নর্থ ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির ইংরেজি প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী মো. আজমুল হোসেনকে মারধরের পর ছাদ থেকে ফেলে হত্যার অভিযোগে জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও বিচারের দাবিতে খুলনায় সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।
সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) নগরীর সোনাডাঙ্গা প্রধান সড়কে নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এ কর্মসূচি পালন করেন। এ সময় সোনাডাঙ্গা ট্রাফিক মোড়ে টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করেন তারা। সড়কের বিভিন্ন পয়েন্ট বন্ধ করে দেওয়ায় ওই এলাকায় যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।
বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, এক প্লেট ভাত খাওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে আজমুলকে মারধর, চুল কেটে দেওয়া এবং একপর্যায়ে ছাদ থেকে ফেলে হত্যার ঘটনা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। ঘটনার পেছনে অন্য কোনো কারণ রয়েছে কি না, তা তদন্ত করে বের করারও দাবি জানান তারা।
নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের শিক্ষার্থী আবু জায়েদ বলেন, আমাদের জুনিয়র ইংরেজি বিভাগের আজমুলকে অন্যায়ভাবে হত্যা করা হয়েছে। বলা হচ্ছে, একটি খাবারের অনুমতি না নিয়ে খাওয়া হয়েছিল। আমাদের কি ভাতের এত অভাব যে একটি খাবার খেয়ে ফেলা হয়েছে? এরপর বলা হচ্ছে, তার মা-বাবার কাছ থেকে এক লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়েছিল। একটি খাবারের দাম কি এক লাখ টাকা হতে পারে?
তিনি বলেন, কথার খাতিরে যদি মেনেও নিই যে সে চুরি করেছে, তাহলেও মৃত্যুদণ্ড কোনো চুরির শাস্তি হতে পারে না। প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাত্র চারজনের নাম প্রকাশ করা হয়েছে। তাদের পূর্ণ পরিচয় কেন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে প্রকাশ করা হচ্ছে না, সেই জবাব আমরা চাই। সঠিক বিচার না হওয়া পর্যন্ত আমাদের অবরোধ কর্মসূচি আরও কঠোর হবে।
একই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সিন্ধ বলেন, একজন শিক্ষার্থী অন্যের খাবার চুরি করে খাওয়ার কারণে তাকে মারধর করা হয়েছে এবং ছাদ থেকে ফেলে দেওয়া হয়েছে, এটাই মূল কারণ হতে পারে না। নিঃসন্দেহে এর পেছনে অন্য কোনো কারণ আছে।’ তার প্রশ্ন, বাবা-মায়ের টাকা দিয়ে পড়াশোনা করা একজন শিক্ষার্থীর ভাত খাওয়ার টাকা থাকবে না, এমনটি কীভাবে সম্ভব।
শিক্ষার্থী হানজালা বলেন, এক বেলার খাবার চুরি করে সে খাবে, এটা কোনোভাবেই যুক্তিসংগত নয়। এর কারণে তাকে ছাদ থেকে ফেলে দেওয়া, মাথার চুল কেটে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা এবং পরে হত্যা করা হয়েছে। তাকে অনেক সময় ধরে পেটানো হয়েছে। আমরা এসব ঘটনার সামগ্রিক বিচার চাই।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের শিক্ষার্থী সাফুরা রহমান লিলি বলেন, সে আদৌ ছাদ থেকে লাফ দিয়েছিল কি না, সেটিও আমাদের নিশ্চিত করতে হবে। তার চুল কেন কাটা হলো? এটি অবশ্যই নিপীড়নের অংশ। এক প্লেট ভাতের জন্য তার চুল, মানসম্মান এবং সর্বোপরি জীবন কখনোই যেতে পারে না।
নর্দার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী সাজিত হাসান সৈকত সংহতি জানিয়ে বলেন, তিন দিন হয়ে গেলেও এখনো আমরা আসামিদের গ্রেপ্তারের খবর পাইনি। এটি অত্যন্ত দুঃখজনক ও নিন্দনীয়। তিনি বলেন, একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মারা গেছে, সে তাদের ভাই। ঘটনার সঠিক বিচার চান তারা।
নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক কানাই লাল বলেন, ঘটনা অনেকটা খোলাসা হয়ে গেছে। তাকে ভাত চুরির অভিযোগে, মিথ্যা ও তুচ্ছ অভিযোগে বেধড়ক প্রহার করা হয়। এরপর তাকে ছাদে নিয়ে গিয়ে ফেলে দেওয়া হয়েছে এটাই বাস্তবতা।
তিনি বলেন, এখানে যারা সংশ্লিষ্ট, এটি একজনের কাজ নয়। বহু শিক্ষার্থীর সমন্বয়ে একটি দলগতভাবে তাকে মারা হয়েছে। আমরা তার কিছু চুল পড়ে থাকতে দেখেছি। শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্নও দেখেছি। খোলা চোখে যা দেখেছি, তাতে তাকে বেধড়ক প্রহার করা হয়েছে বলে মনে হয়েছে।
উপাচার্য আরও বলেন, আমরা এই অমানবিক নির্যাতন ও ছাত্র হত্যার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই। সঠিক তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের গ্রেপ্তার করে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে তাদের বিচার কার্যকর করার জোর দাবি জানাচ্ছি। দুঃখের বিষয়, প্রায় ৬০ ঘণ্টা পার হয়ে গেলেও এখনো কোনো আসামি গ্রেপ্তার হয়নি।
তিনি জানান, মেস ব্যবস্থাপকের বক্তব্য থেকেও ঘটনার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে এবং ঘটনার সঙ্গে একাধিক শিক্ষার্থীর সংশ্লিষ্টতার বিষয় উঠে এসেছে।
শিক্ষার্থীরা বলেন, আজমুল হত্যায় জড়িত প্রত্যেককে আইনের আওতায় এনে দ্রুত বিচার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তাদের আন্দোলন অব্যাহত থাকবে। বিক্ষোভ চলাকালে সোনাডাঙ্গা এলাকার সড়কের বিভিন্ন পয়েন্ট বন্ধ থাকায় যান চলাচল ব্যাহত হয় এবং পুরো এলাকা অবরুদ্ধ অবস্থায় থাকে।
খুলনা সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু বিক্ষোভ সমাবেশে এসে তাদের সাথে সংহতি প্রকাশ করেন। এ সময় তিনি বলেন, আমি আধা ঘণ্টার মধ্যে আমাদের সরাষ্ট্র মন্ত্রীকে বিষয়টি জানাবো তিনি যেন এ বিষয়ে নজর রাখেন। অপ্রতিমের বিষয়ের মতো যেন এ বিষয়টিও দেখেন।
এদিকে, আজমুল হোসেনের মৃত্যুর ঘটনায় সুষ্ঠু তদন্ত, প্রকৃত দোষীদের শনাক্ত এবং সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা। শনিবার বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আয়োজিত এক প্রতিবাদ সমাবেশে এসব দাবি জানান তারা।
সমাবেশে বক্তারা বলেন, ঘটনার সঙ্গে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো শিক্ষার্থী জড়িত থাকলে তার পরিচয়, পদমর্যাদা বা ব্যাচ বিবেচনা না করে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দোষীদের শনাক্ত করতে হবে। একই সঙ্গে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তারা।
উল্লেখ্য, ১৮ সেপ্টেম্বর (শুক্রবার) রাতে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের খানজাহান আলী হলের বিপরীতে মসজিদ গলির একটি ভবনে আজমুল হোসেনের মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। রাতে মেসে মিল না দিয়ে ভাত খাওয়ার অপরাধে পেটানো হয় আজমুলকে একই সঙ্গে তার চুল কেটে দেওয়া হয়। এ সময় নাজমুলের বাবার কাছে ফোনে ১ লাখ টাকা চাঁদা চাওয়া হয়। মারধরের পর ভবনের চতুর্থ তলা থেকে ফেলে দেওয়া হয়েছে-এমন অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারজন শিক্ষার্থী সহ অজ্ঞাত আরও ২০-২৫ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। তাদের মধ্যে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের এফএমআরটি ডিসিপ্লিনের ১৭ ও ১৯ ব্যাচের রবিন ও মবিন, গণিত ডিসিপ্লিনের ১৯ ব্যাচের সাগর এবং এগ্রোটেকনোলজি ডিসিপ্লিনের ২৬ ব্যাচের শিক্ষার্থী ওবায়দুল।