সুনামগঞ্জের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে বইছে ক্ষোভের হাওয়া। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চলে আসা ঐতিহ্যবাহী বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে এবার প্রশাসনের পক্ষ থেকে অনুমতি না দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, সুনামগঞ্জ জেলা সংসদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, প্রশাসনের এহেন আচরণ স্বাধীন সংস্কৃতিচর্চার টুঁটি চেপে ধরার শামিল। প্রতিবছরের ন্যায় এবারও সুনামগঞ্জ ঐতিহ্য জাদুঘর প্রাঙ্গণে বর্ষবরণ উৎসবের পরিকল্পনা করেছিল উদীচী। গত ৮ এপ্রিল জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অনুমতি চাওয়া হলেও শুরু থেকেই নানামুখী শর্তারোপের অভিযোগ ওঠে। উদীচী নেতাদের দাবি, জেলা প্রশাসক মৌখিকভাবে অনুষ্ঠানের গানের ও পরিবেশনার তালিকা জমা দেওয়ার নির্দেশ দেন। একটি স্বাধীন ও গণমুখী সংগঠন হিসেবে উদীচী এই শর্তকে “সাংস্কৃতিক সেন্সরশিপ” হিসেবে আখ্যা দিয়ে তালিকা দিতে অস্বীকৃতি জানায়।
জাদুঘর প্রাঙ্গণে অনুমতি না পেয়ে উদীচী বিকল্প হিসেবে শহরের উকিলপাড়ায় রিভার ভিউয়ের বটতলায় উৎসব আয়োজনের প্রস্তুতি নেয়। কিন্তু সেখানেও বাধার দেয়াল হয়ে দাঁড়ায় প্রশাসন। সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক জহির উদ্দিন জানান, পয়লা বৈশাখের আগের দিন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মুঠোফোনে সাফ জানিয়ে দেন—সরকারি আয়োজনে সব সংগঠনকে থাকতে হবে, আলাদা কোনো আয়োজন করা যাবে না।
উদীচীর সাধারণ সম্পাদক জহির উদ্দিন বলেন, ”আমরা একটি স্বাধীন দেশে বাস করি যেখানে সংস্কৃতিচর্চা আমাদের অধিকার। সরকারি আয়োজনে অংশ নিতে বাধ্য করা এবং আলাদা অনুষ্ঠানে বাধা দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
প্রশাসনের এই “অগণতান্ত্রিক” সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে আজ মঙ্গলবার সকালে শহরের হুসেন বখত চত্বরে সমবেত হন উদীচীর শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মীরা। সেখানে প্রতিবাদ সভার পাশাপাশি সংক্ষিপ্ত পরিসরে গান ও কবিতার মাধ্যমে বর্ষবরণ পালন করা হয়। প্রবীণ সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও নারী আন্দোলনের নেত্রী শীলা রায়ের নেতৃত্বে বক্তারা বলেন, প্রশাসনের এই আচরণ মুক্তবুদ্ধি ও স্বাধীন চিন্তাচেতনার পরিপন্থী।
অভিযোগের বিষয়ে সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়া বলেন, “অনুষ্ঠানে বাধা দেওয়ার বিষয়টি সঠিক নয়। আমরা চেয়েছিলাম সরকারি বড় আয়োজনে সবাই মিলে উৎসবটি পালন করতে। শুধু ঐতিহ্য জাদুঘর প্রাঙ্গণের ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়নি অন্য কারিগরি কারণে।” তবে উদীচীর গানের তালিকা চাওয়ার বিষয়টি নিয়ে কোনো সদুত্তর মেলেনি।
সুনামগঞ্জের সুধীসমাজ মনে করছেন, জেলা প্রশাসনের এই অনমনীয় অবস্থান স্থানীয় দীর্ঘদিনের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ওপর আঘাত। যেখানে পহেলা বৈশাখ সর্বজনীন উৎসব, সেখানে নির্দিষ্ট গণ্ডিতে সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোকে বেঁধে রাখার চেষ্টা হিতে বিপরীত হতে পারে।
এ ঘটনার পর থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও বইছে সমালোচনার ঝড়। উদীচী স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, স্বাধীন সংস্কৃতিচর্চার অধিকার আদায়ে তাদের আন্দোলন চলবে।
