গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার বামনডাঙ্গা ইউনিয়নের সাতগিরি হিরোবাজার গ্রামের বাসিন্দা ৫৮ বছর বয়সী নুরে আলম। গত ৩০ বছর ধরে তিনি আইসক্রিম ও ভাঙারির ব্যবসা করে পরিবারের জীবিকা নির্বাহ করছেন। ভোর হলেই পুরোনো ভ্যান নিয়ে বেরিয়ে পড়েন তিনি, কখনো গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে ফেরি করে আইসক্রিম বিক্রি করেন, আবার শীত এলে কাঁধে তোলেন ভাঙারির বস্তা। দিনের শেষে সামান্য কিছু আয় হলেও সেই টাকাতেই চলে তাঁর পাঁচ সদস্যের সংসার, ছেলে-মেয়ের পড়াশোনার খরচ এবং চিকিৎসা ব্যয়।
নুরে আলমের বড় ছেলে সবুজ মিয়া রংপুরের কারমাইকেল কলেজ থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন, তবে এখনো চাকরি পাননি। ছোট ছেলে শিহাব মিয়া স্থানীয় কাঠগড়া উচ্চবিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী এবং একমাত্র মেয়ে লুনা আক্তার রংপুর সরকারি বেগম রোকেয়া কলেজে বাংলা বিভাগে অনার্স তৃতীয় বর্ষে পড়ছেন। নিজের ১৩ শতক বসতভিটা ছাড়া আর কোনো সম্পদ নেই নুরে আলমের। স্ত্রী শাহিনুর বেগমকে নিয়ে সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়ার জন্য তিনি প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করে চলেছেন।
মেয়ে লুনার পড়াশোনার খরচ জোগাতে গিয়ে নুরে আলমকে বেশ বেগ পেতে হয়। তিনি বলেন, “প্রতি মাসে মেয়ার খরচ পাঠাইতে হয়। পরীক্ষার সময় ফরম ফিলাপের ট্যাকা জোগাড় করবার গেলে খুব কষ্ট হয়। অনেক সময় ধারদেনা করবার নাগে।” নিজের ভাষায় তিনি আরও জানান, “৩০ বচোর থাকি গরোমের সময় ফেরি করি আইসকিরিম বেচি। শীতের কয় মাস ভাংরির বেপসা করি। কোনো দিন হাট-বাজারোত, কোনো দিন আসতা-ঘাটোত বেচি। ভাংরির বেপসাত পোত্তেক দিন ৩০০-৪০০ ট্যাকা আর আইসকিরিম বেচি পোত্তেক দিন ২০০-৩০০ ট্যাকা কামাই হচ্চে।”
বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে এই সামান্য আয়ে সংসার চালানো কতটা কঠিন, তা বলতে গিয়ে নুরে আলমের কণ্ঠে দীর্ঘশ্বাস শোনা যায়। তিনি বলেন, “এই ট্যাকা আয় দিয়া সোংসার চলাতে অবোসতা কাহিল। ব্যাটাবেটির নেকাপড়ার খরোচ কুলব্যার পাচ্চি না। তারপরও চেস্টা করি, যেন ওগোর পড়া বন্ধ না হয়।”
নিজের শিক্ষাজীবনে অর্থাভাবে দশম শ্রেণিতে পড়ার সময় এসএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণ করতে না পারার কষ্ট আজও তাঁকে তাড়িয়ে বেড়ায়। সেই অপূর্ণতার বেদনাই তাঁকে সন্তানদের লেখাপড়ার প্রতি আরও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ করেছে। তিনি বলেন, “মোর পড়া শেষ হইল না। ট্যাকার অভাবে পরীক্ষা দিবার পারি নাই। তখনই মনত কইছিলাম, মোর ছাওয়াগো পড়া কোনোদিন বন্ধ হইতে দিম না।”
বিয়ের পর প্রথমে দিনমজুর হিসেবে কাজ করলেও অনিয়মিত কাজ আর অভাবের কারণে তিনি আইসক্রিম ও ভাঙারির ব্যবসা শুরু করেন। এই ব্যবসাই এখন তাঁর পরিবারের একমাত্র অবলম্বন। তবে সময়ের সাথে সাথে ব্যবসার চিত্রও বদলে গেছে। আগে আইসক্রিম বিক্রি করে দিনে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা আয় হলেও এখন অনেক দিন ২০০ টাকাও হাতে আসে না। ঘরে ঘরে ফ্রিজ এবং বাজারে সহজলভ্য আইসক্রিমের কারণে ফেরিওয়ালাদের ব্যবসা অনেকটাই কমে গেছে।
তারপরও নুরে আলম থামতে রাজি নন। দৃঢ় কণ্ঠে তিনি বলেন, “যত দিন শরীর চলবে, তত দিন কাজ করমু। ছাওয়াগো নিজের পায়ে দাঁড়াইতে দেখবার চাই।”
নুরে আলমের স্ত্রী শাহিনুর বেগম স্বামীর এই সংগ্রামের কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তিনি বলেন, “বড় ব্যাটার একটা চাকরি হইলে হামার কষ্ট অনেক কমি যাইত। ওর বাপ জীবনভর শুধু সংসার আর ছাওয়াগোর জন্য কষ্ট করল।”
বাবার ত্যাগের কথা স্মরণ করে বড় ছেলে সবুজ মিয়া বলেন, “বাবা আমাদের জন্য নিজের জীবনটাই উৎসর্গ করেছেন। এত কষ্টের মধ্যেও আমাদের পড়াশোনা বন্ধ হতে দেননি। আমি চাকরি পেলে বাবাকে আর কষ্ট করতে দেব না।”
সাতগিরি হিরোবাজার গ্রামের সরু মেঠোপথ ধরে আজও ভ্যানের ঘণ্টা বাজিয়ে চলেন নুরে আলম। তাঁর পকেট ভরা টাকা নেই, নেই কোনো জমিজমা বা বড় সম্পদ। কিন্তু তাঁর আছে এক অদম্য বিশ্বাস—শিক্ষিত সন্তানরাই একদিন বদলে দেবে তাঁর পরিবারের ভাগ্য। সেই বিশ্বাস বুকে নিয়েই ভাঙারি আর আইসক্রিম বিক্রির সামান্য আয়ে প্রতিদিন নতুন করে গড়ে চলেছেন সন্তানের ভবিষ্যৎ।
রোহান/সা.এ.