ঢাকা: পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে বড় ধরনের আলোড়ন সৃষ্টি করেছে সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসের সাম্প্রতিক সাংগঠনিক পরিবর্তন। দলটির বিদ্রোহী শিবির এবার তৃণমূলের চেয়ারম্যান পদ থেকেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কেই সরিয়ে দিয়েছে। নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন হাওড়ার বিধায়ক অরূপ রায়।
সোমবার (২২ জুন) কলকাতার নিউটাউনের একটি হোটেলে অনুষ্ঠিত বিশেষ বৈঠকে এই বড় পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বৈঠকে দলের প্রায় ৬০ জন বিধায়ক এবং কলকাতা পুরসভার অন্তত ৭০ জন কাউন্সিলর উপস্থিত ছিলেন।
ভারতীয় সংবাদ মাধ্যম আনন্দ বাজার পত্রিকার প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা গেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিধানসভার বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে সোমবার (২২ জুন) এই রুদ্ধদ্বার বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকের শুরুতেই ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় দলের সাংগঠনিক সংকটের বিষয়টি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, গঠনতন্ত্র অনুযায়ী প্রতি ৩ বছর অন্তর সর্বভারতীয় কার্যনির্বাহী কমিটি গঠন করা বাধ্যতামূলক হলেও ২০২২ সালের পর আর কোনো নতুন কমিটি গঠিত হয়নি। সেই সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা থেকেই এই জরুরি বৈঠক ডাকা হয়েছে। এরপর দ্রুত সাংগঠনিক পুনর্গঠনের মাধ্যমে ধ্বনি ভোটে অরূপ রায়কে চেয়ারম্যান হিসেবে অনুমোদন দেওয়া হয়।
নতুন কমিটিতে সহসভাপতি হিসেবে অরূপ বিশ্বাস, ফিরহাদ হাকিম, রথীন ঘোষ ও সাবিনা ইয়াসমিনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। সাধারণ সম্পাদক করা হয়েছে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়, জাভেদ খান ও সন্দীপন সাহাকে। কোষাধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন আখরুজ্জামান আনসারি।
প্রসঙ্গত, বিধানসভা নির্বাচনে ভরাডুবির পর থেকেই তৃণমূলের অভ্যন্তরে অসন্তোষ বাড়তে থাকে। বিশেষ করে বিরোধী দলনেতা ও অন্যান্য পরিষদীয় পদ নির্ধারণকে কেন্দ্র করে ‘সই জালিয়াতি’ বিতর্ক প্রকাশ্যে আসে। উলুবেড়িয়া উত্তরের বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় ও এন্টালির বিধায়ক সন্দীপন সাহা প্রথম এ অভিযোগ উত্থাপন করেন।
এরপর একে একে বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী নেতা বিদ্রোহী শিবিরে যোগ দেন। শুধু বিধানসভা নয়, সংসদীয় দলেও ভাঙন দেখা দেয়। একাধিক সাংসদ দল ছাড়েন এবং নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মে যোগ দেন। তৃণমূলের বিভিন্ন স্তরেও বিভক্তি স্পষ্ট হতে থাকে।
বৈঠকে বিদ্রোহী নেতারা দাবি করেন, তারাই প্রকৃত তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতিনিধিত্ব করছেন। নতুন কমিটি ঘোষণার মাধ্যমে তারা সাংগঠনিক বৈধতার দাবিও উত্থাপন করেন। বৈঠকে তৃণমূলের নতুন রাজ্য সভাপতি চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যের ছেলে ও কলকাতা পুরসভার কাউন্সিলর সৌরভ বসুকেও উপস্থিত দেখা যায়।
তবে এই বৈঠক ও সিদ্ধান্তকে গুরুত্ব দিতে নারাজ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুগতরা। তৃণমূলের বিধায়ক কুণাল ঘোষ বলেন, ‘তৃণমূল আর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সমার্থক। দলের সাংগঠনিক কাঠামো অনুযায়ী এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার কোনো এখতিয়ার বিদ্রোহী গোষ্ঠীর নেই।’
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি শুধু নেতৃত্ব পরিবর্তনের ঘটনা নয়, বরং তৃণমূল কংগ্রেসের ভেতরে নতুন ক্ষমতার কেন্দ্র গড়ে ওঠার ইঙ্গিত। দীর্ঘদিন ধরে দলের প্রধান মুখ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী হিসেবে পরিচিত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরিবর্তে নতুন চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়া পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে দেখা হচ্ছে।