রাষ্ট্রায়ত্ত মোবাইল অপারেটর টেলিটকের ফোর-জি নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের কাজ পেয়েছে চীনা টেলিযোগাযোগ সরঞ্জাম নির্মাতা প্রতিষ্ঠান জেডটিই। গত ২৬ অক্টোবর ‘প্রকিউরমেন্ট অব ফোর-জি অন ৭০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ড’ প্রকল্পের আওতায় প্রতিষ্ঠানটিকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়। প্রকল্পটির আওতায় টেলিটকের ২৫টি স্থানে ৭০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ডে ফোর-জি সেবা চালুর পরিকল্পনার কথা সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত কর্তৃপক্ষের প্রকাশিত তথ্যে উল্লেখ রয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন, মার্কিন সরকারের কাছে মিথ্যা তথ্য দেওয়া এবং বিদেশে টেলিযোগাযোগ চুক্তি পেতে ঘুষের অভিযোগে আলোচিত এই প্রতিষ্ঠানের হাতে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ অবকাঠামোর কাজ দেওয়া নিয়ে সরবরাহকারীর অতীত রেকর্ড, নিরাপত্তা ও জবাবদিহির প্রশ্ন সামনে আসছে।
ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনামের উপস্থিতিতে আয়োজিত অনুষ্ঠানে টেলিটকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নুরুল মাবুদ চৌধুরী জেডটিইর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাও জুনইয়ংয়ের হাতে কার্যাদেশের নোটিশ তুলে দেন। মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, ৭০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ড চালুর মাধ্যমে টেলিটকের নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ, আধুনিকায়ন এবং গ্রাহকসেবার মান উন্নত করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। কিন্তু যে প্রতিষ্ঠানের হাতে এই কাজ দেওয়া হয়েছে, সেই জেডটিইর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে একাধিক গুরুতর অভিযোগের ইতিহাস রয়েছে। এর মধ্যে কিছু অভিযোগে প্রতিষ্ঠানটি অপরাধ স্বীকার করে জরিমানাও দিয়েছে। আবার সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিদেশে টেলিযোগাযোগ চুক্তি পেতে ঘুষ দেওয়ার অভিযোগে মার্কিন তদন্তের খবরও প্রকাশিত হয়েছে। এসব ঘটনা জেডটিইর ব্যবসায়িক সুনাম এবং আন্তর্জাতিক বিধিবিধান মেনে চলার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
জেডটিইর বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণিত ঘটনাগুলোর একটি ২০১৭ সালের। যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ জানায়, প্রতিষ্ঠানটি মার্কিন উৎসের প্রযুক্তিপণ্য ও সরঞ্জাম অবৈধভাবে ইরানে পাঠিয়ে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘনের ঘটনায় অপরাধ স্বীকার করেছিল। মার্কিন কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে জেডটিই সরাসরি অথবা তৃতীয় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রায় ৩ কোটি ২০ লাখ ডলারের মার্কিন উৎসের পণ্য ইরানে পাঠিয়েছিল। এসব পণ্য রপ্তানির জন্য প্রয়োজনীয় অনুমতি নেওয়া হয়নি। তদন্তে বিচারপ্রক্রিয়ায় বাধা দেওয়া এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মিথ্যা তথ্য দেওয়ার বিষয়ও উঠে আসে।
এ ঘটনায় জেডটিইর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন সংস্থার সম্মিলিত আর্থিক শাস্তির পরিমাণ প্রায় ১১৯ কোটি ডলারে পৌঁছায়। মার্কিন বাণিজ্য বিভাগের বিবরণে ইরান ও উত্তর কোরিয়ায় অবৈধভাবে সরঞ্জাম পাঠানোর বিষয়টি উল্লেখ করা হয়। কর্তৃপক্ষের অভিযোগ ছিল, প্রতিষ্ঠানটি শুধু রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ ভঙ্গই করেনি, তদন্তের সময় তথ্য গোপন এবং সংশ্লিষ্ট লেনদেনের নথি আড়াল করার চেষ্টাও করেছিল। যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের প্রকাশিত নথিতে ইরান-সংশ্লিষ্ট তথ্য মুছে ফেলা এবং তদন্তকারীদের কাছ থেকে তথ্য গোপন করার বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে। অর্থাৎ বিষয়টি কেবল নিয়ম না জানার ভুল ছিল না। প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ও আইন মেনে চলার ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছিল।
বিতর্ক সেখানেই শেষ হয়নি। ২০১৮ সালে জেডটিইর ওপর মার্কিন প্রযুক্তি ও যন্ত্রাংশ সরবরাহে কঠোর নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা হয়। এর পেছনে ছিল আগের সমঝোতার শর্ত মানা নিয়ে নতুন অভিযোগ। যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য বিভাগের বক্তব্য অনুযায়ী, ইরানে অবৈধ পণ্য সরবরাহে জড়িত কর্মীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে জেডটিই ভুল ও বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়েছিল। অভিযোগ ছিল, শাস্তি দেওয়ার পরিবর্তে সংশ্লিষ্ট কিছু কর্মীকে বোনাস দেওয়া হয়েছিল। নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হওয়ার পর মার্কিন প্রযুক্তি ও যন্ত্রাংশের ওপর নির্ভরশীল জেডটিইর ব্যবসা বড় ধরনের সংকটে পড়ে। পরে নতুন সমঝোতা, অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধ এবং তদারকির শর্তে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়।
এই ইতিহাসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, টেলিযোগাযোগ সরঞ্জাম নির্মাতাদের ব্যবসায় প্রযুক্তিগত সক্ষমতার পাশাপাশি সরবরাহ ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও নিয়ম মেনে চলার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। একটি প্রতিষ্ঠান বড় অঙ্কের জরিমানা দেওয়ার পর আবারও একই ধরনের অভিযোগের মুখে পড়লে তার অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা কতটা কার্যকর, তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। জেডটিইর ক্ষেত্রেও এমন প্রশ্ন সামনে এসেছে।
জেডটিইর বিরুদ্ধে নতুন করে আলোচনার জন্ম দেয় ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত রয়টার্সের একটি প্রতিবেদন। এতে বলা হয়, দক্ষিণ আমেরিকার কয়েকটি দেশে টেলিযোগাযোগ চুক্তি পেতে ঘুষ দেওয়ার অভিযোগে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের তদন্ত চলছিল। প্রতিবেদনে ভেনেজুয়েলাসহ কয়েকটি দেশের চুক্তির কথা উল্লেখ করা হয়। অভিযোগের সঙ্গে বিদেশি দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন লঙ্ঘনের বিষয়টি জড়িত ছিল। তদন্ত সম্পর্কে অবগত ব্যক্তিদের বরাতে তখন রয়টার্স জানায়, সম্ভাব্য সমঝোতায় জেডটিইকে এক বিলিয়ন ডলারের বেশি দিতে হতে পারে বলে আলোচনা চলছিল।
যুক্তরাষ্ট্রে জেডটিইর বিরুদ্ধে নিরাপত্তাসংক্রান্ত উদ্বেগও রয়েছে। মার্কিন ফেডারেল যোগাযোগ কমিশন ২০২১ সালে জেডটিই ও হুয়াওয়ের টেলিযোগাযোগ সরঞ্জামকে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করে। কমিশনের ‘কাভার্ড লিস্ট’-এ প্রতিষ্ঠান দুটির সরঞ্জাম ও সেবা অন্তর্ভুক্ত করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগের মূল বিষয় হলো, গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ অবকাঠামোয় ব্যবহৃত সরঞ্জামের মাধ্যমে তথ্যের নিরাপত্তা, নেটওয়ার্কের নির্ভরযোগ্যতা এবং সম্ভাব্য বিদেশি প্রভাবের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
টেলিটকের প্রকল্পটির গুরুত্ব এখানেই। ৭০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ডের তরঙ্গ তুলনামূলকভাবে বেশি দূরত্ব অতিক্রম করতে পারে এবং ভবনের ভেতরে সংযোগ উন্নত করতে সহায়তা করে। ফলে গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত এলাকায় নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ এবং শহরাঞ্চলে ভবনের ভেতরে সংযোগ উন্নত করার সুযোগ তৈরি হতে পারে। দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত মোবাইল অপারেটর হিসেবে টেলিটকের সেবার মান উন্নত করা প্রয়োজন। কিন্তু নেটওয়ার্কের আধুনিকায়নের সঙ্গে সঙ্গে গ্রাহকের তথ্য, সরকারি যোগাযোগব্যবস্থা এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর নিরাপত্তাও নিশ্চিত করা প্রয়োজন। প্রযুক্তিগত সুবিধা অর্জনের পাশাপাশি এসব ঝুঁকি বিবেচনা না করলে ভবিষ্যতে নির্ভরশীলতা ও নিরাপত্তার জটিলতা তৈরি হতে পারে।
এ ক্ষেত্রে কয়েকটি প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর থাকা জরুরি। জেডটিইর সঙ্গে চুক্তিতে তথ্যের গোপনীয়তা, নেটওয়ার্কের নিরাপত্তা, সফটওয়্যার হালনাগাদ, যন্ত্রাংশের উৎস এবং স্বাধীন নিরাপত্তা নিরীক্ষার কী শর্ত রাখা হয়েছে? নেটওয়ার্কে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি ও সফটওয়্যারের দুর্বলতা শনাক্ত হলে দায় কার ওপর বর্তাবে? চুক্তির মেয়াদে বিদেশি সরবরাহকারীর প্রযুক্তিগত সহায়তার ওপর নির্ভরতা কমাতে টেলিটকের নিজস্ব প্রকৌশলীদের সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা আছে কি না? এসব বিষয়ে প্রকাশিত কার্যাদেশের তথ্য থেকে বিস্তারিত জানা যায়নি। তাই প্রকল্পের পূর্ণাঙ্গ চুক্তি, মূল্য, দরপত্র মূল্যায়ন এবং নিরাপত্তা-সংক্রান্ত শর্ত প্রকাশ ও যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
বাংলাদেশ মুঠোফোন গ্রাহক অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমপিসিএ) সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ ডেইলি বাংলাদেশকে বলেন, বাংলাদেশে বিশেষ করে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান টেলিটক এর ৫জি বাস্তবায়ন এখন পর্যন্ত হচ্ছে না চীনের দুটি প্রতিষ্ঠান বিশেষ করে জেডটিই এবং হুয়াওয়ে এর কারণে। এখনো এই প্রকল্পের প্রায় ৭৫ শতাংশ কাজ বাকি রয়েছে এই প্রতিষ্ঠানগুলির নানা ধরনের গাফিলতি এবং যন্ত্রাংশ সরবরাহে অনীহার কারণে। এছাড়া শোনা যায় বিভিন্ন মাধ্যমে এ সকল প্রকল্পে দুর্নীতির খবর রয়েছে। সরকারের উচিত যে সকল প্রতিষ্ঠান এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে গুরুত্বপূর্ণ সেবা প্রদানের বাধা সৃষ্টি করছে বা দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়েছে তাদেরকে নতুন করে কাজ না দেওয়া। কিন্তু আমরা দেখলাম যে প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্রীয় প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘ সময় লাগাচ্ছে তার জন্য তাদেরকে বাদ না দিয়ে নতুন করে প্রকল্প দেয়া হচ্ছে। যেমন জেডটিকে ৭০০ মেগাহার্জ ব্র্যান্ডের তরঙ্গের কাজ দেয়া হয়েছে।





