বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও গণআন্দোলনের ইতিহাসে ১৬ মে এক স্মরণীয় দিন। এই দিনটি “ফারাক্কা দিবস” নামে পরিচিত। ১৯৭৬ সালের এই দিনে মজলুম জননেতা মাওলানা আব্দুল হামিদ ভাসানী -এর নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত হয়েছিল ঐতিহাসিক ফারাক্কা লংমার্চ। এটি ছিল কেবল একটি রাজনৈতিক কর্মসূচি নয়; বরং বাংলাদেশের পানি অধিকার, পরিবেশ রক্ষা এবং জাতীয় অস্তিত্বের প্রশ্নে এক ঐতিহাসিক গণজাগরণ।
ভারত গঙ্গা নদীর ওপর পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার ফারাক্কা এলাকায় যে বাঁধ নির্মাণ করে, তা মূলত কলকাতা বন্দরের নাব্যতা রক্ষার উদ্দেশ্যে পরিকল্পিত ছিল। ১৯৭৫ সালে পরীক্ষামূলকভাবে বাঁধ চালু হওয়ার পর থেকেই বাংলাদেশে এর নেতিবাচক প্রভাব দৃশ্যমান হতে শুরু করে। গঙ্গার পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ায় দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা পানির সংকটে পড়ে। নদী শুকিয়ে যেতে থাকে, কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হয়, মৎস্যসম্পদ ধ্বংসের মুখে পড়ে এবং লবণাক্ততা বৃদ্ধি পায়। বিশেষ করে খুলনা, যশোর, কুষ্টিয়া ও রাজশাহী অঞ্চলের মানুষ ভয়াবহ ক্ষতির সম্মুখীন হয়। সদ্য স্বাধীন যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের জন্য এটি ছিল এক গভীর জাতীয় সংকট।
এই পরিস্থিতিতে মাওলানা ভাসানী বিষয়টিকে কেবল কূটনৈতিক আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, এটি বাংলাদেশের মানুষের জীবন-মরণের প্রশ্ন। তাই তিনি জনগণকে সঙ্গে নিয়ে প্রতিবাদের পথে নামেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি সবসময় শোষিত-বঞ্চিত মানুষের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। পাকিস্তান আমলে যেমন তিনি বৈষম্য ও শাসকগোষ্ঠীর অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছেন, তেমনি স্বাধীন বাংলাদেশেও জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় ছিলেন আপসহীন।
১৯৭৬ সালের ১৬ মে তার নেতৃত্বে শুরু হয় ঐতিহাসিক ফারাক্কা লংমার্চ। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে হাজার হাজার মানুষ এই কর্মসূচিতে অংশ নেয়। লংমার্চের গন্তব্য ছিল রাজশাহীর কানসাট সীমান্ত এলাকা, যা ফারাক্কার নিকটবর্তী অঞ্চল। বৃদ্ধ বয়স ও অসুস্থ শরীর নিয়েও মাওলানা ভাসানী জনগণের সামনে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের পানির অধিকার রক্ষার ডাক দেন। তার আহ্বানে কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র, রাজনৈতিক কর্মীসহ সাধারণ মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে যোগ দেয়। তিনি স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেছিলেন যে গঙ্গার পানি বাংলাদেশের ন্যায্য অধিকার এবং এই অধিকার থেকে দেশের মানুষকে বঞ্চিত করা চলবে না।
এই লংমার্চ ছিল শান্তিপূর্ণ; কিন্তু এর রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক গুরুত্ব ছিল অত্যন্ত গভীর। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ফারাক্কা ইস্যু নতুনভাবে আলোচিত হয়। বিশ্ব গণমাধ্যমে বাংলাদেশের উদ্বেগ উঠে আসে এবং আন্তর্জাতিক মহলে গঙ্গার পানিবণ্টন প্রশ্ন গুরুত্ব পেতে শুরু করে। বাংলাদেশের জনগণও উপলব্ধি করে যে জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের কোনো বিকল্প নেই।
ফারাক্কা লংমার্চের সবচেয়ে বড় তাৎপর্য হলো, এটি বাংলাদেশের পানি অধিকার আন্দোলনের ভিত্তি তৈরি করে। পরবর্তীকালে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে গঙ্গার পানিবণ্টন নিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা ও চুক্তি হয়। ১৯৯৬ সালে দুই দেশের মধ্যে ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও এখনো শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট পুরোপুরি দূর হয়নি। ফলে ফারাক্কা ইস্যু আজও বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি জাতীয় প্রশ্ন।
মাওলানা ভাসানীর এই আন্দোলনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল পরিবেশ সচেতনতা। বর্তমান সময়ে আমরা জলবায়ু পরিবর্তন, নদীভাঙন ও পানিসংকট নিয়ে যেভাবে উদ্বিগ্ন, ভাসানী অনেক আগেই নদী ও প্রকৃতি রক্ষার গুরুত্ব উপলব্ধি করেছিলেন। তিনি বুঝেছিলেন, নদী বাঁচলে দেশ বাঁচবে। তাই তার আন্দোলন ছিল কেবল রাজনৈতিক নয়, পরিবেশ ও মানবজীবন রক্ষার আন্দোলনও।
আজকের প্রজন্মের কাছে ফারাক্কা দিবস একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বহন করে। জাতীয় স্বার্থ, নদী ও পরিবেশ রক্ষায় জনগণের ঐক্য কতটা প্রয়োজন, তা এই আন্দোলন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়। মাওলানা ভাসানীর সাহসী নেতৃত্ব, দূরদর্শিতা এবং জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা আজও অনুপ্রেরণার উৎস।
ফারাক্কা দিবস তাই কেবল অতীতের একটি স্মরণীয় দিন নয়; এটি বাংলাদেশের অধিকার আদায়ের সংগ্রামের প্রতীক। মজলুম জননেতা মাওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে সংঘটিত ঐতিহাসিক লংমার্চ আমাদের শেখায় যে দেশের স্বার্থ রক্ষায় আপসহীন অবস্থান, জনগণের ঐক্য এবং সাহসী নেতৃত্বই একটি জাতিকে শক্তিশালী করে তোলে।
লেখক: মোহাম্মদ মাহবুব হোসাইন
ফ্রান্স থেকে সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী।
mahbubhossain786@yahoo.com