ফাইল ছবি
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় (কুবি) যাত্রা শুরুর পর ২০০৭-০৮ অর্থবছরে প্রথম বাজেটের আকার ছিল এক কোটি ১০ লাখ টাকা। সেখান থেকে সর্বশেষ ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য বাজেট নির্ধারণ করা হয়েছে ৭৯ কোটি ৭২ লাখ টাকা। এর মধ্যে ইউজিসি থেকে জোগান দেওয়া হবে ৭১ কোটি ৬২ লাখ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব আয় থেকে আসবে ৮ কোটি ১০ লাখ টাকা।
২০০৭-০৮ থেকে শুরু হয়ে সর্বশেষ ২০২৬-২৭ সহ মোট ২১টি অর্থবছরের বাজেটের সাক্ষী হয়েছে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়। এরমধ্যে সর্বনিম্ন বাজেট ছিলো প্রথম অর্থবছরে মাত্র এক কোটি ১০ লাখ টাকা। পরবর্তীতে ক্রমান্বয়ে সেটির পরিমাণ বেড়েছে, সাথে বেড়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের চাহিদাও। মাত্র সাতটি বিভাগ, ১৫ জন শিক্ষক আর ৩০০ শিক্ষার্থী নিয়ে যাত্রা শুরু হওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে রয়েছে ১৯টি বিভাগ, ২৮৬ জন শিক্ষক এবং প্রায় সাত হাজার শিক্ষার্থী।
বছর বছর বাজেটের পরিমাণ আংশিক পরিমাণে বাড়লেও প্রতিবছরই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রস্তাবিত বাজেট থেকে পাশকৃত বাজেটে ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে। ফলে প্রত্যাশিত বাজেটে না পাওয়ার ফলে সীমাবদ্ধতা নিয়েই প্রতিনিয়ত এগিয়ে যাওয়ার বাস্তবতা সামনে আসে, যা বাধাগ্রস্ত করতে পারে বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক কার্যক্রমকে।
জানা যায়, এ অর্থবছরে ইউজিসি কর্তৃক ৭৯ কোটি ৭২ লাখ টাকার বাজেট নির্ধারণ করা হলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রস্তাবিত বাজেটের পরিমাণ গত অর্থবছরের ন্যায়ই বেশি থাকবে। এবছর অন্তত ১০ থেকে ১২ কোটি থাকার বাজটে ঘাটতি সম্ভাবনা রয়েছে।
গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রস্তাবিত বাজেট ছিলো ৯২ কোটি ৭০ লাখ টাকা আর পাশকৃত বাজেট ছিল ৭৬ কোটি ১০ লাখ, ফলে বাজেটে ঘাটতি ছিল ১৬ কোটি ৩০ লাখ টাকা। এছাড়া ২০২৪-২৫, ২০২৩-২৪ সহ সাম্প্রতিক প্রায় প্রতিটি বাজেটই ঘাটতি মাথায় রেখে চলা শুরু করেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বশেষ পাঁচ বছরের বাজেট পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ২০২২-২৩ অর্থবছরে বাজেটের পরিমাণ ছিল ৬৪ কোটি ১৬ লাখ, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৬১ কোটি ২৯ লাখ এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৭১ কোটি ৯৯ লাখ টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেট পরবর্তীতে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল ৭৫ কোটি ৬৯ লাখ টাকায়। সেখান থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাজেট নির্ধারণ করা হয়েছিল ৭৬ কোটি ১০ লাখ। নতুন অর্থবছরে এর সংশোধিত বাজেটের পরিমাণও বৃদ্ধি পাবে বলে জানা গিয়েছে। এবং সর্বশেষ ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট ৭৯ কোটি ৭২ লাখ টাকা। যা গত অর্থবছরের থেকে মাত্র তিন কোটি ৬২ লাখ টাকা বেশি।
এদিকে ২০২২-২৩ অর্থবছরের তুলনায় ২০২৬-২৭ অর্থবছরে পাঁচ অর্থবছরের ব্যবধানে বাজেট বৃদ্ধির হার আপাত দৃষ্টিতে ২৪ দশমিক ২৫ শতাংশ দেখালেও বছরভিত্তিক হিসেবে সেটা আবার ঢের নিম্নমুখী। যেখানে ২০২২-২৩ এর পরবর্তী অর্থবছরেই আবার উল্টো চিত্র। ২০২২-২৩ অর্থবছরের তুলনায় ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাজেটের হার বৃদ্ধির বদলে চার দশমিক ৪৭ শতাংশ কমে এসেছে। ৬৪ কোটি ১৬ লাখ থেকে নেমে হয়েছিল ৬১ কোটি ২৯ লাখ টাকা। এখানে টাকার অঙ্কে ব্যবধান দুই কোটি ৮৭ লাখ টাকা।
আবার পরবর্তী ২০২৪-২৫ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে পূর্ববর্তী বছরের চেয়ে বাজেট বৃদ্ধির হার ঊর্ধ্বমুখী। যা গিয়ে দাঁড়িয়েছে ২৩ দশমিক ৫০ শতাংশ। যদিও ২০২৪-২৫ অর্থবছরের মূল বাজেট ছিল ৭১ কোটি ৯৯ লাখ টাকা কিন্তু পরবর্তী বাজেটের সাথে সংশোধিত আকারে এর পরিমাণ গিয়ে দাঁড়ায় ৭৫ কোটি ৬৯ লাখ। এমনিতে মূল বাজেটে বৃদ্ধির হার ছিল শতকরা ১৭ দশমিক ৪৬ শতাংশ।
পরবর্তী অর্থবছরের বাজেটের বৃদ্ধি ছিল প্রায় শূন্যের কোটায়। ২০২৪-২৫ এর সংশোধিত বাজেট থেকে বৃদ্ধির হার মাত্র শূন্য দশমিক ৫৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। যা টাকায় ছিল মাত্র ৪১ লাখ টাকা। আবার স্বস্তির কথা হচ্ছে, মূল বাজেট থেকে এর বৃদ্ধির হার ছিল পাঁচ দশমিক ৭১ শতাংশ।
এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরের তুলনায় সর্বশেষ ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাজেটের আকার বৃদ্ধি পেয়েছে মাত্র চার দশমিক ৭৬ শতাংশ। যা টাকায় ৩ কোটি ৬২ লাখ টাকা।
এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বাজেটে ৩০০ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে বরাদ্দ ছিল এক কোটি ১০ লাখ টাকা। অর্থাৎ প্রতি শিক্ষার্থী বাবদ এর আকার দাঁড়ায় মাত্র ৩৬ হাজার ৬৬৭ টাকা।
এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার দপ্তরের অ্যাকাডেমিক শাখা থেকে প্রাপ্ত তথ্য বলছে, বর্তমানে ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষ ব্যতীত বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর মিলিয়ে শিক্ষার্থী রয়েছে পাঁচ হাজার ৭৮৬ জন। এছাড়া ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে ৮৫০টি সিটের বিপরীতে এখন পর্যন্ত ভর্তি হয়েছে মোট ৭৩৭ জন। ফলে বর্তমানে ভর্তিকৃত শিক্ষার্থীসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা দাঁড়ায় ছয় হাজার ৫২৩ জন। ফলে সর্বশেষ বাজেটে প্রতি শুধু শিক্ষার্থীর হিসেবে মাথাপিছু বরাদ্দ দাঁড়ায় এক লক্ষ ২২ হাজার ২১৩ টাকা।
মাত্র ৩৬ হাজার ৬৬৭ টাকা থেকে বর্তমানে এক লক্ষ ২২ হাজার ২১৩ টাকা, পরিমাণটা আপাত দৃষ্টিতে অনেক বড়ো মনে হলেও বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে এই সংখ্যাটাও অতি নগণ্য বলছেন সংশ্লিষ্টরা।
আকারে ছোট বিশ্ববিদ্যালয় হওয়ার ফলে এর নিজস্ব আয়ের পরিমাণও কম। ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৪ কোটি ৯০ লক্ষ টাকা, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৫ কোটি ৬০ লক্ষ টাকা, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৭ কোটি ১০ লাখ টাকা এবং সর্বশেষ ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সেটির পরিমাণ ৮ কোটি ১০ লাখ টাকা। প্রতি অর্থবছরেই সংখ্যাটা বাড়লেও পরিমাণ খুবই সীমিত। ফলে যে-কোনো কাজ বাস্তবায়নের জন্য ইউজিসির অনুদানের উপর নির্ভর থাকতে হয়।
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি উন্নয়নমুখী একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম, গবেষণা ও উদ্ভাবন, অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষার্থীদের সেবাসংক্রান্ত কার্যক্রম, প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা, প্রয়োজনীয় জনবল ব্যবস্থাপনা, যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তি উন্নয়ন, গ্রন্থাগার সুবিধা, ক্যাম্পাস রক্ষণাবেক্ষণ এবং সামগ্রিক শিক্ষার মানোন্নয়ন কার্যক্রমকে দ্রুত বাস্তবায়ন, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং ত্বরান্বিত করতে বাজেট ঘাটতি এবং সীমাবদ্ধতাকে কাটিয়ে বাজেটের যুগোপযোগীকরণের কোনো বিকল্প নেই বলছেন বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্টরা।
তাদের মতে, প্রতিবছরই বাজেট ঘাটতি দীর্ঘমেয়াদে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণার পরিবেশ, সেবার মান এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতাকে দুর্বল করে দিতে পারে। যার চাক্ষুষ মেলে উদাহরণ বিশ্ববিদ্যালয়ের র্যাংকিংয়ের দিকে নজর দিলেই। বৈশ্বিক স্বীকৃত কোন প্রতিষ্ঠানের তৈরিকৃত মানদণ্ডে অন্ততপক্ষে সম্মানজনক অবস্থানে থাকা কিংবা দেশীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের র্যাংকিংয়ের উপরের দিকে অবস্থান করা, এর কোনটাই কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক নয়। ফলে এই অবস্থানকে ত্বরান্বিত করার জন্য বাজেট বৃদ্ধির কোন বিকল্প নেই।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেট বৃদ্ধির করানোর বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ সোলায়মান বলেন, আমাদের ওখানে (নির্মাণাধীন নতুন ক্যাম্পাস) প্রজেক্টে যেহেতু একটা বড়ো অঙ্কের টাকা আসবে, সেকারণেই এটা একটু স্তিমিত আছে। আবার অনেককিছু রয়েছে, যেগুলোতে আমরা স্বয়ংসম্পূর্ণ না। ফলে চাইলেও আমরা এক অর্থবছরে কাজগুলো শেষ করতে পারি না, সেকারণে পরবর্তী অর্থবছরে আমাদের কি করণীয় সেটার প্রস্তুতিটাও হয় না।
তিনি আরো বলেন, আমাদের বিদ্যমান ক্যাম্পাসে কি দরকার সেটা নির্ধারণ করবে পরিকল্পনা দপ্তর। কিন্তু সেই জায়গাটাতে আমাদের কাছে যথাযথ উপস্থাপনা না থাকায়, আমাদের চাহিদাটাই নির্ধারণ করতে পারি না। সেজন্য পরিকল্পনা এবং ইঞ্জিনিয়ারিং দপ্তরকে বারংবার সবকিছু মিলিয়ে তথ্য দেওয়ার কথা বলেছি। তাহলে আমরা আলাদা ৫০ কোটি বা এমন একটা প্রজেক্ট আকারে দেওয়ার চেষ্টা করতে পারব।