতুর্মুখী চালে দাঁড়িয়ে আছে পুর্তগালের ওয়াইন-অলিভ-কর্কের বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি সাম্রাজ্য।
সরকারি খতিয়ান বলছে, ২০২৩ সালে দেশের ৯৯.৯% ভূখণ্ড খরার গ্রাসে পড়ে। এর ধাক্কায় চার বছরে ঝরে গেছে ৯.৯% খামার, সংকুচিত হয়েছে ৭.৬% আবাদি জমি।
ভুট্টার আবাদ তলানিতে—মাত্র ৬৪.৮ হাজার হেক্টর। কৃষকের গড় বয়স এখন ৬৫, আর মোট শ্রমশক্তির মাত্র ২.৯৫% মাঠে কৃষিতে সময় দিচ্ছে। তাই দেশের প্রায় সব কৃষি ব্যবস্থাপনা সামলাচ্ছে বিদেশি শ্রমিকরা।
সংকট ঠেকাতে সরকার Common Agricultural Policy (CAP) এর ফিতা ঢিল করেছে। কৃষিমন্ত্রী জোসে ম্যানুয়েল ফের্নান্দেসের অধ্যাদেশে ১০হেক্টরের নিচের খামার প্রশাসনিক খড়গ ও জরিমানা থেকে মুক্ত। দানাশস্যে পরনির্ভরতা কাটাতে হাতে নেওয়া হয়েছে
” +Cereals Strategy 2025-2030 ” লক্ষ্য ; খাদ্য সার্বভৌমত্ব।
আলেনতেজুর রোদপোড়া মাঠে এখন ড্রিপ সেচের শিরা-উপশিরা। স্যাটেলাইটে ধরা পড়ছে মাটির তৃষ্ণা। ফলে চার বছরে অর্গানিক খামার বেড়েছে তিন গুণ। গত ৩১ জানুয়ারি কৃষক বিক্ষোভ ঠেকাতে ৫০ কোটি ইউরোর লাইফলাইন ঘোষণা করা হয়। কৃষি ডিজেলে ৫৫% কর ছাড়, অর্গানিক কৃষিতে ১২ কোটি ইউরো এবং খরাক্লিষ্ট কৃষকের জন্য ২০ কোটি ইউরোর কুশন রাখা হয়েছে।
তবু মাঠের নির্মম সত্য হলো প্রবাসী শ্রমিক ছাড়া পর্তুগালের কৃষি অচল। ব্রকলি, অলিভ আর বেরির ঝুড়ি ভরে ওঠে বাংলাদেশ, নেপাল ও ভারতের শ্রমিকদের ঘামে। পর্তুগাল সরকারও মানছে, ‘অভিবাসী জনগোষ্ঠীকে সংহত করা এখন মৌলিক প্রয়োজন’। এক দশকে দ্বিগুণ হয়ে দেশটিতে এখন ৮ লাখ অভিবাসী।
এরমধ্যেই প্রবাসী শ্রমিকদের গলার কাঁটা হয়ে আছে কাগজপত্রের জট। ২০২৪ সালের জুন থেকে ‘এসে কাগজ করার’ দরজা বন্ধ। বাংলাদেশে পুর্তগালের দূতাবাস না থাকায় ভারতের দিল্লি দৌড়াতে হয়। AIMA-র টেবিলে জমে আছে ৪ লাখের বেশি ফাইল। দালালের ফাঁদে লাখ টাকা খরচ, মজুরি লোপাট আর গাদাগাদি করে থাকা এসবই অনেকের নিত্য গল্প।
আশার আলো ‘Programa Integrar’ ভাষা শিক্ষা, দক্ষতা স্বীকৃতি আর চাকরির সিঁড়ি।
আমদানি-রপ্তানিতেও পর্তুগাল দোদুল্যমান। বিশ্বের এক নম্বর কর্ক ও চতুর্থ বৃহত্তম অলিভ অয়েলের ঝাণ্ডাধারী হলেও দেশটি নেট কৃষিপণ্য আমদানিকারক। ২০২৪ সালে শুধু যুক্তরাষ্ট্র থেকেই এসেছে ৪১ কোটি ৩০ লাখ ডলারের কৃষিপণ্য। এই নির্ভরতা ভাঙতে Mercosur চুক্তির তালা খুলতে ব্রাসেলসে জোর লবিং চালাচ্ছে লিসবন।
প্রধানমন্ত্রী লুইস মোন্তেনেগ্রো জলবায়ু পরিবর্তনকে কৃষির ‘এক নম্বর শত্রু’ বলে G20-তে ‘ক্ষুধার বিরুদ্ধে বৈশ্বিক জোটে’ নাম লিখিয়েছেন। ২০৩০ সাল পর্যন্ত ৩ লাখ ডলার ঢালার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
বিশেষজ্ঞদের সোজাসাপ্টা কথা: খরার খাঁড়া, তরুণ কৃষকের খরা আর শ্রমিকদের কাগজের জট এই তিন গিঁট না খুললে জমি, প্রযুক্তি আর রপ্তানির বাজার থাকলেও কৃষি বাঁচবে না।
কারণ “ফসল তোলার হাত আর বিক্রির চুক্তি” দুটোর রিমোটই এখন বিদেশের হাতে। তার মধ্যে বেশিরভাগই বাংলাদেশি।
তাই নিঃসন্দেহে বলা যায় বাংলাদেশি প্রবাসী শ্রমিকদের হাত ধরেই কৃষিতে সমৃদ্ধি লাভ করবে বাংলাদেশ থেকে দূরের ইউরোপের দেশ পুর্তগাল।
