ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া উপজেলার একটি এলাকায় ঝড়ে উপড়ে পড়া একটি গাছকে কেন্দ্র করে কথিত ‘মাজার’ তৈরির অপচেষ্টার অভিযোগ উঠেছে। ঘটনাটি ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা, উদ্বেগ ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, পবিত্র ঈদুল আজহার কয়েকদিন আগে প্রবল ঝড়ে পাশাপাশি থাকা তিনটি গাছ উপড়ে পড়ে। গাছগুলো উপড়ে যাওয়ার সময় শিকড়সহ মাটি ওপরে উঠে আসে। এর মধ্যে দুটি গাছ পাশাপাশি ছিল, যার একটি চিকন এবং অন্যটি তুলনামূলক মোটা। পরে চিকন গাছটি সম্পূর্ণ আলাদা হয়ে গেলেও মোটা গাছটি গোড়া থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়নি।
স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, গাছটির ডালপালা কেটে ফেলার পর মাথার অংশের ওজন কমে যাওয়ায় শিকড়ের সঙ্গে থাকা মাটির ভারসাম্যের কারণে গাছের কাণ্ডটি আবার অনেকটা সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে যায় এবং গোড়ার অংশ মাটিতে বসে যায়। এ ঘটনাকে ঘিরে এলাকায় নানা গুঞ্জন ছড়ালেও স্থানীয়রা বলছেন, এতে অলৌকিক কোনো বিষয় নেই; এটি সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক ও বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাসম্পন্ন একটি ঘটনা।
তবে অভিযোগ রয়েছে, এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে গাছের মালিক মাহবুব মুন্সী ও তার সহযোগীরা গাছটিকে ‘অলৌকিক’ হিসেবে প্রচার করছেন। এর ফলে প্রতিদিন শত শত মানুষ গাছটি দেখতে ভিড় করছেন। অনেকেই মানত করছেন, আগরবাতি ও মোমবাতি জ্বালাচ্ছেন, এমনকি গাছের শিকড় সংগ্রহ করে নিয়ে যাচ্ছেন।
গাছের মালিক মাহবুব মুন্সী গণমাধ্যমকে বলেন, “কীভাবে কী হয়েছে, আল্লাহই ভালো জানেন। প্রতিদিন শত শত মানুষ গাছটি দেখতে আসছেন। অনেকে মানত করছেন, আগরবাতি-মোমবাতি জ্বালাচ্ছেন। কেউ কেউ শিকড় নিয়ে যাচ্ছেন। তাদের ধারণা, এতে রোগ-ব্যাধি ভালো হবে।”
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী কাঠুরিয়া মো. আমিন মিয়া বলেন, “গাছটি ঝড়ে শিকড়সহ উপড়ে পড়ে যায়। পরে ডালপালা কেটে দেওয়ার কারণে ভারসাম্য পরিবর্তন হয়ে আবার দাঁড়িয়ে যায়। গোড়ার কয়েক ইঞ্চি অংশ কেটে দিলে এটি আবার পড়ে যাবে। এখানে জিন-ভূত বা অলৌকিক কোনো বিষয় নেই। তবে রহস্যময় মনে হওয়ায় মানুষ গাছটি দেখতে ভিড় করছে।”
এদিকে আখাউড়া বাইতুল আমান জামে মসজিদের খতিব ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জামিয়া শহিদিয়া মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা প্রিন্সিপাল মুফতি মফিজুর রহমান আসাদী বলেন, “ইসলামে ইবাদত, প্রার্থনা ও সাহায্য প্রার্থনা একমাত্র আল্লাহর জন্য নির্ধারিত। মুসলমান আল্লাহ ছাড়া কোনো সৃষ্টি, বস্তু, ব্যক্তি বা স্থানের উপাসনা করে না।”
তিনি বলেন, হাজরে আসওয়াদকে চুম্বন করার সময় হযরত উমর (রা.) বলেছিলেন, *‘আমি জানি, তুমি একটি পাথর মাত্র; তুমি না কোনো উপকার করতে পারো, না কোনো ক্ষতি করতে পারো। যদি আমি রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে তোমাকে চুম্বন করতে না দেখতাম, তাহলে কখনো তোমাকে চুম্বন করতাম না।’*
এছাড়া রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর হাদিস উদ্ধৃত করে তিনি বলেন, *“যখন তুমি কিছু চাইবে, আল্লাহর কাছেই চাইবে; আর যখন সাহায্য প্রার্থনা করবে, আল্লাহর কাছেই সাহায্য প্রার্থনা করবে।”*
মুফতি মফিজুর রহমান আরও বলেন, “গায়রুল্লাহ অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো নামে মানত করা শিরকের অন্তর্ভুক্ত। কারণ মানত নিজেই একটি ইবাদত, আর ইবাদত একমাত্র আল্লাহর জন্যই হতে হবে। কোনো গাছ, পাথর, ব্যক্তি বা অন্য কোনো সৃষ্টির নামে মানত করা ইসলামী আকীদার পরিপন্থী। যদি কেউ এই গাছের নামে মানত করে, তাহলে তা শরিয়তের দৃষ্টিতে বৈধ হবে না।”
এ বিষয়ে আখাউড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তাপসী রাবেয়া বলেন, “বিষয়টি জেলা প্রশাসকের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
আখাউড়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) কফিল উদ্দিন মাহমুদ বলেন, “ঘটনাস্থল সরেজমিনে পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
এলাকার সচেতন মহল মনে করছে, একটি প্রাকৃতিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে কুসংস্কার ও গুজব ছড়িয়ে সাধারণ মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিকে ব্যবহার করা অনুচিত। তারা প্রশাসনের প্রতি বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন।