ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচনের পর আলোচনায় উঠে এসেছেন আউসগ্রাম কেন্দ্রের নবনির্বাচিত বিধায়ক কলিতা মাঝি। গৃহকর্মীর কাজ করে সংসার চালানো এই নারী বিজেপি প্রার্থী হিসেবে জয়ী হয়ে এখন রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন।
সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডে ও এনডিটিভি-র তথ্য অনুযায়ী, কলিতা মাঝি নির্বাচনে মোট ১ লাখ ৭ হাজার ৬৯২ ভোট পেয়ে জয় লাভ করেন। তিনি তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী শ্যাম প্রসন্ন লোহারকে ১২ হাজার ৫৩৫ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করেন।
গুসকরা পৌরসভার বাসিন্দা কলিতা মাঝির জীবিকা ছিল চারটি বাড়িতে গৃহকর্মীর কাজ করা। মাসে প্রায় ২৫০০ রুপি আয়ের মাধ্যমে তিনি সংসার চালাতেন। দীর্ঘদিন ধরে সাধারণ মানুষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত থাকার কারণে তার প্রার্থিতা স্থানীয় পর্যায়ে বেশ আগ্রহ তৈরি করে।
এর আগেও ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন, তবে তখন তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী অভেদানন্দ থান্ডারের কাছে ১১ হাজার ৮১৫ ভোটে পরাজিত হন। তবুও দল তাকে পুনরায় মনোনয়ন দেয় এবং এবার তিনি সফল হন।
রাজনীতিতে তার যাত্রা শুরু হয়েছিল বুথ-স্তরের কর্মী হিসেবে, প্রায় এক দশক আগে। ২০২১ সালের নির্বাচনে তিনি প্রায় ৪১ শতাংশ ভোট পেয়েছিলেন বলে জানা যায়। ২০২৬ সালের নির্বাচনে দ্বিতীয়বার সুযোগ পেয়ে তিনি শেষ পর্যন্ত জয় নিশ্চিত করেন।
ব্যক্তিগত জীবনে অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার কারণে তার পড়াশোনা পূর্ণ করা সম্ভব হয়নি। পরিবারের আর্থিক দায়িত্ব সামলাতে তাকে ছোটবেলা থেকেই কাজ করতে হয়েছে। তার স্বামী একজন প্লাম্বার হিসেবে কাজ করেন এবং তাদের ছেলে বর্তমানে অষ্টম শ্রেণিতে পড়াশোনা করছে।
হলফনামা অনুযায়ী, তার বিরুদ্ধে কিছু মামলা থাকলেও সেগুলো গুরুতর নয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই জয়কে অনেকেই শুধু একটি নির্বাচনী সাফল্য হিসেবে নয়, বরং সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রতিকূলতা অতিক্রম করে এগিয়ে যাওয়ার একটি ব্যতিক্রমী উদাহরণ হিসেবে দেখছেন।
কলিতা মাঝির মোট সম্পদের পরিমাণ ১ লাখ ৬১ হাজার ২১৬ রুপি, যার মধ্যে রয়েছে ব্যাংকে জমা টাকা, হাতে থাকা নগদ অর্থ এবং এলআইসি পলিসি। তার স্বামীর নামে জেলায় ৮৭১ বর্গফুটের একটি আবাসিক সম্পত্তি রয়েছে। এটি তিনি তার বাবার কাছ থেকে পেয়েছেন এবং এর মূল্য প্রায় ৩ লাখ রুপি।
পূর্ব বর্ধমান জেলার আউসগ্রাম আসনে তার এই জয়কে অনেকেই দলের তৃণমূল পর্যায়ের নেতাদের তুলে আনার কৌশলের প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন। তার জয়ের প্রতিক্রিয়ায় বিজেপির জাতীয় সাধারণ সম্পাদক বি এল সন্তোষ তাকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, অতীত পটভূমি যা-ই হোক না কেন, প্রতিভা ও পরিশ্রমকে মূল্যায়ন করে বিজেপি।
অবশ্য দলের ভেতরেও কলিতার প্রার্থিতা নিয়ে আগ্রহ ছিল। স্থানীয় কর্মীরা তাকে এমন একজন মুখ হিসেবে দেখেছেন, যিনি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন সমস্যা ভালোভাবে বোঝেন। কলিতা মাঝির বাড়ি মঙ্গলকোটের কাশেমনগরে। সাত বোন ও এক ভাইয়ের বড় পরিবারে তার বেড়ে ওঠা। তার প্রয়াত বাবা ছিলেন দিনমজুর, ফলে ছোটবেলা থেকেই অর্থনৈতিক কষ্টের মধ্য দিয়ে বড় হয়েছেন তিনি।
এই পরিস্থিতি থেকে উঠে এসে বিধানসভায় পৌঁছানো তার যাত্রা রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি ও প্রতিনিধিত্বের এক বড় উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির প্রার্থী বাছাইয়ের কৌশলেও এ ধরনের আর্থিকভাবে পিছিয়ে থাকা মানুষদের গুরুত্ব দেয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
এদিকে ২৯৪ আসনের বিধানসভায় বিজেপি ২০৬টি আসন জিতে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে এবং তৃণমূল কংগ্রেসের ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটিয়েছে। এই ফল পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। একই সঙ্গে ১৯৭২ সালের পর প্রথমবারের মতো রাজ্যে কেন্দ্রের ক্ষমতাসীন দলই সরকার গঠন করতে যাচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এই ফলকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, ‘পশ্চিমবঙ্গে পদ্ম ফুটেছে’। তিনি এই জয়ের পেছনে দলের সাংগঠনিক শক্তি ও ভোটারদের কাছে পৌঁছানোর কৌশলকেই কৃতিত্ব দিয়েছেন।
কুশল/সাএ