দাবি-দাওয়া ও মানুষের নিরাপত্তার বিষয়গুলো উপেক্ষিত হলে তিন পার্বত্য জেলার শান্তিপ্রিয় মানুষকে নিয়ে এক দফা কর্মসূচি ঘোষণা করে পুরো পার্বত্যাঞ্চল অচল করে দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক পরিষদের (পিসিএনপি) কেন্দ্রীয় চেয়ারম্যান কাজী মজিবর রহমান।
তিনি বলেন, পাহাড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠা ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বন্ধে সরকারকে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। প্রয়োজন হলে পাহাড়ে পুনরায় সেনা ক্যাম্প স্থাপন, সীমান্ত সড়কে বর্ডার আউটপোস্ট (বিওপি) স্থাপন এবং সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) দুপুরে রাঙ্গামাটি জেলা শহরের কাঁঠালতলী এলাকায় পিসিএনপির নিজস্ব কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক সম্প্রতি গঠিত তিনটি উচ্চপর্যায়ের জাতীয় কমিটিকে সাধুবাদ জানানো, পাহাড় থেকে সন্ত্রাস নির্মূল এবং পার্বত্য চুক্তি পুনর্মূল্যায়নের দাবিতে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।
কাজী মজিবর রহমান বলেন, ব্রিটিশ আমলে বৈষম্যের শিকার হওয়ার অভিজ্ঞতা থেকেই পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলন গড়ে উঠেছিল। পরে পাকিস্তান রাষ্ট্র বৃহত্তর বাঙালি জনগোষ্ঠীর সঙ্গে বৈষম্যমূলক আচরণ করায় ২৪ বছরের মধ্যেই স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম হয়। ইতিহাসের এসব অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে পাহাড়ের মানুষের ক্ষেত্রেও বৈষম্য দূর করতে হবে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, পাহাড়ের শান্তিপ্রিয় মানুষ ও বুদ্ধিজীবীসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মহলের মতামত যথাযথভাবে না নিয়েই তৎকালীন সরকার চুক্তিটি করেছিল। পিসিএনপির দাবি, ওই চুক্তির মাধ্যমে একটি বিশেষ গোষ্ঠীর স্বার্থ পূরণ হলেও পাহাড়ের সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া চুক্তিটির বিরোধিতা করেছিলেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
বর্তমান সরকারের উদ্যোগের কথা তুলে ধরে পিসিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, পার্বত্য অঞ্চলের সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ, নীতি নির্ধারণ এবং জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় সরকার তিনটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করেছে। এ উদ্যোগকে তারা স্বাগত জানাচ্ছেন। একই সঙ্গে পাহাড়ের মানুষের বিভিন্ন দাবি সরকারের কাছে তুলে ধরা হচ্ছে।
তিনি বলেন, কখনো ২০ দফা, আবার কখনো ৮ দফা দাবি জানানো হচ্ছে। কিন্তু এসব দাবি উপেক্ষিত হয়ে মানুষের দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে তিন পার্বত্য জেলার শান্তিপ্রিয় মানুষকে নিয়ে এক দফা ঘোষণা করা হবে। তখন পুরো পার্বত্যাঞ্চল অচল করে দেওয়ার মতো কর্মসূচি দেওয়া হবে।
পাহাড়ে বসবাসকারী পাহাড়ি ও বাঙালি সবাই শান্তিপ্রিয় দাবি করে কাজী মজিবর রহমান বলেন, অল্পসংখ্যক মানুষ নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে। বিয়ে, হাটবাজার, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রেই চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন সশস্ত্র গোষ্ঠী চাঁদার পরিমাণ আরও বাড়িয়েছে।
পাহাড়ের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তিনি পুনরায় সেনা ক্যাম্প স্থাপন, সীমান্ত সড়কে বিওপি ক্যাম্প স্থাপন এবং সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, পাহাড়ের সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ, নীতি নির্ধারণ ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় সরকার যে তিনটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করেছে, তা পার্বত্য অঞ্চলে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং পাহাড়ি-বাঙালির সম্প্রীতি সুদৃঢ় করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে পার্বত্য চুক্তি স্বাক্ষরের দীর্ঘ সময় পরও পাহাড়ে অস্ত্রের ঝনঝনানি, চাঁদাবাজি ও সশস্ত্র গোষ্ঠীর আধিপত্য পুরোপুরি বন্ধ হয়নি বলে সংবাদ সম্মেলনে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়।
জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) একটি সাম্প্রতিক বিবৃতিরও প্রতিবাদ জানানো হয়। লিখিত বক্তব্যে পিসিএনপি নেতারা অভিযোগ করেন, জেএসএস এখনো অস্ত্র ও সন্ত্রাসের পথ পুরোপুরি পরিত্যাগ করেনি। পাহাড়ে চাঁদাবাজি ও সশস্ত্র অবস্থান বজায় রেখে শান্তি চুক্তির কথা বলা বিভ্রান্তিকর।
এ ছাড়া ‘সম্প্রীতি’ পিসিজেএসএসের শিশির চাকমার সংবাদ সম্মেলনেরও তীব্র নিন্দা জানানো হয়। পিসিএনপি নেতারা বলেন, শিশির চাকমা পার্বত্য অঞ্চলের সর্বসাধারণের প্রতিনিধি নন। তাদের অভিযোগ, তিনি প্রকৃত পরিস্থিতি আড়াল করে জেএসএসের এজেন্ডা বাস্তবায়নে কাজ করছেন।
সংবাদ সম্মেলন থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে ব্যারিস্টার মীর হেলালকে স্বপদে বহাল রাখার দাবিও জানানো হয়। পিসিএনপি নেতাদের দাবি, পাহাড়ে শান্তি, সম্প্রীতি এবং সব জনগোষ্ঠীর সুষম উন্নয়নে তিনি দৃশ্যমান ভূমিকা রাখছেন।