হাতুড়ির টুংটাং শব্দে ভাটা, কেমন আছেন রাজারহাটের কামাররা?
আব্দুল্লাহ আল মামুন, রাজারহাট (কুড়িগ্রাম)

X
ছবি: প্রতিনিধি
রাজারহাট উপজেলার ঘড়িয়ালডাঙ্গা ইউনিয়নের সরকারি হাট-বাজার তালিকায় কামার পাড়া বাজার নামে একটি বাজারের উল্লেখ রয়েছে।
আগুনের লাল আভা, হাপরের বাতাস আর লোহার ওপর হাতুড়ির টংটাং শব্দ—একসময় রাজারহাটের গ্রামীণ জনপদের পরিচিত দৃশ্য ছিল কামারশালা। কৃষকের লাঙলের ফাল, কাস্তে, কোদাল, দা, বঁটি কিংবা অন্যান্য সরঞ্জাম তৈরিতে কামারদের ওপর নির্ভরতা ছিল ব্যাপক।
কিন্তু আধুনিকতার সঙ্গে বদলে গেছে সেই চিত্র। বাজারে কারখানায় তৈরি বিভিন্ন সরঞ্জামের সহজলভ্যতা, কৃষিতে আধুনিক যন্ত্রের ব্যবহার এবং উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় স্থানীয় কামারশালাগুলোতে কমেছে কাজের চাপ।
এটি স্থানীয়ভাবে কামার পেশার ঐতিহাসিক স্থান বলে ধরা হলেও বর্তমানে সেখানে কতজন সক্রিয় কামার রয়েছেন, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়,গত বিশ বছর আগে আনুমানিক দুইশত বা তার অধিক কারখানা ছিলো।যা বর্তমানে পঞ্চাশটিতে এসে দাঁড়িয়েছে।
কোনো কোনো কামারশালায় এখনও জ্বলছে আগুন। নেহাইয়ের ওপর রাখা লোহার টুকরায় হাতুড়ির আঘাত পড়ছে। কিন্তু আগের মতো সারাদিন কাজের চাপ নেই বলে জানান তারা।
স্থানীয় প্রবীণ কর্মকার ধনী রাম রায় (৯৯)বলেন, গত দুইযুগ আগে আমার কারখানায় প্রায় পাচশত কর্মী কাজ করতেন,এখন সেটি চল্লিশ জনে এসে দাড়িয়েছে।
কর্মকার নিমাই রায় বলেন, ছোট বেলা থেকেই এই পেশায় জড়িত। আগে নিত্তি তৈরি করা হতো, ফলে আমরা ব্যস্ত সময় পার করতাম।পরিবারে সচ্ছলতা ছিলো। এখন আধুনিক স্কেল আসার কারণে অনেক কাজ কমেছে। পরিবার নিয়ে পড়েছি বিপাকে।
সুদির রায় কর্মকার (৭০) বলেন,দশ বছর বয়স থেকেই এই পেশায় জড়িত, এটি আমার পারিবারের একমাত্র আয়ের উৎস।এখন আধুনিকযন্ত্রপাতি আবিষ্কার হওয়ার কারণে অনেক ক্রেতা কমেছে।
হস্তশিল্প বিশেষজ্ঞরা মনে করেন,এক সময় কৃষকরা মৌসুম শুরুর আগে দা, কাস্তে, কোদাল, লাঙলের ফালসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম তৈরি ও মেরামতের জন্য কামারদের কাছে আসতেন। এখন অনেক সরঞ্জাম বাজার থেকেই কিনে নেওয়া যায়।ফলে কামারদের আয়ের উৎস দিনদিন কমে যাচ্ছে।
এলাকার সচেতন মহলের মতে,কামারদের পেশায় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো কাঁচামাল ও জ্বালানির খরচ। লোহা, কয়লা ও অন্যান্য উপকরণের দাম বাড়লেও স্থানীয় বাজারে তৈরি পণ্যের দাম সবসময় সে অনুযায়ী বাড়ানো যায় না।ফলে দীর্ঘ সময় পরিশ্রম করেও অনেক কারিগর কাঙ্ক্ষিত আয় করতে পারছেন না। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নতুন প্রজন্মের অনাগ্রহ।
প্রচণ্ড তাপের মধ্যে দীর্ঘ সময় কাজ করতে হয় কামারদের। কাজটি যেমন শারীরিকভাবে পরিশ্রমসাধ্য, তেমনি দক্ষতা অর্জনেও সময় লাগে।তাই অনেক কামারের সন্তান এই পেশায় থাকতে চাইছেন না। কেউ কৃষিকাজে, কেউ ব্যবসায় কিংবা অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন। ফলে অভিজ্ঞ কারিগরদের সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে ঐতিহ্যবাহী লোহা তৈরির কারিগরি জ্ঞানও।
সংশ্লিষ্টদের মতে, কামার পেশাকে শুধু পুরোনো একটি পেশা হিসেবে না দেখে কারুশিল্প হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। আধুনিক বাজারের চাহিদা অনুযায়ী ছুরি, দা, বঁটি, কৃষি সরঞ্জাম ও অন্যান্য লোহার সামগ্রী তৈরিতে প্রশিক্ষণ দেওয়া যেতে পারে।একই সঙ্গে প্রয়োজন সহজ শর্তে ঋণ, আধুনিক যন্ত্রপাতি, কাঁচামাল সংগ্রহে সহায়তা এবং বাজারজাতকরণের ব্যবস্থা।