অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, রাজস্ব আয় বাড়ানো এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে সামনে রেখে পাঁচ বছর মেয়াদি অর্থনৈতিক কৌশল বাস্তবায়ন করতে চায় বাংলাদেশ সরকার। এসব অগ্রাধিকারের সঙ্গে বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) নীতিগত ঐকমত্য তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।
থাইল্যান্ডের ব্যাংককে ১২ অক্টোবর শুরু হওয়া বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের বার্ষিক সভায় অংশ নিচ্ছে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদল। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে এ দলে রয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আহসান হাবিবসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। সরকার আন্তর্জাতিক সহযোগিতার পাশাপাশি দেশের নিজস্ব অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও অগ্রাধিকার বিবেচনায় সংস্কার কর্মসূচি এগিয়ে নিতে চায়।
উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীরের মতে, ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা ছাড়া বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর লক্ষ্য অর্জন কঠিন। আগের সময়ে আর্থিক খাতে অনিয়ম ও ঋণসংক্রান্ত বিশৃঙ্খলার দায় এখন সাধারণ মানুষকে বহন করতে হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। ক্ষতিগ্রস্ত আর্থিক ব্যবস্থাকে পুনরুদ্ধার এবং ব্যাংক খাতে আস্থা ফেরাতে পুনঃঅর্থায়ন ও কাঠামোগত সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
বিশ্বব্যাংকের ৬ অক্টোবর প্রকাশিত বাংলাদেশ অর্থনৈতিক হালনাগাদ প্রতিবেদনে ব্যাংক খাতের দুর্বলতাকে অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, খেলাপি ঋণের অনুপাত ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের ৩০ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৬ সালের জুনে ৩৩ দশমিক ২ শতাংশ হয়েছে। সংস্থাটি বলছে, আর্থিক খাতের দুর্বলতা ঋণপ্রবাহ ও বিনিয়োগকারীদের আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
ব্যাংক খাতের সংস্কারে বিশ্বব্যাংক জুনে ৪৫০ মিলিয়ন ডলারের অর্থায়ন অনুমোদন করেছে। এর লক্ষ্য আমানত সুরক্ষা জোরদার, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকি সক্ষমতা বাড়ানো এবং ব্যাংক পুনর্গঠনের কাঠামো তৈরি করা। অন্যদিকে, নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনায় আইএমএফ দুর্বল ব্যাংকগুলোর সমস্যা সমাধানে সময়সীমা এবং রাজস্ব আদায়ে নির্দিষ্ট লক্ষ্য চাইতে পারে বলে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে।
সরকারের আরেকটি বড় লক্ষ্য কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানো। উপদেষ্টার বক্তব্য, কর অব্যাহতি ও করসংক্রান্ত অনিয়মের কারণে রাজস্ব আহরণ কমে যাওয়ায় সরকারের উন্নয়ন ও সামাজিক সুরক্ষা খাতে ব্যয় নির্বাহ কঠিন হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনেও বাংলাদেশের রাজস্ব সংগ্রহের সীমাবদ্ধতার বিষয়টি উঠে এসেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রাজস্ব সংগ্রহের পরিমাণ মোট দেশজ উৎপাদনের ৮ দশমিক ৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। রাজস্ব আয় বাড়াতে করব্যবস্থার কার্যকারিতা, করজাল সম্প্রসারণ এবং কর ফাঁকি কমানোর উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। তবে অতিরিক্ত করের চাপ যেন উৎপাদন, বিনিয়োগ ও নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর অযৌক্তিক বোঝা না বাড়ায়, সেটিও বিবেচনায় রাখতে হবে। সরকারের সামনে তাই রাজস্ব বাড়ানো এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রাখার মধ্যে ভারসাম্য তৈরির চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
সামাজিক সুরক্ষা সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সহায়তা দিতে ফ্যামিলি কার্ডের মতো কর্মসূচি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন উপদেষ্টা। তার দাবি, স্বাধীন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মূল্যায়নে এ ধরনের কর্মসূচি কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে পাঁচ বছরে দারিদ্র্যের হার প্রায় পাঁচ শতাংশ কমতে পারে। তবে এ ফলাফল কর্মসূচির আওতা, সুবিধাভোগী নির্বাচন, অর্থায়ন ও বাস্তবায়নের দক্ষতার ওপর নির্ভর করবে।
বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশে দারিদ্র্য ও বৈষম্য বেড়েছে। আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২১ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যের মধ্যে পড়েছে। একই সময়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি থমকে যাওয়ার এবং নারীদের কর্মসংস্থান কমার কথাও বলা হয়েছে।
Scale Your Newsportal
Blazing-fast frontend, robust backend & ad monetization ready.
Scale Your Newsportal
Blazing-fast frontend, robust backend & ad monetization ready.