বাপের বাড়ির জমি বিক্রি করে টাকা দিয়েছিলেন রোসনা বেগম। স্বপ্ন ছিল একটাই সরকারি প্রকল্পে গরু পেলে সংসারের হাল ফিরবে। কিন্তু দুই বছর পেরিয়ে গেছে, গরু আসেনি। টাকাও ফেরত পাননি। যার হাতে টাকা দিয়েছিলেন, তিনি এখন দেখা পর্যন্ত দেন না।
রোসনা বেগম একা নন। গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার বেলকা ইউনিয়নের তালুক বেলকা, পশ্চিম বেলকা, দহবন্দ ইউনিয়নের উত্তর ধুমাইটারী ও দক্ষিণ ধুমাইটারীসহ আশপাশের এলাকায় এভাবে প্রতারণার শিকার হয়েছেন অন্তত শতাধিক সাধারণ মানুষ। তাদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন পল্লী পশু চিকিৎসক মো. রাজু মিয়া (৩৮)।
অভিযুক্ত রাজু মিয়া সুন্দরগঞ্জ পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের বাবু মিয়ার ছেলে। ‘চর উন্নয়ন প্রকল্পে’ সরকারি গরু দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে চলেছে এই প্রতারণা। টাকা ফেরত চাইতে গেলে মারধরও করা হচ্ছে ভুক্তভোগীদের।
রাজু মিয়া সুন্দরগঞ্জ উপজেলা প্রাণিসম্পদ ও ভেটেরিনারি হাসপাতালের জনস্বাস্থ্য প্রকল্পে কর্মরত ছিলেন। সেই সূত্রে গ্রামে গ্রামে পশুর চিকিৎসা দিতে যেতেন তিনি। এলাকায় ‘রাজু ডাক্তার’ নামে পরিচিতি পান। সরকারি দপ্তরের সঙ্গে তার যোগাযোগ আছে এই বিশ্বাসকেই পুঁজি করে গড়ে তোলেন প্রতারণার জাল।
জনস্বাস্থ্য প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও তিনি নিজেকে ‘চর উন্নয়ন প্রকল্পের কর্মকর্তা’ পরিচয় দিতে থাকেন। গ্রামে গ্রামে ঘুরে বলতেন, সরকারি সুবিধায় বিনামূল্যে গরু পাওয়া যাবে, তবে আগে ২৫ হাজার টাকা জমা দিতে হবে। সরল গ্রামবাসী সরকারি প্রকল্পের কথা শুনে আর সন্দেহ করেননি, একে একে টাকা দিতে শুরু করেন। শুধু গরু নয়, মুরগি দেওয়ার নামেও টাকা নিয়েছেন রাজু মিয়া।
তালুক বেলকা গ্রামের ভুক্তভোগী চায়না বেগম বলেন, “প্রথমে মুরগি দেওয়ার কথা বলে ১ হাজার টাকা নিয়েছে। পরে সপ্তাহ না যেতেই গরু দেওয়ার কথা বলে আরও ১৫ হাজার টাকা নিয়েছে। গরুর ছবিও দেখাইছে। এখন মুরগিও নাই, গরুও নাই। ওই বাটপারের দেখাও পাইনা।”
প্রতিবেদক সরেজমিনে গিয়ে একের পর এক ভুক্তভোগীর সঙ্গে কথা বলেন। প্রতিটি গল্পে একই সুর স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল, শেষ সম্বলও গেছে, তবুও প্রতিশ্রুত গরু মেলেনি।
তালুক বেলকা গ্রামের বৃদ্ধা নুরভানু বেওয়া (৬০) কাঁদতে কাঁদতে বলেন, “দুই বছর আগে আমার ছেলের গরু অসুস্থ হলে চিকিৎসার জন্য রাজু ডাক্তার বাড়িতে আসে। আমার গরু না থাকায় গরু দেওয়ার কথা বলে ২৫ হাজার টাকা চায়। আমি ধার-দেনা করে ১০ হাজার টাকা দিয়েছি। গরু পাওয়ার পর বাকি টাকা দেওয়ার কথা ছিল। এখন গরুও নাই, টাকাও নাই। দিনের পর দিন ঘুরাচ্ছে। টাকা চাইতে গেলে উল্টো আমাকেসহ কয়েকজনকে মারধর করেছে।”
তালুক বেলকা গ্রামের বাসিন্দা রোসনা বেগম বলেন, “রাজু ডাক্তার আমাকে গরু দেওয়ার কথা বলে ১৪ হাজার ৪০০ টাকা নিয়েছে। আমি বাপের বাড়ির জমি বিক্রি করে টাকা দিছি। টাকা নেওয়ার চার-পাঁচ দিন পর গরু দেওয়ার কথা ছিল। এখন দুই বছর হয়ে গেল, গরুও নাই, টাকাও নাই। খালি তালবাহানা করছে।”
ভুক্তভোগী রাশেদুল ইসলাম বলেন, “দুয়েক দিন পর পর রাজু ডাক্তার বাড়িতে এসে বুঝায় সরকারিভাবে গরু পাবো। বিনিময়ে টাকা দিতে হবে। আমার কাছেই ২৫ হাজার টাকা নিয়েছে। টাকাও নাই, গরুও নাই। টাকা চাইতে গেলে আমাদেরকে হুমকি দেয়, সেদিন মারধর করেছে আমাদের।”
অভিযোগকারী ফেরদৌস মিয়া বলেন, “আমরা সরকারি প্রকল্প মনে করে ২৫ হাজার টাকা করে দিয়েছি। এখন বুঝতেছি আমরা প্রতারণার শিকার হইছি। আমাদের মতো গ্রামের অনেক মানুষ তার কাছে টাকা দিছে। এখন টাকা চাইতে গিয়ে আমাদেরকে মারধর করেছে।”
তালুক বেলকা গ্রামের শরিফুল ইসলাম, দেলোয়ার হোসেন, মাহাবুর রহমান, ছাইদুল ইসলাম, ছালাম মিয়া, অফি মিয়া, খোকন মিয়া, ফুল বাবু, মোকলেছার রহমান, বেলিনা বেগম, বাছিরন বেগম, মুন্নি বেগম, মিন্না বেগম, শাহিদা বেগম, খতেজা বেগম, সাবানা বেগম, মমেনা বেগম, আমেনা বেগম, ফিরোজা বেগম, হাছিনা বেগম, মনজিলা, মোসলেমা বেগমসহ আরও অনেকেই এই প্রতারণার শিকার হয়েছেন।
দীর্ঘদিন ধরে তালবাহানার পর ক্ষুব্ধ ভুক্তভোগীরা টাকা ফেরত চাইতে গেলে ঘটনা আরও ভয়াবহ রূপ নেয়। মঙ্গলবার (১২ মে) বিকালে সুন্দরগঞ্জ পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ভুট্টু মিয়া ফার্ম সংলগ্ন এলাকায় ফেরদৌস মিয়া, তার বৃদ্ধা দাদি নূরভানু বেগম ও রাশেদুল ইসলাম পশু ডাক্তার রাজু মিয়ার কাছে পাওনা টাকা ফেরত চান। এতেই ক্ষিপ্ত হয়ে তাদের মারধর করেন রাজু মিয়া। চিৎকার শুনে আশপাশের লোকজন এগিয়ে এসে আহতদের উদ্ধার করেন। গুরুতর আহত বৃদ্ধা নূরভানু বেগমকে সুন্দরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। ফেরদৌস মিয়া ও রাশেদুল ইসলামও হাসপাতালে চিকিৎসা নেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ঘটনাটি দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় আলোচনায় থাকলেও অনেকেই ভয়ে মুখ খুলতে সাহস পাননি। কারণ, রাজু মিয়া সবসময় নিজেকে প্রভাবশালী ও সরকারি দপ্তরে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে বলে পরিচয় দিতেন।
আরও কয়েকজন ভুক্তভোগী বলেন, রাজু ডাক্তার বিভিন্ন সময় এলাকার লোকজনকে সরকারিভাবে মুরগি ও গরু দেওয়ার প্রলোভন দেখাত। একেকজন উপকারভোগীর বিপরীতে ১৫ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকা করে নিয়েছে। তাকে অনেকবার বলার পরেও টাকা ফেরত দিচ্ছে না। এখন টাকা চাইলে বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে।
শুধু বাইরে নয়, প্রাণিসম্পদ দপ্তরের ভেতরেও রাজু মিয়ার প্রভাব ছিল গভীরে। অভিযোগ রয়েছে, জনস্বাস্থ্য প্রকল্পে কর্মরত থাকাকালীন তৎকালীন উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মো. ফজলুল করিমের ছত্রছায়ায় অফিসে একটি সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করতেন তিনি। করোনাকালীন খামারিদের প্রণোদনা বিতরণেও ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের আওতাধীন প্রাণিসম্পদ ও ডেইরি উন্নয়ন প্রকল্পের (এলডিডিপি) ইনভেস্টমেন্ট সাপোর্টের আওতায় পরিবেশবান্ধব মুরগির শেড নির্মাণেও ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ হয়েছিল। প্রকল্পের অর্থে ঘর নির্মাণের নামে প্রডিউসার গ্রুপের (পিজি) সদস্যদের সঙ্গে ৩০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে চুক্তিনামা সম্পাদন করা হয়। একইসঙ্গে সদস্যদের কাছ থেকে ফাঁকা চেকেও স্বাক্ষর নেওয়া হয়। মুরগির শেড নির্মাণের কাজ উপকারভোগীদের সম্পাদন করার কথা থাকলেও তৎকালীন উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মো. ফজলুল করিম অভিযুক্ত রাজুর মাধ্যমে উপকারভোগীদের ছাড়াই এ টাকা উত্তোলন করে নিজেদের ইচ্ছামতো শেড নির্মাণের কাজ করেছেন।
এই অনিয়মের তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে হয়রানির শিকার হয়েছেন স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীরাও। তৎকালীন উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মো. ফজলুল করিমের কাছে তথ্য চাইতে গেলে সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রক রাজু মিয়া ওই কর্মকর্তার সামনেই গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে অসদাচরণ করেন এবং সংবাদ প্রকাশ করলে ‘দেখে নেওয়ার’ হুমকি দেন।
বিভিন্ন প্রকল্পে উপকারভোগী যাচাই-বাছাইয়ের দায়িত্বও পালন করতেন রাজু। অভিযোগ রয়েছে, টাকার বিনিময়ে অযোগ্য ব্যক্তিদেরও সরকারি সুযোগ-সুবিধার আওতায় নিয়ে আসতেন তিনি।
ফজলুল করিম বদলি হওয়ার পরেও দপ্তর নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করেছিলেন রাজু মিয়া। নতুন কর্মকর্তা ডা. সুমনা আক্তার বিষয়টি জানতে পেরে সিন্ডিকেট ভেঙে দেন। এতে ক্ষুব্ধ রাজু মিয়া তার সঙ্গেও অসদাচরণ করেন। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, ডা. সুমনা আক্তার অফিস ও নিজের জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করতে বাধ্য হন।
এরপর ডা. সুমনা আক্তার বদলি হয়ে গেলে দপ্তরে আসেন ডা. বিপ্লব কুমার দে। তিনিও রাজু মিয়ার হয়রানি থেকে রেহাই পাননি। বিভিন্নভাবে হয়রানির শিকার হয়ে তিনিও থানায় জিডি করেন। দপ্তরের ভেতর থেকে পাওয়া আস্থা ও ক্ষমতাকে ব্যবহার করে বছরের পর বছর ধরে এই সিন্ডিকেট টিকে থেকেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অভিযুক্ত রাজু মিয়ার সঙ্গে প্রতিবেদকের কয়েক দফা কথা হয়। প্রথমে তিনি বলেন, “কিছুই হয়নি, আমার ভগ্নিপতির সাথে সামান্য কথা কাটাকাটি হয়েছে, এটা ব্যক্তিগত বিষয়।” এ বলেই ফোন কেটে দেন। পরে আবার কথা হলে গরু দেওয়ার কথা বলে টাকা নেওয়ার বিষয়টি সম্পূর্ণ অস্বীকার করে বলেন, “আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদ দেওয়া হচ্ছে।”
উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) ডা. মোজাম্মেল হক বলেন, “রাজু মিয়া আমাদের জনস্বাস্থ্য প্রকল্পে কাজ করেছিল, তবে সেই প্রকল্পের মেয়াদ অনেক আগেই শেষ হয়েছে। তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ থাকায় ইতোপূর্বে দুইজন উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছেন। অভিযুক্ত রাজু আমাদের দপ্তরের কেউ নয়।”
এ ঘটনায় সুন্দরগঞ্জ থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন ভুক্তভোগী ফেরদৌস মিয়া। এ বিষয়ে সুন্দরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহিন মোহাম্মদ আমানুল্লাহ বলেন, “লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। বিষয়টি তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আমার বাঙলা/আরএ