এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়ন (আকু)-এর আমদানি বিল পরিশোধের পরও দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্ত অবস্থানে রয়েছে। মার্চ-এপ্রিল সময়ের আমদানি দায় মেটাতে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রায় ১৫১ কোটি ৪৯ লাখ ডলার পরিশোধ করেছে। এরপরও দেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩৪ বিলিয়ন ডলারের বেশি রয়েছে।
বড় অঙ্কের এই অর্থ পরিশোধের পরও ডলারের বাজারে স্বস্তি বজায় আছে। এর প্রধান কারণ চলতি অর্থবছরে ধারাবাহিকভাবে বাড়তে থাকা প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স প্রবাহ। সংশ্লিষ্টদের মতে, রেমিট্যান্সের উচ্চ প্রবাহ বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ সামাল দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ১০ মে শেষে দেশের মোট (গ্রস) বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩৪ দশমিক ১৪ বিলিয়ন ডলার। তবে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর বিপিএম-৬ পদ্ধতিতে হিসাব করলে রিজার্ভের পরিমাণ ২৯ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন ডলার।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আকুর বিল পরিশোধের কারণে রিজার্ভে সাময়িক চাপ তৈরি হলেও রেমিট্যান্স প্রবাহের ইতিবাচক ধারা সামগ্রিক পরিস্থিতিকে স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, মে মাসের প্রথম ৯ দিনেই দেশে ১০২ কোটি ৯০ লাখ ডলারের রেমিট্যান্স এসেছে। গত বছরের একই সময়ে এ পরিমাণ ছিল ৮৬ কোটি ৪০ লাখ ডলার। অর্থাৎ, এক বছরে প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ১৯ শতাংশ। শুধু ৭ থেকে ৯ মে—এই তিন দিনেই এসেছে ২৭ কোটি ৭০ লাখ ডলার।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ৯ মে পর্যন্ত দেশে মোট রেমিট্যান্স এসেছে ৩০ দশমিক ৩৬ বিলিয়ন ডলার, যেখানে আগের অর্থবছরের একই সময়ে এসেছিল ২৫ দশমিক ৪০ বিলিয়ন ডলার। ফলে এক বছরের ব্যবধানে প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৯ দশমিক ৫ শতাংশ।
অর্থনীতিবিদদের মতে, ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ পাঠাতে প্রবাসীদের আগ্রহ বৃদ্ধি, হুন্ডি নিয়ন্ত্রণে কঠোর নজরদারি এবং ডলারের বিনিময় হার তুলনামূলক বাজারভিত্তিক হওয়ায় রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে নতুন শ্রমবাজার সম্প্রসারণের কারণে আগামী মাসগুলোতেও রেমিট্যান্সের ইতিবাচক ধারা অব্যাহত থাকতে পারে।
ব্যাংকাররা বলছেন, একসময় রিজার্ভ কমে যাওয়ায় ডলার বাজারে বড় অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে রফতানি আয় ও রেমিট্যান্স বাড়ায় পরিস্থিতি আগের তুলনায় অনেকটা নিয়ন্ত্রণে আছে। এছাড়া, বাংলাদেশ ব্যাংকও এখন আগের মতো ঘন ঘন বাজারে ডলার বিক্রি করছে না। ফলে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ কিছুটা কমেছে।
তবে, সামনে জ্বালানি আমদানি, ঋণ পরিশোধ এবং বড় অবকাঠামো প্রকল্পের বৈদেশিক দায় পরিশোধের চাপ রয়েছে। এ অবস্থায় রিজার্ভ পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখতে রেমিট্যান্স ও রফতানি আয়ের ধারা অব্যাহত রাখা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আকু কী?
এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়ন (আকু) হলো এশিয়ার কয়েকটি দেশের মধ্যে আমদানি-রফতানি লেনদেন নিষ্পত্তির একটি আঞ্চলিক ব্যবস্থা। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, ইরানসহ কয়েকটি দেশ এর সদস্য। প্রতি দুই মাস পরপর সদস্য দেশগুলো নিজেদের আমদানি দায় ডলারে পরিশোধ করে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আমদানি ব্যয় বেশি হওয়ায় প্রায় প্রতিবারই বড় অঙ্কের ডলার পরিশোধ করতে হয়। ফলে আকুর বিল পরিশোধের সময় রিজার্ভে বড় ধরনের প্রভাব পড়ে।
গত মার্চে জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি সময়ের আমদানি দায় বাবদ প্রায় ১৩৭ কোটি ডলার পরিশোধ করা হয়েছিল। ওই সময় মোট রিজার্ভ কমে ৩৪ দশমিক ১০ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে। আর আইএমএফের বিপিএম-৬ হিসাব অনুযায়ী রিজার্ভ দাঁড়িয়েছিল ২৯ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন ডলার।
কুশল/সাএ