
মো. রহমত উল্লাহ্, সাবেক অধ্যক্ষ
আমাদের শিক্ষার্থীদের শিক্ষা অর্জনের ক্ষেত্রে বিভিন্ন রকম বৈষম্য বিদ্যমান। সারাদেশের সকল শিক্ষার্থীর জন্য আমরা এখনো শিক্ষার সমান সুযোগ/অধিকার তথা সমমানের শিক্ষক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষাউপকরণ, শিক্ষার পরিবেশ ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে পারিনি!
এ বিশাল বৈষম্য নিরসন অনেক ব্যয়সাপেক্ষ ও সময়সাপেক্ষ হলেও বৃহৎ কর্মসূচি নিয়ে দ্রুত এগিয়ে যেতে হবে আমাদের। সেইসাথে নিশ্চিত করতে হবে বিদ্যমান পরিস্থিতিতে সারাদেশের শিক্ষার্থীদের বৈষম্যহীন মূল্যায়ন।
বর্তমানে আমাদের দেশে মোট ১১টি শিক্ষাবোর্ড রয়েছে। এর মধ্যে ৯টি সাধারণ শিক্ষাবোর্ড, ১টি মাদ্রাসা শিক্ষাবোর্ড ও ১টি কারিগরি শিক্ষাবোর্ড। এই বোর্ডগুলোর অধীনে প্রতিবছর এসএসসি ও এইচএসসি বা সমমান পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে, এসকল পরীক্ষার মূল্যমান সমান হলেও বোর্ড ভিত্তিক ফলাফলে বিস্তর পার্থক্য বিদ্যমান! বাস্তবে দেখা যায়, কিছু বোর্ডে পাশের হার ও জিপিএ-৫ প্রাপ্তির হার তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি, আবার কিছু বোর্ডে তা উল্লেখযোগ্যভাবে কম। এর ফলে উচ্চশিক্ষায় ভর্তিসহ নানা ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের মধ্যে এক ধরনের অদৃশ্য বৈষম্য তৈরি হচ্ছে।
বিশেষ করে, উচ্চশিক্ষায় ভর্তির ক্ষেত্রে যেহেতু এসএসসি ও এইচএসসি বা সমমান পরীক্ষায় প্রাপ্ত নম্বরের একটি অনুপাত যুক্ত হয় সেহেতু সেসব পরীক্ষার ফলাফল ভর্তির সুযোগ প্রাপ্তিতে, ভালো বিষয় প্রাপ্তিতে, ভালো প্রতিষ্ঠান প্রাপ্তিতে ও স্কলারশিপ প্রাপ্তিতে সরাসরি প্রভাব বিস্তার করে। তাই বোর্ডভিত্তিক শিক্ষার্থীদের ফলাফল তারতম্যের কারণ চিহ্নিত করা ও নিরসন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বোর্ডভিত্তিক ফলাফলের বাস্তব তথ্যচিত্র
(ক)

Insert Table
২০২৪ সালের এসএসসি পরীক্ষায় সার্বিক গড় পাশের হার ছিল ৮৩.০৪%
বোর্ডভেদে ফলাফল ছিল নিম্নরূপ:
| বোর্ড | পাশের হার | বোর্ড | পাশের হার | বোর্ড | পাশের হার |
| ঢাকা | ৮৩.৯২% | রাজশাহী | ৮৯.২৫% | যশোর | ৯২.৩২% |
| কুমিল্লা | ৭৯.২০% | সিলেট | ৭৩.৩৫% | চট্টগ্রাম | ৮২.৮০% |
| বরিশাল | ৮৯.১৩% | দিনাজপুর | ৭৮.৪০% | ময়মনসিংহ | ৮৪.৯৭% |
বোর্ডভেদে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন বোর্ডের মধ্যে পার্থক্য প্রায় ১৯ শতাংশ।
(খ)
২০২৪ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় মোট পাশের হার ছিল ৭৭.৭৮%
বোর্ডভেদে ফলাফল ছিল নিম্নরূপ:
| বোর্ড | পাশের হার | বোর্ড | পাশের হার | বোর্ড | পাশের হার |
| ঢাকা | ৭৯.২১% | রাজশাহী | ৮১.২৪% | যশোর | ৬৪.২৯% |
| কুমিল্লা | ৭১.১৫% | সিলেট | ৮৫.৩৯% | চট্টগ্রাম | ৭০.৩২% |
| বরিশাল | ৮১.৮৫% | দিনাজপুর | ৭৭.৫৬% | ময়মনসিংহ | ৬৩.২২% |
এখানেও সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন বোর্ডের পার্থক্য ২২ শতাংশেরও বেশি

Insert Table
(গ) সাধারণ, মাদ্রাসা ও কারিগরি বোর্ডের পার্থক্য
২০২৪ সালের এইচএসসি পরীক্ষায়:
| বোর্ড | পাশের হার | বোর্ড | পাশের হার | বোর্ড | পাশের হার |
| সাধারণ বোর্ড | ৭৫.৫৬% | মাদ্রাসা বোর্ড | ৯৩.৪০% | কারিগরি বোর্ড | ৮৮.০৯% |
এখানে সাধারণ ও মাদ্রাসা বোর্ডের মধ্যে পার্থক্য প্রায় ১৮ শতাংশ।
(ক)
২০২৪ সালে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় মোট ১,৮২,১২৯ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পায়, যা মোট পরীক্ষার্থীর প্রায় ৯.০৪%
বোর্ডভিত্তিক জিপিএ -৫ শতকরা হার
| বোর্ড | জিপিএ -৫ হার | বোর্ড | জিপিএ-৫ হার | বোর্ড | জিপিএ-৫ হার |
| ঢাকা | প্রায় ১২.০% | রাজশাহী | প্রায় ১৪.১% | যশোর | প্রায় ১১.৫% |
| কুমিল্লা | প্রায় ৯.৪% | সিলেট | প্রায় ৮% | চট্টগ্রাম | প্রায় ৮.৬% |
| বরিশাল | প্রায় ৮.৩% | দিনাজপুর | প্রায় ০.৮% | ময়মনসিংহ | প্রায় ১০.২% |
| মাদ্রাসা | প্রায় ১২% | কারিগরি | প্রায় ৭% |
(খ)
২০২৪ সালে এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় মোট ১,৪৫,৯১১ জন জিপিএ-৫ অর্জন করে।
বোর্ডভিত্তিক জিপিএ -৫ শতকরা হার
| বোর্ড | জিপিএ-৫ হার | বোর্ড | জিপিএ-৫ হার | বোর্ড | জিপিএ-৫ হার |
| ঢাকা | প্রায় ১৮% | রাজশাহী | প্রায় ১৭% | যশোর | প্রায় ১২% |
| কুমিল্লা | প্রায় ১০% | সিলেট | প্রায় ১০% | চট্টগ্রাম | প্রায় ১১% |
| বরিশাল | প্রায় ৯% | দিনাজপুর | প্রায় ১৫% | ময়মনসিংহ | প্রায় ৯% |
| মাদ্রাসা | প্রায় ১৫% | কারিগরি | প্রায় ১১% |
উপরোক্ত ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, তুলনামূলকভাবে কোন বোর্ডে পাশের হার বেশি, আবার কোন বোর্ডে জিপিএ-৫ প্রাপ্তির হার বেশি। একই পরীক্ষায় শিক্ষার্থীদের ফলাফলের এই ব্যবধান শিক্ষা মূল্যায়নে পরিষ্কার বৈষম্যের ইঙ্গিত করে। অর্থাৎ সকল শিক্ষাবোর্ডের শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন সমান মানদন্ডে পরিচালিত হচ্ছে না।
শুধুমাত্র ২০২৪ সালের ফলাফল নয়, এর আগে পরে ৫-১০ বছরের ফলাফল পর্যালোচনা করলেও বোর্ডভিত্তিক শিক্ষার্থীদের ফলাফলে প্রায় এমনই পার্থক্য লক্ষ্য করা যাবে। সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন জাগে, যে সকল বোর্ডের শিক্ষার্থীদের ফলাফল বা পাশের হার বরাবরই অন্যান্য বোর্ডের বিশেষ করে ঢাকা বোর্ডের শিক্ষার্থীদের ফলাফলের বা পাশের হারের তুলনায় অনেক ভালো সে সকল বোর্ডের শিক্ষার্থীদের, শিক্ষকগণের ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মান তথা শিক্ষার সার্বিক পরিবেশ কি ঢাকা বোর্ডের তুলনায় ততটা ভালো? যদি না হয়ে থাকে তো মূল্যায়ন ব্যবস্থায় কি কোন ত্রুটি বিদ্যমান?
আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা যেহেতু অনেকাংশেই পরীক্ষানির্ভর সেহেতু শ্রেণি কার্যক্রমের অধিকাংশই থাকে শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার প্রস্তুতি ভিত্তিক। অর্থাৎ যতটা সম্ভব বোর্ড পরীক্ষার প্রশ্নের খুব কাছাকাছি সংক্ষিপ্ত সাজেশন দিয়ে শিক্ষার্থীদের প্রস্তুত করা হয়। তাই প্রশ্নপত্র কমন পড়া, সহজবোধ্য ও নৈর্ব্যক্তিক হওয়ার উপর অনেক কিছু নির্ভর করে।
যেমন, আইসিটি শিক্ষার গুরুত্ব লিখ। আইসিটি শিক্ষার ১০টি গুরুত্ব লিখ। তোমার জন্য আইসিটি শিক্ষা কেন প্রয়োজন? তোমার জন্য আইসিটি শিক্ষার ১০টি প্রয়োজনীয়তা লিখ। একই প্রশ্নের এই চারটি উপস্থাপন ভিন্নরকম। সপ্তম শ্রেণির একজন শিক্ষার্থীর জন্য শেষ প্রশ্নটি যথাযথ এবং পরীক্ষকের জন্য অধিক নৈর্ব্যক্তিক। অর্থাৎ অধিকাংশ শিক্ষার্থী তার নিজের জন্য কেন আইসিটি শিক্ষা প্রয়োজন এটির উত্তর কম/বেশি লিখতে পারবে এবং ১০টি প্রয়োজনীয়তা লিখলে পূর্ণ ১০ নম্বর পাবে, ৬টি লিখলে ৬ নম্বর পাবে, ২টি লিখলে ২ নম্বর পাবে। অথচ প্রথম প্রশ্নটি এমন সহজ ও নৈর্ব্যক্তিক হবে না। আইসিটি শিক্ষার গুরুত্ব লিখতে গেলে শিক্ষার্থীকে বিভিন্ন দিকের অনেক কিছুই ভাবতে হবে এবং শিক্ষার্থী যতটুকুই লিখুক একেক জন পরীক্ষক একেকরকম নম্বর প্রদান করবেন। একই বিষয়ে সকল শিক্ষাবোর্ডের প্রশ্নপত্রে দীর্ঘ প্রশ্ন ও সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন সমহারে না থাকলে এবং ব্যবহারিক পরীক্ষায় নম্বর প্রদানের সমতা না থাকলে শিক্ষার্থীদের নম্বর প্রাপ্তিতে ব্যবধান হয়। সকল শিক্ষা বোর্ডের এসএসসি পরীক্ষা একই প্রশ্নে, একই রুটিনে এবং এইচএসসি পরীক্ষা একই প্রশ্নে, একই রুটিনে গ্রহণ করা সম্ভব হলে এ ক্ষেত্রে সমতা বিধান তুলনামূলক সহজ হবে।
উত্তরপত্র মূল্যায়নের নীতিগত বা কৌশলগত সিদ্ধান্ত একই রকম না হলেও সমস্যা তৈরি হয়। যেমন, কোন শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষকগণ যদি শিক্ষার্থীদের পাশ নম্বর দেওয়ার ক্ষেত্রে উদারতা এবং উচ্চ নম্বর দেওয়ার ক্ষেত্রে কঠোরতা অবলম্বন করেন, আবার অন্য শিক্ষাবোর্ডের পরীক্ষকগণ যদি উভয় ক্ষেত্রেই উদারতা বা কঠোরতা অবলম্বন করেন, তাহলে বোর্ড ভেদে শিক্ষার্থীদের ফলাফলে বৈষম্য সৃষ্টি হবেই। আবার পরীক্ষকের যোগ্যতা, দক্ষতা, প্রশিক্ষণ, নৈতিকতা ও আন্তরিকতা কম/বেশি হলেও বৈষম্য সৃষ্টি হয়। ইত্যাদি কারণে সমান দক্ষতা থাকা সত্ত্বেও শিক্ষার্থীরা নম্বর কম/বেশি পেয়ে থাকে। আবার পরীক্ষার হলে দায়িত্ব পালন কালে কক্ষ পরিদর্শকগণের কঠোরতা ও শিথিলতার প্রভাব পরীক্ষার্থীদের উত্তর লেখার ক্ষেত্রে প্রতিফলিত হয়। পরীক্ষার্থীরা অনৈতিক সুযোগ পেলে অর্থাৎ নকল করার বা দেখাদেখি করার সুযোগ পেলে শুদ্ধ উত্তর লেখার ক্ষেত্রে এগিয়ে থাকে।
এ সকল বৈষম্য দূর করতে কিছু বাস্তবসম্মত ও কার্যকর প্রস্তাব গ্রহণ করা যেতে পারে।
১। জাতীয় পর্যায়ে একক মূল্যায়ন নীতি গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা। অর্থাৎ সব শিক্ষাবোর্ডের শিক্ষার্থীদের জন্য একই প্রশ্নপত্র প্রস্তুত করা ও একই মানদন্ডে উত্তরপত্র মূল্যায়ন করা।
২। যথাসম্ভব নৈর্ব্যক্তিক প্রশ্নপত্র প্রণয়ন ও ডিজিটাল মূল্যায়ন ব্যবস্থা প্রয়োগ করা।
৩। পরীক্ষকদের বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ প্রদান করা। অর্থাৎ প্রতি বছর পরীক্ষকদের প্রশিক্ষণ প্রদান, নমুনা উত্তরপত্র মূল্যায়ন ও মান যাচাই প্রয়োজন।
৪। সর্বত্র পরীক্ষার পরিবেশ সমান কঠোর করা। অর্থাৎ নকল, দেখাদেখি ও সহায়তা মুক্ত রাখা।
৫। এক বোর্ডের সকল উত্তরপত্র অন্য বোর্ডে মূল্যায়ন করা সম্ভব না হলে নমুনা আদান-প্রদানের মাধ্যমে নম্বর প্রদানের সঠিকতা যাচাই করা।
৬। বোর্ডভিত্তিক ফলাফলের বিশ্লেষণ প্রকাশ করা। অর্থাৎ প্রতিবছর বোর্ডভিত্তিক পরীক্ষার্থীদের পাশের হার, অর্জিত জিপিএ ও বিষয়ভিত্তিক প্রাপ্ত নম্বরের তুলনামূলক বিশ্লেষণ প্রকাশ করা ও অসঙ্গতি চিহ্নিত করে সমাধান করা।
উপরে আলোচিত বিষয়সহ বিভিন্ন বিষয়ে সকল শিক্ষাবোর্ডের বিষয়শিক্ষক, প্রশ্নপ্রণেতা, কক্ষপরিদর্শক, পরীক্ষক, ব্যবহারিক পরীক্ষক ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিক আলোচনার মাধ্যমে ঐক্যমত্য প্রতিষ্ঠা করা অত্যাবশ্যক। কেননা, আমাদের সকল শিক্ষার্থীর শিক্ষা মূল্যায়নে সমতা আনয়ন করা তথা বৈষম্য নিরসন করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। তাই যথাসম্ভব বৈষম্যহীন মূল্যায়নের স্বার্থে অভিন্ন প্রশ্নে পরীক্ষা গ্রহণ এবং সকল শিক্ষাবোর্ডের পরীক্ষা সংশ্লিষ্টদের সকল বিষয়ে পূর্ণ ঐক্যমত্য প্রতিষ্ঠার কোন বিকল্প নেই।
লেখক: সাবেক অধ্যক্ষ, শিশুসাহিত্যিক ও শিক্ষাগবেষক