বাগেরহাটের ১৩ বছর বয়সী শ্যামলীর বিয়েতে পরিবারের সম্মতি ছিল। দারিদ্র্যের মধ্যে মেয়েকে বিয়ে দিলে তার ভবিষ্যৎ নিরাপদ হবে- এমন ধারণা থেকে পরিবারট সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কিন্তু বিয়ের পর স্বামী মোটরসাইকেল কেনার জন্য যৌতুক দাবি করে, শ্যামলীকে শারীরিক নির্যাতন করে, পরে ব্যবসার জন্যও টাকা চায়। ঋণ করে দাবির টাকা জোগাড় করেও মেয়েকে রক্ষা করতে পারেননি শ্যামলীর মা। একপর্যায়ে শ্যামলীকে স্বামীর বাড়ি ছাড়তে হয়েছে, পরে তার বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে।
জাতিসংঘের বাংলাদেশবিষয়ক ওয়েবসাইটে ১২ অক্টোবর প্রকাশিত এক বিবরণে উঠে এসেছে এই ঘটনা। একই বিবরণে বলা হয়েছে, পরে ১৫ বছর বয়সী আরেক কিশোরীর বিয়ের প্রস্তাবে রাজি না হওয়া এক ঘটক জানতে পারে, কয়েক দিনের মধ্যেই তাকে অন্য এলাকায় ৪০ বছর বয়সী এক পুরুষের সঙ্গে গোপনে বিয়ে দেওয়া হয়েছে।
ঘটনা দুটো বাল্যবিবাহ প্রতিরোধের মৌলিক দুর্বলতা সামনে নিয়ে এসেছে। কোনো একজন ব্যক্তি বিয়েতে আপত্তি জানালেন, কোনো কমিটি উদ্যোগ নিল কিংবা প্রশাসন বিয়ে বন্ধ করল- তাতে কিন্তু শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত হচ্ছে না। একটি বিয়ের আয়োজন বন্ধ হওয়ার পর পরিবার আবার উদ্যোগ নিলে নজর রাখার কেউ নেই।
হাওরে অনেক গ্রামে দেখেছি অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েকে আত্মীয়রা হাওরের মাঝখানে নৌকায় নিয়ে গিয়ে বিয়ে দিয়েছে। মেয়ে খালার বাড়ি বেড়াতে গেছে বলে অন্য গ্রামে নিয়ে গিয়ে বিয়ে দিয়েছে। বিয়েতে দেনমোহর শক্ত না হলেও যৌতুকের টাকা লেখা হয়েছে ঋণের নামে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও ইউনিসেফের গতবছরের মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভেতে দেখা গেছে, ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী নারীদের ৪৭ দশমিক ২ শতাংশের বিয়ে হয়েছে ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে। ১৩ দশমিক ৪ শতাংশের বিয়ে হয়েছে ১৫ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে। ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী মেয়েদের ৩৮ দশমিক ৯ শতাংশ বর্তমানে বিবাহিত বলেও জরিপে উঠে এসেছে।
আমরা জানি, বাল্যবিবাহের পরিণতি শুধু অল্প বয়সে সংসার শুরু করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এতে মেয়েদের শিক্ষাজীবন ব্যাহত হয়, অল্প বয়সে গর্ভধারণ ও প্রসবজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ে, অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ সংকুচিত হয়ে পড়ে।
পারিবারিক সহিংসতা ও নির্যাতনের মুখে পড়লেও অনেকের পক্ষে সাহায্য চাওয়া কঠিন হয়ে যায়। যে পরিবার ভবিষ্যৎ নিরাপদ করার আশায় অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের বিয়ে দেয়, সেই সিদ্ধান্তই কখনো তার নিরাপত্তা ও স্বাধীনতার জন্য দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি করে।
অবস্থাদৃষ্টে একথা স্পষ্ট যে, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে শুধু আইন প্রয়োগ করলে আজ হচ্ছে না। তাতে হয়তো বিচ্ছিন্নভাবে দু-একটা বাল্যবিবাহ বন্ধ করা যাচ্ছে কিন্তু বাল্যবিবাহের ঝুঁকি থেকে শিশুকে রক্ষা করা যাচ্ছে না।
এখন বাল্যবিবাহের ঝুঁকিতে থাকা প্রত্যেক শিশুর পাশে দাঁড়ানোর জন্য নির্দিষ্ট দায়িত্ব ও কার্যকর সুরক্ষাব্যবস্থা প্রয়োজন। বাংলাদেশে বাল্যবিবাহের ব্যাপকতা এই প্রয়োজনকে আরও জরুরি করে তুলেছে।
বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, ২০১৭-র ৩ ধারায় জাতীয়, জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ কমিটি গঠনের বিধান আছে। আইনের ৪ ধারায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, উপজেলা মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা, সমাজসেবা কর্মকর্তা, শিক্ষা কর্মকর্তা, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আর স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধিদের বাল্যবিবাহের খবর পেলে তা বন্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।
অর্থাৎ বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে আইনি কাঠামো বা ব্যবস্থা নেই তা বলা যাবে না। এখানে প্রশ্ন হচ্ছে, এই কাঠামো ঝুঁকিতে থাকা শিশুর কাছে কত দ্রুত পৌঁছাতে পারে এবং বিয়ে বন্ধ হওয়ার পরও তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব পালন করে কিনা!
ধরা যাক, কোনো এক ইউনিয়নে একজন অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের বিয়ে ঠিক হয়েছে- এমন খবর পেলেন একজন শিক্ষক বা প্রতিবেশী। তিনি স্থানীয় জনপ্রতিনিধিকে জানালেন। জনপ্রতিনিধি উপজেলা প্রশাসনে খবর দিলেন। এরপর আসবে আমলাতান্ত্রিক লম্বাদৌড়।
এই কর্মকর্তার দায়িত্ব শুধু বিয়ের আয়োজন বন্ধ করানো হলে প্রস্তাবের মূল উদ্দেশ্য ব্যর্থ হয়ে যাবে। বিয়ে বন্ধ হওয়ার পর সেই শিশু নিরাপদ আছে কিনা, পরিবার আবার তার বিয়ের উদ্যোগ নিচ্ছে কিনা, তার পড়াশোনা ব্যাহত হচ্ছে কিনা এবং নির্যাতন বা জোরজবরদস্তির আশঙ্কা আছে কিনা- এসব বিষয়ও এই কর্মকর্তাকে অনুসরণ করতে হবে।
প্রয়োজন অনুযায়ী সেই শিশুকে শিক্ষা, সামাজিক সুরক্ষা, মনোসামাজিক সহায়তা ও শিশু সুরক্ষাসেবার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। তবে এ কাজে শিশুর মতামত, মর্যাদা, গোপনীয়তা ও নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। সহায়তার নামে এমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া যাবে না, যাতে পরিবারের প্রতিশোধ বা সামাজিক অপমানের ঝুঁকি বেড়ে যায়।
একই সঙ্গে ইউনিয়ন পর্যায়ের বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ কমিটিগুলোকে কার্যকর করতে হবে। নিয়মিত সভা, ঝুঁকির খবর পর্যালোচনা, দায়িত্ব বণ্টন এবং গৃহীত পদক্ষেপের অগ্রগতি যাচাই করতে হবে।
কয়টি বিয়ের উদ্যোগ শনাক্ত করা হয়েছে, কত দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, কতজন শিশুকে পুনরায় বাল্যবিবাহের ঝুঁকি থেকে রক্ষা করা গেছে এবং কতজনের পড়াশোনা অব্যাহত রাখতে সহায়তা করা হয়েছে- এসব তথ্যের ভিত্তিতে কমিটির কাজ মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। শুধু কয়টি বাল্যবিয়ে বন্ধ করেছে, সেই হিসাব দিয়ে সাফল্য বিচার করা যাবে না।
কারণ, বাল্যবিবাহের ঝুঁকি অনেক সময় প্রকাশ্য থাকে না। পরিবার হয়তো প্রথমে বিয়ের কথা গোপন রাখে। কোনো শিক্ষক বা প্রতিবেশী বিষয়টি জানলেও পারিবারিক বিরোধে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় মুখ খোলেন না। আবার কোনো পরিবার বিয়ে বন্ধের পর মুচলেকা দিলেও পরবর্তী সময়ে অন্য জায়গায় নিয়ে গিয়ে বিয়ের আয়োজন করে।
তাই অভিযোগ জানানোর নিরাপদ ব্যবস্থা, দ্রুত যাচাই এবং ধারাবাহিক নজরদারি ছাড়া প্রতিরোধের উদ্যোগ দুর্বল থেকে যাবে। স্থানীয় মানুষকে জানাতে হবে কোথায় এবং কীভাবে তথ্য দিলে দ্রুত সহায়তা পাওয়া যাবে। একই সঙ্গে অভিযোগকারীর পরিচয় গোপন ও সুরক্ষিত রাখতে হবে।
বাল্যবিবাহের পেছনের আর্থসামাজিক কারণগুলোও উপেক্ষা করা যাবে না। দারিদ্র্য, মেয়েদের নিরাপত্তা নিয়ে পরিবারের উদ্বেগ, শিক্ষায় ধারাবাহিকতার অভাব এবং সামাজিক চাপ অনেক পরিবারকে অল্প বয়সে মেয়ের বিয়ের সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দেয়।
তাই আইন প্রয়োগের পাশাপাশি দরিদ্র পরিবারকে সামাজিক সুরক্ষার সঙ্গে যুক্ত করা, বিদ্যালয়ে যাতায়াতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং মেয়েদের শিক্ষা অব্যাহত রাখার ব্যবস্থা করা বাল্যবিবাহ বন্ধের অন্যতম কাজ। পরিবারকে শুধু বিয়েতে নিষেধ করলেই হবে না, বিয়ে না দিয়েও মেয়ের নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার বাস্তব সুযোগ তৈরি করতে হবে।
তবে খেয়াল রাখতে হবে দারিদ্র্য বা সামাজিক নিরাপত্তার অভাব যেন বাল্যবিবাহের ঢালাও অজুহাত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত না হয়ে যায়। অনেক সময় সামাজিক প্রথা মানতে গিয়ে পরিবার দারিদ্র্য বা নিরাপত্তাজীনতাকে বাল্যবিবাহের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে।
বাগেরহাটের শ্যামলীর অভিজ্ঞতা আমাদের দেখিয়েছে বাল্যবিবাহের ক্ষতি কোনো আশঙ্কার বিষয় শুধু নয়, বাল্যবিবাহ একজন শিশুর জীবনে বাস্তব নির্যাতন, আর্থিক চাপ আর সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার গভীর ক্ষত হয়ে দেখা দিতে পারে।
আর অন্য কিশোরীকে গোপনে বিয়ে দেওয়ার ঘটনা দেখিয়েছে, একজন ঘটকের আপত্তি বা পরিবারের সাময়িক সম্মতি যথেষ্ট নয়। ব্যক্তির সচেতনতা জরুরি, কিন্তু কার্যকর প্রতিষ্ঠান এবং সম্মিলিত উদ্যোগ ছাড়া তা অনেক সময় শিশুকে রক্ষা করতে পারে না।
প্রত্যেক ইউনিয়নে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ কর্মকর্তা ও শিশুর জন্য কার্যকর সুরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্য হবে- কোনো শিশুর বিয়ের খবর পাওয়ার পর শুধু সেই বিয়ে বন্ধ করা নয়, শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করা।
লেখক : দীপু মাহমুদ, কথাসাহিত্যিক ও সমাজ চিন্তক
Scale Your Newsportal
Blazing-fast frontend, robust backend & ad monetization ready.
Scale Your Newsportal
Blazing-fast frontend, robust backend & ad monetization ready.