এশিয়ার বৃহত্তম হাকালুকি হাওরজুড়ে কৃষকদের আহাজারি যেন থামছেই না। সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে হাওরপাড়ের কৃষকদের দুর্ভোগ ও দুর্দশা। এবারের টানা ভারী বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে সোনালি ফসল ঘরে তোলার স্বপ্নে অপেক্ষায় থাকা কৃষকের রঙিন স্বপ্ন ইতিমধ্যে তছনছ হয়ে গেছে। পানির সাথে যুদ্ধ করে কৃষকরা যে ধান সংগ্রহ করেছিলেন, গত কয়েকদিনে রোদ না থাকায় তাও পচে নষ্ট হচ্ছে। স্বপ্নের বোরো ধান হারানোর বেদনায় হাওরপাড়ের কৃষক পরিবারে এখন শুধুই আহাজারি ও হাহাকার।
সরজমিনে দেখা যায়, এশিয়ার বৃহত্তম হাকালুকি হাওরের বিস্তীর্ণ এলাকায় পাকা ও আধাপাকা বোরো ধান বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের পানিতে তলিয়ে গিয়ে কৃষকদের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা হাওরপাড়ে বসে বোরো ফসল তলিয়ে যাওয়ার দৃশ্য দেখছেন আর কাঁদছেন।
বছরজুড়ে জীবিকা নির্বাহের একমাত্র ফসল হারিয়ে এখন তারা দিশাহারা। প্রাণপণ চেষ্টা করে যেটুকু ফসল সংগ্রহ করেছিলেন, তাও রোদের দেখা না পাওয়ায় পচে গলে নষ্ট হচ্ছে। তবে গত দু-তিন দিন ধরে রোদের দেখা পাওয়ায় কৃষকদের মাঝে একটু স্বস্তি ফিরে এসেছে।
এদিকে, গত ৩ মে থেকে সরকারিভাবে প্রান্তিক কৃষকদের কাছ থেকে ধান চাল সংগ্রহের কার্যক্রম শুরু হলেও হাকালুকি হাওরের বোরো ধানের ব্যাপক ক্ষতি হওয়ায় তাও ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। ইতিমধ্যে সরকার ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের প্রণোদনা দেওয়ার জন্য তালিকা করার নির্দেশনা দিয়েছে। তবে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের প্রণোদনা দেওয়ার জন্য তৈরি করা তালিকায় প্রকৃত কৃষকদের নাম না থাকার অভিযোগ করছেন অনেক কৃষক। হাকালুকি হাওরপাড়ের ক্ষতিগ্রস্ত প্রান্তিক কৃষকরা প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানিয়েছেন।
উপজেলা কৃষি অফিসের সরকারি হিসেবে এবছর জুড়ী উপজেলায় বোরো ধানের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৬১৭০ হেক্টর। তবে আকস্মিক বন্যায় ইতিমধ্যে ৩৭৪ হেক্টর ধানের জমি পানিতে তলিয়ে গেছে বলে জানিয়েছে উপজেলা কৃষি অফিস। তবে হাওরপাড়ের কৃষকরা জানিয়েছেন, হাওরের ৩৫ থেকে ৪০ ভাগ বোরো ধান পানিতে তলিয়ে গিয়ে নষ্ট হয়েছে।
হাকালুকি হাওরের কৃষক হাবিবুর রহমান ও জামাল উদ্দিন বলেন, ঋণ করে এবার আমরা বোরো ধানের আবাদ করেছিলাম। আগাম বন্যায় পানিতে তলিয়ে গিয়ে ধান নষ্ট হয়ে আমরা এখন নিঃস্ব হয়ে গেছি। সরকারের কাছে প্রণোদনের পাশাপাশি ঋণ মওকুফের দাবি জানিয়েছেন তারা।
জুড়ী উপজেলা কৃষি অফিসার মাহমুদুল আলম খান বলেন, এ উপজেলার কৃষকদের দুঃখের যেন শেষ নেই। আগাম বন্যা ও পাহাড়ি ঢলের কারণে কৃষকের পাকা ধান পানিতে ডুবে গেছে। কেউ ধান কাটতে পেরেছেন আবার কেউ কাটতে পারেননি। যারা ধান কাটতে পেরেছেন তারা রোদের অভাবে শুকাতে পারছেন না। যার ফলে ধান পচে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। কৃষকদের যে পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে তা পূরণ করা সম্ভব নয়। তারপরও উপজেলা কৃষি অফিসের পক্ষ থেকে আমরা তালিকা করছি। কৃষকদের ক্ষতি কিছুটা হলেও পুষিয়ে নিতে অতি দ্রুত তাদেরকে সহায়তা করা হবে।
মৌলভীবাজার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. জালাল উদ্দিন জানান, চলতি মৌসুমে জেলায় মোট ৬২ হাজার ৪০০ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে হাওর এলাকায় ২৭ হাজার ৩৫৫ হেক্টর এবং হাওর ছাড়া এলাকায় ৩৫ হাজার ৪৫ হেক্টর জমি রয়েছে। পাহাড়ি ঢলে জেলার ৪ হাজার ২০০ হেক্টর ধান তলিয়ে গিয়ে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। জেলায় ক্ষতিগ্রস্ত ২৫৪০ জন কৃষকের তালিকা করা হয়েছে। শীঘ্রই তাদের সহায়তা করা হবে।