ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) সমাজকল্যাণ বিভাগের সভাপতি সহকারী অধ্যাপক আসমা সাদিয়া রুনা হত্যাকাণ্ডের সময় একা হয়ে পড়েছিলেন। গত ০৪ মার্চ (বুধবার) বিকেল ৪ টার দিকে ওই বিভাগেরই সাবেক কর্মচারী ফজলুর রহমানের ছুরিকাঘাতে নিজ কক্ষেই নির্মম হত্যাকান্ডের শিকার হন তিনি। ঘটনার দিন বিভাগে ইফতার মাহফিলের আয়োজন থাকলেও হত্যাকান্ডের সময় বিভাগের অন্যান্য শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কেউই ছিলেন না। তারা একেকজন বিভিন্ন কাজে বিভাগ ত্যাগ করায় ওই সময়ে বিভাগের অফিস ব্লকে একবারেই নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েছিলেন শিক্ষিকা রুনা। এই নির্জনতার সুযোগে ফজলুর রুনার কক্ষে ঢুকে তাকে ছুরিকাঘাত করে। এছাড়া ওই সময় বিভাগের আশেপাশের কক্ষগুলোতে কেউ না থাকায় রুনা তৎক্ষনাত কারও সাহায্য পাননি।
জানা গেছে, সমাজকল্যাণ বিভাগে বর্তমানে সভাপতি রুনার সঙ্গে দুই শিক্ষক শ্যাম সুন্দর সরকার ও হাবিবুর রহমান, সহকারী রেজিস্ট্রার মোজাম্মেল হক, সেমিনার লাইব্রেরিয়ান ফজলুল হক, দুই কর্মচারী কম্পিউটার অপারেটর সোহাগ ও নৈশপ্রহরী সুমন কর্মরত আছেন। এছাড়া হত্যাকান্ডের সপ্তাহখানেক আগে দাপ্তরিক কাজে অদক্ষ হওয়ায় ওই বিভাগের সহকারী রেজিস্ট্রার বিশ্বজিতকে উম্মুল মুমিনীন আয়েশা সিদ্দিকা হল এবং অসদাচারণের কারণে মাসখানেক আগে ফজলুর রহমানকে (খুনি) রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে বদলি করা হয়।
ভবনের নিচে থাকা সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণে দেখা যায়, ঘটনার দিন (৪ মার্চ) বিকেল ৩ টায় ৩৮ মিনিটে শিক্ষক হাবিবুর রহমান বিভাগ ত্যাগ করেন। পরে বিকেল ৩ টায় ৪১ মিনিটে বিভাগের কর্মকর্তা মোজাম্মেল এবং কর্মচারী ফজলুল ও সোহাগ বিপরীত পাশের গেট দিয়ে ওই ভবন ছাড়েন। এসময় তারা বিভাগের নৈশপ্রহরী সুমনকে বিভাগের দেখভালের দায়িত্ব দিয়ে যান। তবে ঘটনার মাত্র তিন মিনিট আগে (৪ টায় ৯ মিনিট) সুমনও বিভাগ ছেড়ে একই গেইট দিয়ে বেরিয়ে যান। একই সময়ে ভবনের সামনের গেইট দিয়ে এক কর্মচারীকে ভবনে ঢুকে দোতলার ঘটনাস্থলের সামনে দিয়ে তৃতীয় তলার রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে উঠতে দেখা যায়।
এরআগে বিকেল ৪টা ১ মিনিটে ফজলুর রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের কিচেন রুম থেকে পকেটে করে পলিথিনে মোড়ানো ‘অজ্ঞাত বস্তু’ নিয়ে বের হয়ে আর সেখানে ফেরেননি। এরআগে ওই রুমে বস্তুটি নিয়ে তাকে বেশ কিছুক্ষণ লুকোচুরি ও পায়চারি করতে দেখা যায়। পরে ফজলুর ৪টা ৪ মিনিটে তৃতীয় তলা থেকে দ্বিতীয় তলার রুনার কক্ষের দিকে যান। সেখান থেকে আবার তিনি ৪ টা ৮ মিনিটে ফিরে আসেন। পরে ফজলুর ৪টায় ১০ মিনিটে তৃতীয় তলা থেকে সিড়ি দিয়ে নেমে ফের দ্বিতীয় তলায় রুনার কক্ষে যান। দুই মিনিট পরেই বিকেল ৪টা ১২ মিনিটে রুনা ‘আল্লাহ বাঁচাও বাঁচাও’ বলে চিৎকার করেন। পরে ভবনের নিচে থাকা দুই আনসার সদস্য ও দুই শিক্ষার্থী ঘটনাস্থলে পৌঁছালে কক্ষের মধ্যেই আটকে পড়েন হত্যাকারী ফজলুর। পরে তারা কক্ষটি আটকানো দেখে দরজার উপর দিয়ে কক্ষের মধ্যে শিক্ষিকা রুনাকে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে। এসময় ইফতারের আয়োজনে থাকা বিভাগটির তিন শিক্ষার্থীও সেখানে উপস্থিত হয়ে দরজা ভেঙে ফেলেন। তখন তারা ফজলুরকে নিজের গলায় ছুরি চালানো অবস্থায় দেখেন। ফজলুর গণপিটুনি থেকে বাঁচতে আত্মহত্যার নাটক করেন বলে দাবি উপস্থিত শিক্ষার্থীদের। এরআগে দুপুর সাড়ে ১২ টায় বিভাগের শিক্ষক শ্যাম সুন্দরও বিভাগ ছাড়েন বলে জানান বিভাগের কর্মকর্তারা।
শিক্ষার্থীরা বলেন, ওইদিন বিভাগের উদ্যোগে ইফতার ছিল। সেখানে সকল শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীর উপস্থিত থাকার কথা থাকলেও সবার একসঙ্গে বিভাগ ত্যাগের বিষয়টি রহস্যজনক। বিষয়টি তদন্ত হওয়া উচিত।
সহকারী রেজিস্ট্রার মোজাম্মেল হক বলেন, আমি ম্যাম থেকে ছুটি নিয়ে ক্যাম্পাস পার্শ্ববর্তী শেখপাড়া বাজারে ফল কিনতে গিয়েছিলাম। আমার সঙ্গে ফজলুল এবং সোহাগ ছিলো। যাওয়ার সময় নৈশপ্রহরী সুমনের কাছে বিভাগের দায়িত্ব দিয়ে গিয়েছিলাম। এছাড়া ফজলুল হক তার মেয়েকে স্কুল থেকে আনতে গিয়েছিলেন বলে জানান। আরেক কর্মচারী সোহাগ পাশের বাজারে টিসিবির মালামাল আনতে গিয়েছিলেন বলে জানান।
নৈশপ্রহরী সুমন বলেন, নিজের বাসায় দরকারি কাজ থাকায় ম্যামের থেকে ছুটি নিয়ে ঠিক ৪টায় বিভাগ ছেড়ে বাড়িতে গিয়েছিলাম। তবে সিসিটিভি ফুটেজে তাকে ৪টায় ৮ মিনিটেও (হত্যার ৪ মিনিট আগে) ওই ভবনে দেখা যাওয়ার বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে তিনি কোনো সদুত্তোর দিতে পারেননি। এরআগে নৈশপ্রহরী সুমন বিভাগে থাকাকালীন ফজলুর সমাজকল্যাণ বিভাগে গেলেও তার সঙ্গে দেখা হয়নি বলে দাবি সুমনের।
সালাউদ্দিন/সাএ
