✍🏿 মোহাম্মদ মাহবুব হোসাইন
আজ ২ অক্টোবর। শহীদ আবুল কাশেমের ২৯তম শাহাদাতবার্ষিকী। ১৯৯৭ সালের এই দিনে আততায়ীর হাতে নিহত হন খিলগাঁও ইসলামী পাঠাগার ও সমাজ কল্যাণ পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি এবং পাঠাগার আন্দোলনের নিবেদিতপ্রাণ সংগঠক শহীদ আবুল কাশেম। তাঁর মৃত্যু ছিল তাঁর পরিবার, স্বজন, সহকর্মী ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের জন্য গভীর বেদনার; একই সঙ্গে পাঠাগার আন্দোলন, সমাজসেবা এবং ধর্মীয়-সামাজিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত মানুষের জন্যও তা ছিল এক অপূরণীয় ক্ষতি।
শহীদ আবুল কাশেমের জন্ম কুমিল্লা জেলার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার বাতিসা গ্রামে। তাঁর পিতা মরহুম আব্দুল কাদির ছিলেন একজন স্কুলশিক্ষক। মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা, জ্ঞানচর্চা এবং সমাজের কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করার যে মানসিকতা পরবর্তী সময়ে তাঁর কর্মজীবনের বৈশিষ্ট্য হয়ে উঠেছিল, তার বীজ যেন প্রোথিত ছিল তাঁর শৈশবেই।
১৯৭৭ সালে খিলগাঁওয়ের একদল প্রতিশ্রুতিশীল ও সমাজসচেতন যুবককে সঙ্গে নিয়ে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন খিলগাঁও ইসলামী পাঠাগার ও সমাজ কল্যাণ পরিষদ। সীমিত সামর্থ্য, নানা প্রতিকূলতা ও বাস্তবতার বাধা পেরিয়ে প্রতিষ্ঠিত এই পাঠাগার ধীরে ধীরে জ্ঞানচর্চা, পাঠাভ্যাস ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের একটি পরিচিত কেন্দ্রে পরিণত হয়। বইকে তিনি নিছক বিনোদন বা অবসর কাটানোর উপকরণ হিসেবে দেখেননি; বরং মানুষের চিন্তা, মনন, নৈতিকতা ও জীবনবোধ গঠনের শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করতেন। তাঁর কাছে একটি পাঠাগার ছিল আলোকিত সমাজ নির্মাণের একটি ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান।
এই উদ্যোগের সঙ্গে সে সময় খিলগাঁওয়ের অনেক উদ্যমী ও সমাজসচেতন মানুষ সম্পৃক্ত হয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন হোসাইন আল মাসুম, খোদা বকস শহীদ, শাহ আব্দুল হালিম, মাহবুব এলাহী স্বপন, মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম, ফরীদ আলম চৌধুরী, ইঞ্জিনিয়ার আব্দুস সোবহান মারুফ, ইকবাল করিম নেপু, হাফেজ কামাল, জাহাঙ্গীর জলিল, ইঞ্জিনিয়ার আব্দুস সাত্তার ফারুক, অধ্যাপক ফজলুল করিম, আনিছুর রহমান, মাসুমুর রহমান আকবরী, মুহাম্মদ শাহজাহানসহ আরও অনেকে। তাঁদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা পাঠাগারটিকে শুধু বই পড়ার স্থান হিসেবে নয়, বরং সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের একটি প্রাণবন্ত কেন্দ্রে পরিণত করতে সহায়তা করে।
শহীদ আবুল কাশেমের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের পেছনে অনুপ্রেরণার অন্যতম উৎস ছিলেন সাবেক সচিব এবং দুর্নীতি দমন সংস্থার সাবেক মহাপরিচালক মরহুম শাহ আব্দুল হান্নান। তাঁদের পারস্পরিক সম্পর্ক ও সহযোগিতা বিভিন্ন সামাজিক ও কল্যাণমূলক উদ্যোগকে এগিয়ে নিতে ভূমিকা রেখেছিল।
খিলগাঁও ইসলামী পাঠাগারের সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে বহু বিশিষ্ট ব্যক্তি সম্পৃক্ত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে আজীবন সদস্য হিসেবে ছিলেন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান, জেনারেল হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ, উপ-রাষ্ট্রপতি এ কে এম নুরুল ইসলাম, বেগম খালেদা জিয়া, মির্জা আব্বাস, পুলিশের সাবেক আইজি ই এ চৌধুরী, সাবেক সেনাপ্রধান নূর উদ্দিন খান, দৈনিক ইত্তেফাকের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক মরহুম তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার কন্যা আখতারুন নাহার, মীর কাশেম আলী, সাংবাদিক সানাউল্লাহ নূরী, এফ এম ইয়াহিয়া, সাবেক সচিব ওমর ফারুক, লেখক ও সম্পাদক আবুল আসাদ, মালেক মিনার, কমোডর আতাউর রহমান, মাওলানা আবুল কালাম আজাদসহ আরও অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তি। তাঁদের প্রত্যেকেরই কোনো না কোনোভাবে এই পাঠাগারের কর্মকাণ্ডে অবদান ছিল বলে সংশ্লিষ্টদের স্মৃতিতে রয়েছে।
শহীদ আবুল কাশেমের কর্মময় জীবনের আরেকটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায় ছিল ঢাকায় পবিত্র কোরআনের তাফসির মাহফিল আয়োজন। মানুষের কাছে কোরআনের শিক্ষা ও ইসলামী জ্ঞান সহজভাবে পৌঁছে দেওয়ার উদ্দেশ্যে তিনি বিভিন্ন স্থানে তাফসির মাহফিলের আয়োজন করতেন। এসব মাহফিলে খ্যাতনামা ইসলামিক স্কলার শহীদ আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী প্রধান আলোচক হিসেবে বক্তব্য রাখতেন। ধর্মীয় জ্ঞানচর্চাকে তিনি মানুষের নৈতিক ও আত্মিক উন্নয়নের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে দেখতেন। তাঁর এসব উদ্যোগের মূল লক্ষ্য ছিল সাধারণ মানুষের মধ্যে ধর্মীয় জ্ঞান ও মূল্যবোধের চর্চাকে আরও বিস্তৃত করা।
তাঁর সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডও ছিল বহুমাত্রিক। বিশেষ করে বিপদগ্রস্ত ও অসহায় নারীদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা ছিল তাঁর মানবিক উদ্যোগগুলোর অন্যতম। নারী সমাজের সম্ভ্রম ও নিরাপত্তা রক্ষার লক্ষ্যে তিনি বেসরকারি উদ্যোগে ‘মহিলা আশ্রয়কেন্দ্র’ প্রতিষ্ঠা করেন। অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং বিপদের সময়ে তাঁদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করার এই উদ্যোগ তাঁর মানবিক চিন্তা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার পরিচয় বহন করে।
নারীর সম্ভ্রম রক্ষার প্রতীক হিসেবে শবমেহেরকে ঘিরেও তিনি একটি সামাজিক প্রতিবাদের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। শবমেহেরকে প্রতিবাদের প্রতীক হিসেবে সামনে রেখে প্রতি বছর ৯ এপ্রিল জাতীয় প্রেসক্লাবে ‘শবমেহের দিবস’ পালনের ব্যবস্থা করেছিলেন তিনি। এর মধ্য দিয়ে নারী সমাজের সম্ভ্রম, নিরাপত্তা ও অধিকার সম্পর্কে সামাজিক সচেতনতা তৈরির চেষ্টা করেছিলেন।
শহীদ আবুল কাশেমের জীবনকে এক কথায় বর্ণনা করতে গেলে বলতে হয়—তিনি ছিলেন কর্মমুখর, স্বপ্নবান এবং মানুষের কল্যাণে নিবেদিতপ্রাণ একজন মানুষ। পাঠাগার প্রতিষ্ঠা, পাঠাভ্যাস সৃষ্টি, জ্ঞানচর্চার প্রসার, ধর্মীয় জ্ঞানচর্চার আয়োজন এবং বিভিন্ন সামাজিক কল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে তিনি তাঁর জীবনকে মানুষের জন্য উৎসর্গ করেছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, একটি সমাজকে সত্যিকার অর্থে পরিবর্তন করতে হলে শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়ন যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন জ্ঞান, নৈতিকতা, মানবিকতা এবং মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধ। তাঁর কর্মধারায় সেই বিশ্বাসেরই প্রতিফলন ঘটেছে।
১৯৯৭ সালের ২ অক্টোবর আততায়ীর হাতে তাঁর জীবনাবসান ঘটে। তাঁর আকস্মিক মৃত্যু পরিবার, সহকর্মী, শুভাকাঙ্ক্ষী এবং তাঁর সঙ্গে সম্পৃক্ত অসংখ্য মানুষের হৃদয়ে গভীর শোকের ছায়া ফেলেছিল। কিন্তু একজন মানুষের জীবনাবসান তাঁর স্বপ্ন ও কর্মেরও অবসান ঘটায় না। শহীদ আবুল কাশেমের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। তাঁর প্রতিষ্ঠিত পাঠাগার, সমাজকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ড এবং মানুষের জন্য রেখে যাওয়া স্মৃতিগুলো তাঁকে আজও স্মরণীয় করে রেখেছে।
আজ তাঁর ২৯তম শাহাদাতবার্ষিকীতে তাঁকে স্মরণ করা মানে শুধু অতীতের একজন সমাজকর্মীকে স্মরণ করা নয়; বরং তাঁর জীবন থেকে জ্ঞানচর্চা, পাঠাভ্যাস, মানবিকতা, সামাজিক দায়িত্ববোধ ও মানুষের পাশে দাঁড়ানোর শিক্ষা গ্রহণ করা। একটি পাঠাগার প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে তিনি যে আলোকিত সমাজের স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেই স্বপ্ন আজও সমান প্রাসঙ্গিক। বিশেষ করে বর্তমান সময়ে, যখন নানা কারণে বই পড়া ও গভীর জ্ঞানচর্চার অভ্যাস ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে, তখন পাঠাগার আন্দোলনের মতো উদ্যোগের প্রয়োজন আরও বেশি অনুভূত হয়।
একজন মানুষের জীবন কতটা অর্থবহ হতে পারে, শহীদ আবুল কাশেম তার একটি উদাহরণ। তিনি আজ আমাদের মাঝে শারীরিকভাবে নেই, কিন্তু তাঁর কর্ম, তাঁর প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠান এবং মানুষের জন্য রেখে যাওয়া অবদান তাঁকে স্মৃতির পাতায় বাঁচিয়ে রেখেছে। মানুষ একদিন চলে যায়, সময়ও একদিন অতীত হয়ে যায়; কিন্তু মানুষের কল্যাণে করা কাজ থেকে যায়। সেই কাজের মধ্যেই বেঁচে থাকে একজন মানুষের স্মৃতি, স্বপ্ন ও আদর্শ।
শহীদ আবুল কাশেমের জীবন আমাদের কাছে সেই বার্তাই রেখে যায়—একটি ভালো উদ্যোগ কখনোই ছোট নয়। একটি বই, একটি পাঠাগার, একটি মানবিক উদ্যোগ কিংবা একজন অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো—এসব ছোট ছোট কাজই একসময় বৃহত্তর সমাজে পরিবর্তনের ভিত্তি তৈরি করতে পারে।
আজ তাঁর শাহাদাতবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধায় তাঁকে স্মরণ করছি। হে আল্লাহ, তোমার দ্বীন প্রচার এবং মানুষের কল্যাণে নিবেদিতপ্রাণ আমাদের প্রিয় ভাই শহীদ আবুল কাশেমকে তুমি শাহাদাতের মর্যাদা দান করো। তাঁর জীবনের সৎকর্মগুলো কবুল করো, তাঁর ভুলত্রুটি ক্ষমা করো এবং তাঁকে তোমার অশেষ রহমতের ছায়াতলে স্থান দাও। তাঁর পরিবার, সহকর্মী ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের উত্তম প্রতিদান দাও। তাঁর রেখে যাওয়া কল্যাণমূলক কাজগুলো কবুল করে তা মানুষের জন্য আরও উপকারী করে দাও।
আমিন।
লেখক:
ফ্রান্স থেকে সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী
mahbubhossain786@yahoo.com