সিলেট: সিলেটের আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের মূল কেন্দ্রবিন্দু হজরত শাহজালাল (র.)-এর মাজার শরিফ। প্রতিদিন এখানে দেশ-বিদেশ থেকে হাজারো ভক্ত-আশেকান ছুটে আসেন, মানত করেন। সেই সঙ্গে তারা কোটি কোটি টাকা দানও করেন, যা দান বাক্সে জমা হয়। কিন্তু সাধারণ মানুষের মানত বিশ্বাসের এই টাকা বছরের পর বছর ধরে একটি সুনির্দিষ্ট সিন্ডিকেটের পকেটে যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
জানা গেছে, মাজারের এই বিপুল আয়কে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে ‘বিনা পুঁজির ব্যবসা’। যদিও শেষ পর্যন্ত সরকারের কঠোর নির্দেশনায় দীর্ঘদিনের এই অনাচার ও লুটপাট বন্ধে ঐতিহাসিক ও সাহসী পদক্ষেপ নিয়েছে সিলেট জেলা প্রশাসন। সম্প্রতি জেলা প্রশাসনের বিশেষ একটি টিম মাজারের সবক’টি দানবাক্স (সিন্দুক) সরকারিভাবে সিলগালা করে দিয়েছে। আর নতুন করে প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে বসানো হয়েছে নতুন দানবাক্স। জেলা প্রশাসকের এই উদ্যোগ সিলেটজুড়ে ব্যাপক প্রশংসায় ভাসছে।
কুমার ওলীর ‘ভণ্ড বংশধর’ তত্ত্ব ও অনাচারের ইতিহাস
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, ইয়েমেন থেকে ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে আসা ৩৬০ আউলিয়ার প্রধান সিপাহশালার হজরত শাহজালাল (র.) ছিলেন চিরকুমার। তিনি বিয়ে করেননি এবং স্বাভাবিকভাবেই তার কোনো রক্তসম্পর্কীয় বংশধর নেই। কিন্তু মাজারকে কেন্দ্র করে একশ্রেণির স্বার্থান্বেষী মহল নিজেদের ‘শাহজালালের বংশধর’ পরিচয় দিয়ে বংশ পরম্পরায় খাদেমের আসন দখল করে রেখেছে।
স্থানীয় সচেতন মহল ও গবেষকদের মতে, তথাকথিত এই খাদেম গোষ্ঠী মাজারটিকে একটি ব্যক্তিমালিকানাধীন লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছে। ভক্তদের দেওয়া অর্থ, সোনা-দানা ও অন্যান্য মূল্যবান সামগ্রীর কোনো সঠিক হিসাব আজ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের সামনে আসেনি। কোনো পুঁজি ছাড়া, শুধু ধর্মীয় আবেগকে পুঁজি করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার এই ব্যবসা চলছে যুগ যুগ ধরে।

হজরত শাহজালাল (র.)-এর মাজারের দানবাক্স পাহারায় আনসার নিয়োগ। ছবি: সংগৃহীত
করপোরেট স্টাইলে ‘খাদেমের শেয়ার’ কেনাবেচা ও রাজনৈতিক ভাগাভাগি
অনুসন্ধানে জানা যায়, মাজারের আয় যখন জ্যামিতিক হারে বাড়তে থাকে, তখন এখানে নজর পড়ে স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ের রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের। খাদেমদের এই সিন্ডিকেট টিকিয়ে রাখতে সবাই রাজনৈতিক ছাতার নিচে আশ্রয় নেয়। বিনিময়ে রাজনীতিকদের পকেটেও যায় মাজারের দানের বড় একটি অংশ।
সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর বিষয় হলো, কোনো প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানির শেয়ার যেভাবে বাজারে কেনাবেচা হয়, ঠিক তেমনিভাবে এই মাজারের ‘খাদেমের হিস্যা বা শেয়ার’ গোপনে কোটি কোটি টাকায় হাতবদল হওয়ার ইতিহাস রয়েছে। নির্দিষ্ট নিয়মে নির্দিষ্ট দিনে কোন খাদেম কতটুকু ভাগ পাবেন, তা নিয়ে চলতো প্রকাশ্য ও গোপন দর কষাকষি। ভক্তদের পবিত্র দানকে এভাবে ব্যবসায়িক পণ্যে রূপান্তরের প্রক্রিয়ায় সিলেটের মানুষ তীব্র নিন্দা জানিয়ে এলেও, প্রভাবশালীদের ভয়ে কেউ মুখ খোলেনি।
অবশেষে প্রশাসনের ঐতিহাসিক পদক্ষেপ
মাজারের এই বিশৃঙ্খলা ও লুটপাট বন্ধে অতীতে বহুবার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। বিভিন্ন সময়ে সৎ ও সাহসী কর্মকর্তারা ব্যবস্থা নিতে চাইলেও শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক তদবির এবং ‘উপর মহলের’ চাপে পিছু হটতে বাধ্য হন। ফলে সিন্ডিকেট আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। তবে এবার চিত্র ভিন্ন। সরকারের প্রত্যক্ষ ও কঠোর নির্দেশনায় সিলেটের জেলা প্রশাসন এবার কোমর বেঁধে মাঠে নেমেছে। মাজারের আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং প্রকৃত ভক্তদের অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে ঐতিহাসিক পদক্ষেপ নিয়েছেন জেলা প্রশাসক।
জেলা প্রশাসনের বিশেষ একটি টিম সম্প্রতি মাজারের সবক’টি প্রধান দানবাক্স (সিন্দুক) সরকারিভাবে সিলগালা করে দিয়েছে। এখন থেকে প্রশাসনের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধান এবং কঠোর নজরদারিতে এই সিন্দুক খোলা হবে এবং প্রতিটি টাকার পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব রাখা হবে। এই সাহসী পদক্ষেপের পর সাধারণ মানুষ সরাসরি ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জেলা প্রশাসককে সাধুবাদ ও প্রশংসায় ভাসাচ্ছেন।

সিলেটের হজরত শাহজালাল (র.)-এর মাজারে নতুন দানবাক্স স্থাপন করে স্থানীয় জেলা প্রশাসন। ছবি: সংগৃহীত
রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা কি বন্ধ হবে?
প্রশাসনের এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় ও যুগান্তকারী। তবে অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে, এই ভণ্ড সিন্ডিকেট সহজে তাদের ‘সোনার ডিম পাড়া হাঁস’ হাতছাড়া করতে চাইবে না। তারা পর্দার আড়াল থেকে বর্তমান সরকারের প্রভাবশালী মহল বা স্থানীয় নেতাদের ম্যানেজ করার জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছে বলে গুঞ্জন রয়েছে।
সিলেটের সচেতন নাগরিক সমাজের মতে, যদি বর্তমান সরকারের কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি বা দলের কোনো নেতা এই ভণ্ড সিন্ডিকেটের পৃষ্ঠপোষকতায় এগিয়ে না আসেন, তবেই জেলা প্রশাসকের এই উদ্যোগ টেকসই হবে। প্রশাসন যদি কোনো রাজনৈতিক চাপ ছাড়া স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে, তবে হজরত শাহজালাল (র.)-এর মাজারের পবিত্রতা রক্ষা পাবে এবং এই অর্থ সিলেটের অসহায় মানুষের কল্যাণ ও মাজারের প্রকৃত উন্নয়নে ব্যয় করা সম্ভব হবে।
সিলেটবাসী এখন চাতক পাখির মতো তাকিয়ে আছেন— প্রশাসনের এই সততা ও সাহসের জয় হয়, নাকি আবারও রাজনৈতিক কালো হাতের কাছে হেরে যায় সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা।