ঘটনার প্রকৃত কারণ জানতে স্থানীয় বাসিন্দা, প্রত্যক্ষদর্শী, অভিযুক্ত ব্যক্তি, পুলিশ ও শিশুটির পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত ১৮ সেপ্টেম্বর চাকামইয়া ইউনিয়নের এক ব্যক্তির বাড়ি থেকে একটি মানিব্যাগ চুরির অভিযোগ ওঠে শিশুটির বিরুদ্ধে। পরে রাতে তাকে ওই বাড়িতে ডেকে নেওয়া হয়। শিশুটির মাও সেখানে যান।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ফরিদা বেগম বলেন, চুন্নু তালুকদার শিশুটিকে কয়েকবার বাঁশের কঞ্চি দিয়ে আঘাত করেন। পরে তার স্ত্রী নাজমুন নাহার কঞ্চিটি ধরে ফেলেন। তবে শিশুটির বিরুদ্ধে এর আগেও বিভিন্ন চুরির অভিযোগ ছিল বলে দাবি করেন তিনি।
ফরিদা বেগম আরও বলেন, স্থানীয় কয়েকটি দোকান ও একটি বাড়িতে চুরির অভিযোগের পর শিশুটির মা তাকে কখনো কখনো শিকল দিয়ে বেঁধে রাখতেন বলে তারা দেখেছেন। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে কোনো আইনগত প্রমাণ বা মামলা হয়েছে কি না, তা তিনি জানাতে পারেননি।
চুন্নু তালুকদারের স্ত্রী নাজমুন নাহার বলেন, শিশুটির পরিবারের সঙ্গে তাদের আত্মীয়তার সম্পর্ক রয়েছে। পরিবারের পক্ষ থেকে শিশুটিকে সবসময় সহযোগিতা করা হতো। তার বিরুদ্ধে আগে নারিকেল, কাঁঠাল, শসা ও মাছ চুরির অভিযোগ উঠেছিল বলেও দাবি করেন তিনি।
নাজমুন নাহারের ভাষ্য, ওই রাতে মানিব্যাগ চুরির খবর পেয়ে তার স্বামী সেখানে যান। প্রথমে পুলিশকে দেওয়ার কথা বলা হলেও পরে তিনি মুরগি ও বিড়াল তাড়ানোর লাঠি দিয়ে শিশুটিকে কয়েকটি আঘাত করেন। তিনি এরপর আর মারতে দেননি।
তিনি বলেন, ‘জিসান আমাদের পরিবারেরই সন্তান। তাকে শাসন করতে গিয়ে এমন ঘটনা ঘটবে, দুঃস্বপ্নেও ভাবিনি। চুরি থেকে ফেরানোর জন্যই তাকে শাসন করা হয়েছিল।’
স্থানীয় দোকানি রাসেল দাবি করেন, তার স্ত্রীর জানাজার সময় তার দোকান থেকে বিস্কুটসহ বিভিন্ন জিনিস চুরি হয়েছিল। এ ঘটনায় তিনি শিশুটির সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ করেন। স্থানীয় বাসিন্দা মুজাফফর গাজীও সম্প্রতি তার পকেট থেকে টাকা নেওয়ার চেষ্টা করার অভিযোগ করেন শিশুটির বিরুদ্ধে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে শিশুটির বক্তব্য ভিন্ন। শিশুটি জানায়, ওই রাতে সে ওই বাড়িতে গেলেও মানিব্যাগ থেকে টাকা নেয়নি। একটি খালি মানিব্যাগ পেয়েছিল বলে দাবি করে সে। তাকে অন্যায়ভাবে মারধর করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করে।
মানিব্যাগ চুরির অভিযোগ ওঠা বাড়ির মালিক আবদুল হাই তালুকদার বলেন, শিশুটিকে বাড়িতে আনার পর তার মা মানিব্যাগ ও কিছু কাগজপত্র ফেরত দেন। মানিব্যাগে ৫ হাজার টাকা ছিল, তবে সেই টাকা ফেরত দেওয়া হয়নি বলে দাবি করেন তিনি।
আবদুল হাই বলেন, শিশুটির বাবা তার আত্মীয় ছিলেন এবং তিনি মারা যাওয়ার আগে জমি বন্ধক বাবদ ৫০ হাজার টাকা দিয়েছিলেন। ওই জমি শিশুটির মা চাষ করছেন। জমি নিয়ে কোনো বিরোধ নেই দাবি করে তিনি বলেন, চুরির ঘটনাকে অন্যদিকে নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।
শিশুটিকে শাসন করা প্রসঙ্গে আবদুল হাই বলেন, আত্মীয়তার কারণে নাতির মতো মনে করে শাসন করা হলেও এভাবে মারধর করা ভুল হয়েছে। তবে শিশুটির মাকে মারধরের অভিযোগ তিনি অস্বীকার করেন।
অন্যদিকে অ্যাডভোকেট চুন্নু তালুকদার বলেন, শিশুটি তার রক্তের নাতি এবং দীর্ঘদিন ধরে তার বাড়িতে যাতায়াত করে। শিশুটির বিরুদ্ধে আগে যেসব অভিযোগ এসেছে, সেগুলোও তিনি পরিবারের সঙ্গে আলোচনা করে সামাল দিয়েছেন বলে দাবি করেন।
চুন্নু তালুকদার বলেন, ‘আমার নাতিকে আমি চুরি থেকে ফেরানোর জন্য শাসন করেছি। তবে রাগের মাথায় মারধর করাটা ভুল হয়েছে।’
পুলিশের ভূমিকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তিনি চাকামইয়া এলাকায় দায়িত্বে থাকা এএসআই মিজানকে ফোন করেছিলেন। শিশুটির বয়স কম হওয়ায় তাকে চড়-থাপ্পড় দিয়ে ছেড়ে দিতে বলা হয়েছিল বলে দাবি করেন তিনি। তবে গোয়ালঘরে শিশুটিকে বেঁধে রাখা এবং তার মাকে মারধরের অভিযোগ অস্বীকার করেন।
কলাপাড়া থানার এএসআই মিজান বলেন, ‘ওই রাতে চুন্নু সাহেব আমাকে ফোন দিয়েছিলেন, এটা সত্য। তবে আমি তখন সাক্ষ্য দিতে অন্য এলাকায় অবস্থান করছিলাম। তাই তাকে থানার ডিউটি অফিসারকে ফোন করতে বলেছি।’
শিশুটিকে চড়-থাপ্পড় দিয়ে ছেড়ে দেওয়ার কথা তিনি অস্বীকার করেন।
এদিকে শিশুটির মা নাজমা বেগম বলেন, ছোটখাটো চুরির অভিযোগে অতিষ্ঠ হয়ে তিনি মাঝেমধ্যে ছেলেকে শিকলে বেঁধে রাখতেন। চুন্নু তালুকদার তাদের আত্মীয়, এটিও সত্য। তবে ওই রাতে চুরির অভিযোগ তুলে তাকে ও তার ছেলেকে মারধর করা হয়েছে। ভয় ও আতঙ্কে কয়েক দিন হাসপাতালে আসতে পারেননি বলেও দাবি করেন তিনি।
নাজমা ঘটনার বিচার দাবি করার পাশাপাশি তাদের জমির কাগজপত্র ফেরত দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
কলাপাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নজরুল ইসলাম বলেন, এ ঘটনায় থানায় এখনো কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়নি।