শরতের বিদায়লগ্নে চলনবিল এলাকার রায়গঞ্জ ও তাড়াশের বিস্তীর্ণ পথপ্রান্ত জুড়ে ফুটে রয়েছে শুভ্র বিন্নার ফুল। মেঠো পথের দুপাশে বাতাসে দোল খাওয়া সেই বিন্না ঘাসের ফুল পরম মমতায় তুলছিলেন একদল আদিবাসী নারী।
বছরের এই নির্দিষ্ট সময়টাতে মাঠে কৃষিকাজের কোনো সুযোগ থাকে না। অভাবের সংসারে কিছুটা আর্থিক আশ্রয় খুঁজে নিতে এবং সংসার খরচ সাশ্রয় করতে বিন্না ঘাসের ফুল দিয়ে সুন্দর ঝাড়ু তৈরি করবেন তারা। এরপর সেই ঝাড়ু স্থানীয় হাট-বাজারে বিক্রি করে যা আয় হবে, তা দিয়েই কোন মতে সংসার চলে আদিবাসী পরিবার গুলির । কথাগুলো বলছিলেন সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ উপজেলার বাসাইল ও পশ্চিম আটঘোরিয়া জেসনা রানী মাহাতো, কুসুম রানী মাহাতো, চন্দনা রানী ওঁরাও।
মহাজনি ঋণের জালে বন্দি জীবন আর আগাম শ্রম বিক্রি করেও তাঁদের দিন কাটে নিদারুণ টানাটানিতে। হেমন্ত ও শরতের এই সময়টায় স্থানীয় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী অধ্যুষিত এলাকায় কর্মসংস্থানের সুযোগ বলতে গেলে একেবারেই থাকে না।
মাঠে ধান রোপণ, পাকা ধান তোলার মৌসুম কিংবা ইটভাটায় কাঁচা ইট তৈরির কাজ—সবকিছুই বন্ধ থাকে। ফলে তীব্র অর্থসংকটে পড়েন এই খেটে খাওয়া মানুষগুলো। জীবন ধারণের তাগিদে বাধ্য হয়েই অনেকে আগাম শ্রম বিক্রি শুরু করেন। প্রকৃতপক্ষে, এই অঞ্চলের প্রায় ৭৫ থেকে ৮০ ভাগ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নারী কৃষিশ্রম বিক্রি করেই তাঁদের সংসার টিকিয়ে রেখেছেন।
স্থানীয় সুত্রে জানা যায়, জেলার তাড়াশ ও রায়গঞ্জ উপজেলায় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নারী-পুরুষ বসবাস করেন। তাঁদের মধ্যে ওঁরাও, মাহাতো, রাজবংশী, রবিদাস, কনকদাস, মুরারী, বসাইক ও সাঁওতালসহ নানা সম্প্রদায়ের মানুষের আবাসন রয়েছে। কালের পরিক্রমায় ঐতিহ্য ও জীবিকায় এসেছে আমূল পরিবর্তন।
একসময় এসব সম্প্রদায়ের মানুষ বনাঞ্চলে ঘুরে শিয়াল, খরগোশ, কুঁইচা, বেজি ও কচ্ছপসহ নানা প্রজাতির বন্যপ্রাণী শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। তবে সময়ের ব্যবধানে বন জঙ্গল উজাড় হয়ে যাওয়ায় তাঁদের সেই ঐতিহ্যবাহী জীবিকার পথ চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়।
বেঁচে থাকার তাগিদে পরবর্তীতে আদিবাসী নারীরা পরিবারের পুরুষ সদস্যদের পাশাপাশি মাঠেঘাটে, গৃহস্থের বাড়িতে কিংবা ইটের ভাটায় দিনমজুর হিসেবে কাজ শুরু করেন।
তাড়াশ আদিবাসী নারী মিনতি রানী ওঁরাও নিজের কষ্টের কথা জানিয়ে বলেন, "আশ্বিন ও কার্তিক মাসে আমাদের হাতে কোনো কাজ থাকে না। তাই অগ্রহায়ণ ও পৌষ মাসে মাঠে বোরো ধান লাগানো কিংবা ধান কাটার কাজের জন্য এখন থেকেই অনেকের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হচ্ছি। পরিবার বাঁচানোর তাগিদে দিনে মাত্র ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকায় আগাম শ্রম বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছি।
তবে গৃহস্থালি কাজের ফাঁকে বিন্না ঘাসের ফুল দিয়ে ঝাড়ু বানিয়ে বাজারে ১০০ থেকে ১২০ টাকায় বিক্রি করতে পারি। এতে করে এই চরম মন্দার দিনেও সংসারে বাড়তি কিছুটা আয় যুক্ত হয়।"
আদিবাসী সম্প্রদায়ের এই করুণ জীবনসংগ্রামের বিষয়ে সিরাজগঞ্জ জেলা আদিবাসী বহুমুখী উন্নয়ন সংস্থা সভাপতি নির্মল মাহাতো বলেন, জেলায় বসবাসকারী আদিবাসীদের সিংহভাগই অত্যন্ত দরিদ্র।
পরিবার চালাতে নারী-পুরুষ উভয়কেই মাঠে কঠোর পরিশ্রম করতে হয়। বছরের এই নির্দিষ্ট সময়টাতে কাজ না থাকায় শ্রমজীবী পরিবারগুলো সংসার চালাতে গিয়ে চরম হিমশিম খায়। তাই কম দামে আগাম শ্রম বিক্রির পাশাপাশি বিন্নার ফুল কুড়িয়ে ঝাড়ু বানিয়ে যেকোনো উপায়ে জীবিকা টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন তাঁরা। প্রতিদিন একজন নারী ২০০-২৫০ টাকা ঝাঁড়ু বিক্রি করে।