পাহাড়ের সবুজ অরণ্য, পাখির কলকাকলি আর বন্যপ্রাণীর অবাধ বিচরণ। সেই অরণ্যের বুকেই একদিনের জন্য মিলেছিল প্রকৃতি, প্রাণ ও মানুষের সংস্কৃতি। কোথাও ঘিলা খেলার উচ্ছ্বাস, কোথাও বাঁশ খেলার ছন্দ, আবার কোথাও হাঁড়ি ভাঙার প্রতিযোগিতা। চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা ও বাঙালি জনগোষ্ঠীর মানুষের অংশগ্রহণে পাহাড়ের প্রকৃতি ও ঐতিহ্যের এমন এক মিলনমেলায় মুখর হয়ে ওঠে খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গার পিটাছড়া।
প্রকৃতি সংরক্ষণ, জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং পাহাড়ের বৈচিত্র্যময় জাতিগোষ্ঠীর সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য তুলে ধরতে শনিবার (৩১ অক্টোবর) পূর্ব খেদাছড়ার ৩৫ নম্বর খেদাছড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে অনুষ্ঠিত হয় ‘বন ও প্রাণের উৎসব-২০২৬’। পিটাছড়া ফরেস্ট ও বায়োডাইভার্সিটি কনজার্ভেশন ইনিশিয়েটিভের আয়োজনে দিনব্যাপী এ উৎসবে প্রকৃতিপ্রেমী, স্থানীয় বাসিন্দা ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মিলন ঘটে। অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন পিটাছড়া ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক, পরিবেশকর্মী ও অভিযাত্রী মাহফুজ আহমেদ রাসেল।
ঐতিহ্যের খেলায় ফিরে আসা শৈশব:
উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ ছিল পাহাড়ের ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলা। ঘিলা খেলা, তৈলাক্ত বাঁশ বেয়ে ওপরে ওঠা ও হাঁড়ি ভাঙা প্রতিযোগিতায় মেতে ওঠেন অংশগ্রহণকারীরা। এসব খেলা শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়, বরং পাহাড়ের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের জীবনযাপন, শৈশবের স্মৃতি ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ।
সময়ের পরিবর্তনে অনেক ঐতিহ্যবাহী খেলা হারিয়ে যেতে বসেছে। উৎসবের আয়োজন যেন নতুন প্রজন্মের সামনে সেই পুরোনো দিনের আনন্দ ও স্মৃতিকে আবারও জীবন্ত করে তোলে। দর্শনার্থীদের উচ্ছ্বাস আর অংশগ্রহণকারীদের প্রাণবন্ত উপস্থিতিতে পুরো আয়োজন আরও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে।
জীববৈচিত্র্যের অনন্য আশ্রয়:
তবে উৎসবের মূল বার্তা ছিল প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার আহ্বান। মাটিরাঙ্গার পিটাছড়ায় প্রায় ৭৫ একর এলাকাজুড়ে বিস্তৃত সংরক্ষিত অরণ্যটি যেন পাহাড়ের জীববৈচিত্র্যের এক অনন্য আশ্রয়স্থল। এখানে রয়েছে প্রায় ১৫০ প্রজাতির পাখি, ২৭ প্রজাতির সাপ এবং ২০ প্রজাতির ব্যাঙ ও কচ্ছপ। বনের ভেতর প্রায়ই দেখা মেলে লজ্জাবতী বানর ও বনরুইয়ের, মাঝেমধ্যে চোখে পড়ে মেছোবিড়ালও। এসব প্রাণীর উপস্থিতি পিটাছড়ার অরণ্যের প্রাকৃতিক সমৃদ্ধি ও গুরুত্ব আরও স্পষ্ট করে তোলে।
কিন্তু নির্বিচারে বন উজাড়, গাছপালা ধ্বংস এবং বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল সংকুচিত হওয়ায় পাহাড়ের প্রকৃতি আজ নানা হুমকির মুখে। এ বাস্তবতায় পিটাছড়ার মতো সংরক্ষণ উদ্যোগ শুধু একটি বন রক্ষার প্রচেষ্টা নয়, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য প্রকৃতির অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াই।
বন রক্ষার পাশাপাশি মানুষের পাশে:
পরিবেশ সংরক্ষণ উদ্যোগের অংশ হিসেবে ইতোমধ্যে ছয় হাজার দেশি গাছের নার্সারি গড়ে তোলা হয়েছে। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে মেডিকেল সেন্টার, পাঠাগার ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। প্রকৃতি সংরক্ষণের পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সংস্কৃতির বিকাশেও এসব উদ্যোগ ভূমিকা রাখছে।
পিটাছড়া ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক মাহফুজ রাসেল বলেন, শুধু বন রক্ষা কিংবা বন্যপ্রাণী বাঁচানোই তাঁদের লক্ষ্য নয়; বরং মানুষ ও প্রকৃতির মধ্যে হারিয়ে যাওয়া মেলবন্ধন ফিরিয়ে আনা এবং পাহাড়ের বৈচিত্র্যময় জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরাও তাঁদের উদ্দেশ্য।
উদ্বোধন ও সম্মাননা:
উৎসবের উদ্বোধন করেন পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ও স্থানীয় সংসদ সদস্য ওয়াদুদ ভূঁইয়া। তিনি বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় পাহাড়, বন ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের বিকল্প নেই। পাহাড়ের বৈচিত্র্যময় জাতিগোষ্ঠীর সংস্কৃতি এ অঞ্চলের অমূল্য সম্পদ। সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি পিটাছড়ার মতো সামাজিক ও জনসচেতনতামূলক উদ্যোগকে সহযোগিতা দিয়ে এগিয়ে নিতে হবে।
বিকেলে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভা ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে প্রকৃতি ও পরিবেশ সংরক্ষণে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ‘পিটাছড়া পরিবেশ সম্মাননা-২০২৬’ দেওয়া হয়। পরিবেশবান্ধব সমাজ গঠন উদ্যোগ বিভাগে রিতু পারভী, প্রকৃতি ও পরিবেশ সংরক্ষণ বিভাগে হরিরামপুরের ‘শ্যামল নিসর্গ’ এবং প্রাণবৈচিত্র্য সংরক্ষণ বিভাগে শ্রীমঙ্গলের পরিবেশকর্মী সোহেল শ্যাম এ সম্মাননা পান।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন, মাটিরাঙ্গা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌর প্রশাসক উম্মে তাহমিনা মিতু, ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক আসিফ সালেহ, বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের নৃতত্ত্ব ও অলংকরণ শিল্পকলা বিভাগের সাবেক প্রধান ড. জিনাত মাহরুখ বানু, ওয়াইল্ডটিমের প্রধান নির্বাহী ও সহপ্রতিষ্ঠাতা ড. মো. আনোয়ারুল ইসলাম, খাগড়াছড়ি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউটের পরিচালক ঞ্যোহ্লা মং এবং রাঙামাটির বন সংরক্ষক মো. আব্দুল আওয়াল সরকার। এ ছাড়া উপস্থিত ছিলেন মাটিরাঙ্গা উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. বদিউল আলম, পৌর বিএনপির সভাপতি মো. শাহজালাল কাজল, সাংগঠনিক সম্পাদক মো. জিয়াউর রহমানসহ অনেকে।
লোকসুরে সমাপ্তি:
সন্ধ্যা নামতেই শুরু হয় সাংস্কৃতিক আয়োজন। পিটাছড়া সাংস্কৃতিক দলের পরিবেশনার পর চট্টগ্রামের সুপরিচিত গানের দল ‘অগ্নিবীণা’ সংগীত পরিবেশন করে। লোকসংগীতের সুরে শেষ হয় দিনব্যাপী উৎসব।
পিটাছড়ার এই আয়োজন যেন একটি কথাই মনে করিয়ে দেয়: বন শুধু গাছপালা কিংবা বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল নয়, এটি মানুষের জীবন, সংস্কৃতি ও অস্তিত্বেরও অবিচ্ছেদ্য অংশ। পাহাড়ের বন বাঁচলে বাঁচবে প্রাণ, টিকে থাকবে প্রকৃতি; আর প্রকৃতির সঙ্গে বেঁচে থাকবে মানুষের হাজার বছরের ঐতিহ্যও।
সূত্র: Daily Bangladesh · দেশজুড়ে





