দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক বরাবরই উত্তেজনা, অবিশ্বাস ও সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু। সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের সেনাপ্রধান
উপেন্দ্র দ্বিবেদী–এর বক্তব্য সেই উত্তেজনাকে আরও নতুন মাত্রা দিয়েছে। তিনি পাকিস্তানকে উদ্দেশ করে বলেছেন, যদি দেশটি “সন্ত্রাসীদের আশ্রয়” দেওয়া অব্যাহত রাখে, তাহলে তাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে তারা “ভূগোলের অংশ থাকবে নাকি ইতিহাসে পরিণত হবে।” এই মন্তব্য শুধু একটি সামরিক হুঁশিয়ারি নয়; বরং এটি ভারতের বর্তমান নিরাপত্তা কৌশল, আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য এবং রাজনৈতিক অবস্থানের প্রতিফলন।
গত এক দশকে ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক ক্রমেই সংঘাতমুখী হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে কাশ্মীর ইস্যু, সীমান্তে গোলাগুলি, জঙ্গি হামলা এবং পাল্টা সামরিক অভিযানের কারণে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা প্রায় স্থায়ী রূপ নিয়েছে। ভারতের দৃষ্টিতে পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে সীমান্তপারের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে মদদ দিয়ে আসছে। অন্যদিকে পাকিস্তান বরাবরই এই অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে এবং কাশ্মীরকে “স্বাধীনতা সংগ্রাম”-এর প্রশ্ন হিসেবে তুলে ধরছে। এই দ্বন্দ্ব এখন আর কেবল সীমান্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি আন্তর্জাতিক কূটনীতি, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক শক্তির রাজনীতির সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত হয়ে গেছে।
জেনারেল দ্বিবেদীর বক্তব্যে “অপারেশন সিন্দুর”–এর প্রসঙ্গ বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। এর মাধ্যমে ভারতীয় সেনাবাহিনী স্পষ্ট করে দিতে চেয়েছে যে ভবিষ্যতে সীমান্তপারের হামলা বা কাশ্মীরভিত্তিক সশস্ত্র তৎপরতার জবাবে ভারত দ্রুত ও কঠোর সামরিক প্রতিক্রিয়া জানাতে প্রস্তুত। অতীতে ভারত মূলত “প্রতিরক্ষামূলক ধৈর্য” নীতি অনুসরণ করলেও বর্তমানে দিল্লির কৌশলে “প্রাক্-প্রতিরোধমূলক হামলা” বা pre-emptive strike নীতির প্রাধান্য বেড়েছে। এর উদাহরণ হিসেবে সার্জিক্যাল স্ট্রাইক কিংবা বালাকোট হামলার কথা উল্লেখ করা যায়। ভারতের বর্তমান রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্ব মনে করে, কঠোর জবাবই পাকিস্তানকে চাপে রাখার কার্যকর উপায়।
এই বক্তব্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক তাৎপর্য। ভারতে জাতীয়তাবাদী রাজনীতি এবং নিরাপত্তা ইস্যু এখন একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। পাকিস্তানবিরোধী শক্ত অবস্থান দেশটির ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক শক্তির জনপ্রিয়তা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে। ফলে সেনাবাহিনীর বক্তব্যও অনেক সময় বৃহত্তর রাজনৈতিক বয়ানের অংশ হয়ে ওঠে। বিশেষ করে নির্বাচনী রাজনীতিতে “জাতীয় নিরাপত্তা” এখন একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক হাতিয়ার। তাই সেনাপ্রধানের এ ধরনের বক্তব্য দেশের অভ্যন্তরে জাতীয়তাবাদী আবেগকে আরও উসকে দিতে পারে।
অন্যদিকে পাকিস্তানের জন্য এই ধরনের মন্তব্য কূটনৈতিক ও কৌশলগত চাপ তৈরি করে। ইসলামাবাদ দীর্ঘদিন ধরে কাশ্মীর প্রশ্নকে আন্তর্জাতিক ইস্যু হিসেবে তুলে ধরতে চাইলেও ভারত এখন পুরো বিষয়টিকে “সন্ত্রাসবাদবিরোধী লড়াই” হিসেবে উপস্থাপন করতে চাইছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক মহলে পাকিস্তানকে প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানে পড়তে হচ্ছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা বিশ্ব বর্তমানে সন্ত্রাসবাদবিরোধী অবস্থানকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ায় ভারত এই কূটনৈতিক সুযোগ কাজে লাগাতে চাইছে।
তবে সবচেয়ে উদ্বেগজনক বাস্তবতা হলো—ভারত ও পাকিস্তান উভয়ই পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র। অতীতে কারগিল যুদ্ধ, মুম্বাই হামলা কিংবা সাম্প্রতিক সীমান্ত উত্তেজনা দেখিয়েছে যে সীমিত সংঘর্ষও দ্রুত বড় আকার নিতে পারে। ২০২৫ সালের প্রায় ৮৮ ঘণ্টার সামরিক উত্তেজনা এ অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে কতটা ভঙ্গুর করে তুলেছে, তা আবারও স্পষ্ট করেছে। সামান্য ভুল হিসাব, অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া কিংবা রাজনৈতিক আবেগের কারণে পুরো অঞ্চল ভয়াবহ সংকটে পড়ে যেতে পারে। পারমাণবিক অস্ত্রের উপস্থিতি এই উত্তেজনাকে আরও বিপজ্জনক করে তুলেছে, কারণ এখানে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের ঝুঁকি শুধু দুই দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং এর প্রভাব সমগ্র দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের জন্যও এই পরিস্থিতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের অবনতি আঞ্চলিক বাণিজ্য, জ্বালানি সহযোগিতা, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং নিরাপত্তা পরিবেশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও আঞ্চলিক সংযোগ বৃদ্ধির যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, ক্রমবর্ধমান সামরিক উত্তেজনা তা বাধাগ্রস্ত করতে পারে। একই সঙ্গে পানি বণ্টন, সীমান্ত নিরাপত্তা ও ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার বাস্তবতায় এই অঞ্চলে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা আরও কঠিন হয়ে উঠছে।
সব মিলিয়ে, ভারতের সেনাপ্রধানের বক্তব্য কেবল তাৎক্ষণিক সামরিক সতর্কবার্তা নয়; বরং এটি দক্ষিণ এশিয়ার ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা বাস্তবতার একটি কঠোর ইঙ্গিত। বর্তমান পরিস্থিতিতে কূটনৈতিক সংলাপ, আঞ্চলিক আস্থা বৃদ্ধি এবং রাজনৈতিক সংযম অত্যন্ত জরুরি। কারণ ইতিহাস বলছে, ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের উত্তেজনা কখনোই শুধু দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; এর প্রভাব পড়ে সমগ্র অঞ্চলের স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের ওপর। তাই যুদ্ধংদেহী বক্তব্যের পরিবর্তে সংলাপ ও কূটনৈতিক উদ্যোগই হতে পারে দক্ষিণ এশিয়ায় স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার একমাত্র কার্যকর পথ।
লেখক: মোহাম্মদ মাহবুব হোসাইন
ফ্রান্স থেকে সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী।
mahbubhossain786@yahoo.com