ভয়াবহ নদীভাঙনের কবলে পড়েছে কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম উপজেলার বাঙ্গালপাড়া থেকে নোয়াগাঁও পর্যন্ত হাওরাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ অলওয়েদার সড়ক। ভাঙনের তোড়ে ফসলি জমি, বিদ্যুতের খুঁটি নদীগর্ভে চলে যাচ্ছে। ঝুঁকিতে রয়েছে দুটি গ্রামও। পাঁচদিন ধরে বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন হয়ে আছে নোয়াগাঁও আর উসমানপুর এই দুই গ্রামের মানুষ।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সময়মতো ব্যবস্থা না নেওয়ায় ক্ষতির পরিমাণ আরও বেড়েছে। এ নিয়ে এলজিইডি ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের মধ্যে চলছে দায় এড়ানোর পাল্টাপাল্টি বক্তব্য।
প্রায় সাত বছর আগে ৪৪ কোটি টাকা ব্যয়ে ৭ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সড়কটি নির্মাণ করে এলজিইডি। বর্তমানে আরও ১৩ কোটি টাকা ব্যয়ে চলছিল সংস্কার কাজ। কিন্তু কাজ চলমান অবস্থাতেই ভয়াবহ নদীভাঙনের কবলে পড়ে প্রায় এক কিলোমিটার সড়ক বিলীনের মুখে পড়েছে।
বাঙ্গালপাড়া এলাকার বাসিন্দা আলমগীর হোসেন আলম বলেন, “রাস্তাটি ভাঙতে শুরু করার পর থেকেই এলজিইডিকে জানানো হয়েছিল। তারাও নিয়মিত এই সড়কে আসা-যাওয়া করে, কারণ বর্তমানে এখানে সংস্কার কাজ চলছে। তারপরও তারা সময়মতো ব্যবস্থা নেয়নি।
বাঙ্গালপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মনিরুজ্জামান রুস্তম বলেন, “এই সড়কের শেষ প্রান্তে মেঘনা নদীর ওপর ১৭৭ কোটি টাকা ব্যয়ে এক হাজার মিটার দীর্ঘ একটি সেতু নির্মাণাধীন রয়েছে। সেতুর কাজ শেষ হলে অষ্টগ্রামের নোয়াগাঁওয়ের সঙ্গে উপজেলার সরাসরি সড়ক যোগাযোগ স্থাপিত হবে। এতে হাওরবাসীর সারা বছর যাতায়াতের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হওয়ার আশা ছিল। কিন্তু নদীভাঙনের কারণে সেই স্বপ্ন এখন অনিশ্চয়তার মুখে।”
বাঙ্গালপাড়া ইউনিয়নের নোয়াগাঁও গ্রামের বাসিন্দা হিরণ মিয়া বলেন, “এই সড়ক দিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ চলাচল করে। ভয়াবহ নদীভাঙনে সড়কের বড় অংশ বিলীন হয়ে গেছে। অনেক ফসলি জমি ও বিদ্যুতের খুঁটি নদীগর্ভে তলিয়ে গেছে। বিদ্যুতের খুঁটি পড়ে যাওয়ায় পাঁচদিন ধরে এলাকায় বিদ্যুৎ নেই। নোয়াগাঁও ও উসমানপুর গ্রামের মানুষ মোবাইল চার্জ দিতে পারছে না। প্রবাসে বা বাড়ির বাইরে থাকা স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগেও সমস্যা হচ্ছে। রাতে হারিকেন আর মোমবাতি জ্বালিয়ে চলতে হচ্ছে।”
একই এলাকার বাসিন্দা ইসলাম উদ্দিন বলেন, “দুই গ্রামের অবস্থা এখন খুবই ভয়াবহ। কোনো প্রসূতি রোগীর জরুরি অবস্থা হলে মৃত্যুঝুঁকি ছাড়া উপায় নেই। কারণ রাস্তা ভাঙা চাইলেই হাসপাতালেও নেয়া সম্ভব হবে না। তিনি আরও বলেন, এবারের মতো ভয়াবহ ভাঙন আগে কখনও দেখিনি। আগে এই রাস্তা দিয়ে চলাফেরা করতে পারতাম। এখন রাস্তা ভেঙে গেছে, গ্রামও ভেঙে যাচ্ছে। আমরা আতঙ্কের মধ্যে আছি।”
একই গ্রামের বাসিন্দা শাহজাহান মিয়া বলেন, “নদীভাঙনে জমি চলে গেছে, তাতে এত কষ্ট ছিল না। কিন্তু উপজেলা সদরে যোগাযোগের একমাত্র রাস্তাটি ভেঙে যাওয়ায় সবচেয়ে বেশি ভোগান্তি সৃষ্টি হয়েছে। নদীর মুখটা কেটে দিলে রাস্তা ও গ্রাম দুটিই রক্ষা পাবে।”
এদিকে এলজিইডির দাবি, নদীভাঙন শুরু হওয়ার পর থেকেই পানি উন্নয়ন বোর্ডকে মৌখিকভাবে একাধিকবার জানানো হলেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি তারা।
অষ্টগ্রাম উপজেলা প্রকৌশলী মো. মোজাম্মেল হক বলেন, “সড়কটির পাশেই পানি উন্নয়ন বোর্ডের একটি প্রকল্পের কাজ চলছে। তারা নিয়মিত দেখছে যে নদীভাঙন হচ্ছে। এমনকি পানি উন্নয়ন বোর্ডের অষ্টগ্রামের উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. সেলিম মিয়াকেও অনেকবার বলা হয়েছে। তিনি বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানাবেন বলে আশ্বাস দিয়েছিলেন। কিন্তু পরে কী হলো সেটা তারাই ভালো বলতে পারবেন।”
অন্যদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ড বলছে, ৭ মে’র আগে এ বিষয়ে তাদের কাছে লিখিত বা মৌখিকভাবে কোনো তথ্য পৌঁছায়নি। কিশোরগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাজ্জাদ হোসেন বলেন, “এলজিইডির পক্ষ থেকে ৭ মে একটি চিঠি পেয়েছি। এর আগে লিখিত বা মৌখিকভাবে কেউ কিছু জানায়নি। আগে জানলে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে সহজ হতো। এখন গভীরতাও অনেক বেড়ে গেছে। তারপরেও বিষয়টি নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
কুশল/সাএ