হাওরের ঢেউয়ের চেয়েও যেন তীব্র প্রেমের টান! সেই টানেই সুদূর চীন সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশের এক প্রত্যন্ত হাওরপল্লিতে হাজির হয়েছেন এক চীনা যুবক। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের চ্যাটিং অ্যাপে পরিচয়, মন দেওয়া-নেওয়া, আর সবশেষে ভালোবাসার মানুষকে আপন করে নিতে কিশোরগঞ্জের ইটনায় ছুটে এসেছেন তিনি।
চাঞ্চল্যকর এই ঘটনাটি ঘটেছে ইটনা উপজেলার চৌগাংগা ইউনিয়নের কিষ্টপুর গ্রামের মড়ল পাড়ায়। চীনা যুবকের আসার খবর ছড়াতে না ছড়াতেই পুরো এলাকায় তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। দূর-দূরান্ত থেকে উৎসুক মানুষ ওই বাড়িতে ভিড় জমাচ্ছেন ভিনদেশী জামাই দেখতে।
মো. নজরুল ইসলাম ও পাখি আক্তার দম্পতির মেয়ে ঝুমা আক্তার। তিনি কিষ্টপুর আজিজিয়া দাখিল মাদ্রাসা থেকে ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষে দাখিল পাস করেন এবং বর্তমানে চৌগাংগা পুরান বাজার কামিল মাদ্রাসার প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী। জন্মসনদ অনুযায়ী, তার জন্ম ২০০৭ সালের ১০ আগস্ট। সে হিসেবে বর্তমানে তার বয়স ১৮ বছর ৯ মাস ৭ দিন।
জানা গেছে, বছর দুয়েক আগে একটি চ্যাটিং অ্যাপের মাধ্যমে তাদের পরিচয় হয়। ভাষা আর সংস্কৃতির দেয়াল ভেঙে ধীরে ধীরে সেই পরিচয় রূপ নেয় গভীর প্রেমে। একপর্যায়ে দুজনেই ঘর বাঁধার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন। সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, গত শনিবার (১৬ মে) রাতে বাংলাদেশে পা রাখেন গাও ওয়েইয়ান নামের ওই চীনা যুবক। এরপর সরাসরি চলে আসেন প্রেমিকার গ্রাম কিষ্টপুরে।
চীনা তরুণ গাও ওয়েইয়ান জানান, তিনি চীনের হেনান প্রদেশের শিনশিয়াং শহরের মুয়ে জেলার বাসিন্দা। তার বাবা গাও ঝানশিন। গাও ওয়েইয়ান নিজে সেখানে একজন সহকারী পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত রয়েছেন।
এদিকে ভিনদেশী তরুণের আগমনে কিষ্টপুর গ্রামে এখন উৎসবের আমেজ। রোববার (১৭ মে) সকাল থেকে ঝুমাদের বাড়িতে তিল ধারণের জায়গা নেই। এলাকার মানুষ দল বেঁধে আসছেন নতুন অতিথিকে দেখতে। তবে অচেনা পরিবেশ আর শত শত মানুষের এই কৌতুহলী ভিড়ে মোটেও বিরক্ত নন গাও ওয়েইয়ান। বরং বেশ হাসিমুখে, স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে পুরো পরিস্থিতি উপভোগ করছেন তিনি।
তবে গ্রামীণ জনপদে এই ভিনদেশী প্রেম নিয়ে গুঞ্জন আর জল্পনা-কল্পনারও শেষ নেই। কেউ কেউ মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে অবান্তর শঙ্কা প্রকাশ করলেও, বেশির ভাগ মানুষই এই ভালোবাসাকে সাধুবাদ জানাচ্ছেন। স্থানীয় বাসিন্দা শরীফুল ইসলাম বলেন, “প্রেমের টানে এত দূর থেকে এসেছে, এটা সত্যি দেখার মতো ঘটনা। আমরা শুধু চাই, সব ধরনের আইনি প্রক্রিয়া মেনে যেন বিয়েটা হয়, যাতে পরে মেয়েটির কোনো সমস্যা না হয়।”
হাওরের প্রত্যন্ত গ্রামে চীনা নাগরিকের আসার খবর পৌঁছেছে স্থানীয় প্রশাসনের কানেও। এ বিষয়ে ইটনা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাখন চন্দ্র সূত্রধর বলেন, “বিষয়টি জানার পর আমরা খোঁজ নিয়ে ঘটনার সত্যতা পেয়েছি। ওই তরুণী প্রাপ্তবয়স্ক। প্রশাসনের পক্ষ থেকে আইনগতভাবে যেভাবে সহায়তা দেওয়ার প্রয়োজন, তা করা হবে।”
প্রেমের এই আন্তর্জাতিক রসায়ন শেষ পর্যন্ত আইনি বিয়ের মাধ্যমে কত দ্রুত পূর্ণতা পায়, এখন সেটাই দেখার অপেক্ষায় পুরো ইটনাবাসী।