বিশ্বজুড়ে চলমান ডিজেলসংকট আগামী বছরও অব্যাহত থাকতে পারে। ইরান ও ইউক্রেনের যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্য ও রাশিয়া থেকে জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন দেশে ডিজেলের মজুদও নেমে গেছে ঐতিহাসিকভাবে নিচু পর্যায়ে। ফলে বাড়তি জ্বালানি ব্যয়ের চাপ বিশ্ব অর্থনীতিতে আরও দীর্ঘ সময় থাকতে পারে বলে মনে করছেন শিল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও বাজার বিশ্লেষকরা।
ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্য ও রাশিয়া থেকে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ ডিজেল বাজারে পৌঁছাতে পারছে না। এর প্রভাব পড়েছে জ্বালানির দামে। সরবরাহ ঘাটতির মধ্যে ডিজেলের দাম রেকর্ড পর্যায়ে উঠেছে। একই সঙ্গে কৃষি, উৎপাদনশিল্প ও ভারী পরিবহনের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোতে বাড়ছে ব্যয়।
যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের দাম গ্যালনপ্রতি ৬ ডলার ছাড়িয়েছে
ডিজেলসংকটের বড় প্রভাব দেখা যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রে। চলতি মাসে দেশটিতে খুচরা ডিজেলের দাম প্রথমবারের মতো গ্যালনপ্রতি ৬ ডলার ছাড়িয়েছে। ২১ সেপ্টেম্বর জাতীয় গড় দাম ৬ দশমিক ৫১ ডলারে পৌঁছায়। এক বছর আগের তুলনায় এটি প্রায় ৭৬ শতাংশ বেশি।
জ্বালানির এই বাড়তি দাম কৃষক, ট্রাকচালকসহ ডিজেলনির্ভর ব্যবসার ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে। পরিবহন ব্যয় বাড়ায় এর প্রভাব পণ্য সরবরাহ, উৎপাদন ও ভোক্তা পর্যায়ের দামেও পড়তে পারে।
মজুদের চিত্রেও সংকটের ইঙ্গিত
ডিজেল সরবরাহ পরিস্থিতির আরেকটি চিত্র পাওয়া যাচ্ছে সংরক্ষণ বা স্টোরেজ বাজারে। স্টোরেজ ব্রোকার প্রতিষ্ঠান ‘দ্য ট্যাংক টাইগার’-এর তথ্য অনুযায়ী, উত্তর আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলে ডিজেল সংরক্ষণের জন্য ভাড়ার ট্যাংকের প্রাপ্যতা বেড়েছে। এর কারণ হিসেবে বাজারে মজুদ করার মতো পর্যাপ্ত ডিজেল না থাকায় অনেক প্রতিষ্ঠান বিদ্যমান স্টোরেজ লিজ নবায়ন না করাকে উল্লেখ করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে ১১ সেপ্টেম্বর ডিজেলের মজুদ কমে ১০৭ দশমিক ৯ মিলিয়ন ব্যারেলে দাঁড়িয়েছে, যা ওই সময়ের হিসাবে ১৯৮২ সালে রেকর্ড সংরক্ষণ শুরুর পর সর্বনিম্ন। দেশটির এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (EIA) পূর্বাভাস দিয়েছে, ২০২৬ সালের শেষভাগ এবং ২০২৭ সালের বেশিরভাগ সময়ও ডিজেলের মজুদ পাঁচ বছরের গড়ের নিচে থাকতে পারে।
২০২৭ সালেও থাকতে পারে সরবরাহের চাপ
বাজারের মজুদ পরিস্থিতি ও শিল্পসংশ্লিষ্টদের বক্তব্যের ভিত্তিতে ডিজেলের সরবরাহে বড় ধরনের স্বস্তি দ্রুত ফিরবে না বলেই ধারণা করা হচ্ছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অন্তত ২০২৭ সালের প্রথম প্রান্তিক পর্যন্ত বাজারে সরবরাহ সংকটের চাপ থাকতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রাশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের পরিশোধনাগার ও জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থায় ক্ষয়ক্ষতির কারণে স্বাভাবিক সরবরাহ ফিরিয়ে আনতে সময় লাগবে। চীনের বাড়তি ডিজেল রপ্তানি ও উচ্চ পরিশোধন মুনাফা কিছুটা স্বস্তি দিতে পারে। তবে ইরান বা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের আরও অবনতি কিংবা বড় কোনো পরিশোধনাগার বন্ধ হয়ে গেলে জ্বালানির দাম আবারও বাড়তে পারে।
দীর্ঘস্থায়ী ডিজেলসংকটের ফলে কৃষি, পরিবহন, উৎপাদনসহ বিভিন্ন খাতের ব্যয় বাড়তে পারে। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত খাদ্য উৎপাদন, পণ্য পরিবহন ও দৈনন্দিন ভোগ্যপণ্যের দামেও পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।