সরকারের খোলাবাজারে খাদ্যশস্য বিক্রি (ওএমএস) কর্মসূচির মাধ্যমে পুষ্টিসমৃদ্ধ আটা বিতরণের পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন খাদ্যমন্ত্রী আফরোজা খানম। তিনি বলেছেন, শুধু খাদ্যের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করাই যথেষ্ট নয়, মানুষের পুষ্টির চাহিদাও পূরণ করতে হবে। বিশেষ করে শিশু ও গর্ভবতী মায়েদের পুষ্টি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
আজ বুধবার রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশে ফর্টিফিকেশন অ্যালায়েন্স অব বাংলাদেশের (এফএবি) যাত্রা শুরুর অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে খাদ্যমন্ত্রী এ কথা বলেন।
অনুষ্ঠানে চাল ও আটা-ময়দায় পুষ্টি উপাদান যোগ বাধ্যতামূলক করতে পৃথক দুটি আইন প্রণয়নের প্রস্তাব দেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। আলোচনায় সংশ্লিষ্ট খাতের বিশেষজ্ঞ ও অংশীজনেরা আইন ও বিধিমালার পাশাপাশি মান নিয়ন্ত্রণ এবং নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন।
খাদ্যে প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও খনিজ উপাদান যোগ করার প্রক্রিয়াকে ফর্টিফিকেশন বা খাদ্য সমৃদ্ধকরণ বলা হয়। এ কার্যক্রমে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব জোরদার এবং পুষ্টিসমৃদ্ধ খাদ্যের সহজলভ্যতা বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে এফএবি গঠন করা হয়েছে। আয়োজকেরা জানান, জোটটিতে সরকারি প্রতিষ্ঠান, জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা, উন্নয়ন সহযোগী, গবেষক ও বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিরা যুক্ত রয়েছেন।
অনুষ্ঠানে খাদ্য সমৃদ্ধকরণের অগ্রগতি, সুযোগ ও ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে উপস্থাপনা দেন আইসিডিডিআরবির নির্বাহী পরিচালক তাহমিদ আহমেদ। তিনি বলেন, অনেক পরিবার পর্যাপ্ত ক্যালরি পেলেও তাদের খাবারে প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও খনিজের ঘাটতি থেকে যায়। এ ঘাটতি মোকাবিলায় খাদ্য সমৃদ্ধকরণের সম্ভাবনা তুলে ধরেন তিনি।
ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের প্রস্তাব
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেন, চাল ও আটা-ময়দায় পুষ্টি উপাদান যোগ বাধ্যতামূলক করতে পৃথক দুটি আইন প্রণয়ন করা প্রয়োজন। তবে উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণের সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে বিধিমালার মাধ্যমে পর্যায়ক্রমে তা বাস্তবায়নের সময়সীমা নির্ধারণ করতে হবে।
প্রতিমন্ত্রী ২০৩০, ২০৩৫ ও ২০৪০ সালকে লক্ষ্য ধরে পর্যায়ক্রমে শতভাগ ফর্টিফিকেশন নিশ্চিত করার প্রস্তাব দেন। সরকারি খাদ্য বিতরণ কর্মসূচির পাশাপাশি হাসপাতাল, এতিমখানা, শিশুসদন ও কারাগারে পুষ্টিসমৃদ্ধ চাল ও আটা ব্যবহারের পরামর্শ দেন তিনি। পরবর্তী সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও তিন বাহিনীর রেশনের চালও এ কার্যক্রমের আওতায় আনার প্রস্তাব দেন তিনি।

মান নিয়ন্ত্রণ ও তদারকিতে জোর
অনুষ্ঠানে ‘বাংলাদেশে খাদ্য ফর্টিফিকেশনের জন্য সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব জোরদারকরণ’ শীর্ষক প্যানেল আলোচনায় বক্তারা বলেন, শুধু আইন ও নীতিমালা প্রণয়ন করলেই হবে না, সেগুলোর কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ, উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্ধারিত মান অনুসরণ এবং পণ্যের গুণগত মান নিয়মিত যাচাই করা প্রয়োজন।
আলোচকেরা অণুপুষ্টি উপাদান ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি আমদানিতে কর কমানো এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উৎপাদকদের আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়ার সুপারিশ করেন। পাশাপাশি ভোক্তাদের সচেতনতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন তাঁরা। তাঁদের বক্তব্যে উঠে আসে, উৎপাদন পর্যায়ে মান নিয়ন্ত্রণ এবং নিয়মিত নিয়ন্ত্রক তদারকি নিশ্চিত করা না গেলে খাদ্য সমৃদ্ধকরণের কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া কঠিন হবে।
এফএবির লক্ষ্য ও প্রত্যাশিত অবদান নিয়ে উপস্থাপনায় টেকনোসার্ভ বাংলাদেশের কান্ট্রি প্রোগ্রাম ম্যানেজার মো. গুলজার আহমেদ বলেন, অপুষ্টি কমাতে বাংলাদেশ অগ্রগতি অর্জন করলেও অণুপুষ্টির ঘাটতি এখনো একটি চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে নারী ও শিশুরা এ সমস্যায় বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। এ সমস্যা মোকাবিলায় খাদ্য সমৃদ্ধকরণ সহজ ও সাশ্রয়ী উপায় হতে পারে।
প্যানেল আলোচনা সঞ্চালনা করেন গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ইমপ্রুভড নিউট্রিশনের (গেইন) বাংলাদেশ কান্ট্রি ডিরেক্টর ও এফএবির কো-চেয়ার রুদাবা খন্দকার। আলোচনায় অংশ নেন ইফাদ গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান তানভীর আহমেদ, বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সদস্য মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার, খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. জসিম উদ্দিন খান, এসিআই ফুড অ্যান্ড বেভারেজের নির্বাহী পরিচালক জাকির ইবনে হাই, বাংলাদেশে নেদারল্যান্ডস দূতাবাসের সিনিয়র ফুড সিকিউরিটি অ্যান্ড ট্রেড অ্যাডভাইজার ওসমান হারুনি এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পুষ্টি ও খাদ্য নিরাপত্তাবিষয়ক কর্মকর্তা ফারিয়া শবনম।
সূত্র: প্রথম আলো





