বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিস্তৃত ভূগোলে কিছু মানুষ আছেন, যাঁদের উপস্থিতি সময়ের দৈর্ঘ্যে নয়, সৃষ্টির দীপ্তিতে পরিমাপ করতে হয়। তাঁরা চলে যান, কিন্তু তাঁদের কণ্ঠস্বর থেকে যায় কবিতায়, গানে, চিন্তায়, স্মৃতিতে এবং পরবর্তী প্রজন্মের সাংস্কৃতিক চেতনায়। আবু হেনা মোস্তফা কামাল তেমনই এক উজ্জ্বল নাম। তিনি ছিলেন কবি, গীতিকার, প্রাবন্ধিক, গবেষক, শিক্ষক, বক্তা ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। মাত্র তিপ্পান্ন বছরের জীবনে তিনি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে যে সমৃদ্ধি দিয়ে গেছেন, তা বিস্ময় জাগায়। তাঁর জীবন যেন ছিল সময়ের সঙ্গে এক নিরন্তর প্রতিযোগিতা; কম সময়ে বেশি কিছু সৃষ্টি করার এক অসাধারণ প্রয়াস।
আবু হেনা মোস্তফা কামাল জন্মেছিলেন ১৯৩৬ সালের ১৩ মার্চ। তাঁর শৈশব ও কৈশোর কেটেছে এমন এক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশে, যেখানে বই, শিক্ষা ও সাহিত্যচর্চার প্রতি আগ্রহ ধীরে ধীরে তাঁর মনোজগৎকে নির্মাণ করে। ছাত্রজীবনেই তাঁর মেধা ও সৃজনশীলতার পরিচয় প্রকাশ পেতে থাকে। উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য অধ্যয়ন করেন। বাংলা সাহিত্যকে তিনি শুধু পাঠ্যবিষয় হিসেবে গ্রহণ করেননি; বরং সাহিত্য, ভাষা, সংগীত ও সংস্কৃতিকে তিনি জীবন উপলব্ধির অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেখেছেন।
তাঁর শিক্ষাজীবনের বিস্তারও ছিল উল্লেখযোগ্য। উচ্চতর গবেষণার জন্য তিনি লন্ডনে যান এবং বাংলা সংবাদপত্র ও সাহিত্য নিয়ে গবেষণা করেন। বিদেশের মাটিতে দাঁড়িয়েও তাঁর চিন্তার কেন্দ্র ছিল বাংলা ভাষা ও বাঙালির সাহিত্য-সংস্কৃতি। এই গবেষণামনস্কতা পরবর্তী জীবনে তাঁর প্রবন্ধ ও সাহিত্যচিন্তাকে গভীরতা দেয়।
কিন্তু আবু হেনা মোস্তফা কামালের সবচেয়ে বড় পরিচয়গুলোর একটি ছিল শিক্ষকতা। শিক্ষকতা তাঁর কাছে নিছক পেশা ছিল না; ছিল জ্ঞান ও মানবিকতার প্রতি এক ধরনের দায়বদ্ধতা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিষয়ে শিক্ষকতা করে তিনি অসংখ্য শিক্ষার্থীর কাছে সাহিত্য ও জ্ঞানের জগতের দরজা খুলে দিয়েছিলেন। একজন প্রকৃত শিক্ষক যেমন শুধু উত্তর দেন না, প্রশ্ন করতেও শেখান—আবু হেনা মোস্তফা কামালের শিক্ষকসত্তার মধ্যেও ছিল সেই অনুসন্ধিৎসা জাগিয়ে তোলার ক্ষমতা।
তাঁর ক্লাসরুম ছিল কেবল পাঠদানের জায়গা নয়, চিন্তারও জায়গা। বাংলা সাহিত্যকে তিনি বিচ্ছিন্ন কোনো বিষয় হিসেবে দেখতেন না। ইতিহাস, সমাজ, মানুষ, রাজনীতি, সংস্কৃতি ও জীবন; সবকিছুর সঙ্গে সাহিত্যের যে নিবিড় সম্পর্ক, তাঁর আলোচনায় তা স্পষ্ট হয়ে উঠত। তাঁর বাচনভঙ্গি ছিল স্বচ্ছ, কণ্ঠ ছিল আকর্ষণীয় এবং বক্তব্যে ছিল যুক্তি ও রসবোধের সুন্দর সমন্বয়। এ কারণেই তিনি শুধু একজন সফল অধ্যাপক ছিলেন না, ছিলেন একজন স্মরণীয় বক্তাও।
তাঁর কবিসত্তার দিকে তাকালে দেখা যায়, তিনি সংখ্যার চেয়ে গুণের দিকে বেশি মনোযোগী ছিলেন। তাঁর কবিতা অজস্র নয়, কিন্তু স্বতন্ত্র। তাঁর কাব্যগ্রন্থ ‘আপন যৌবন বৈরী’, ‘যেহেতু জন্মান্ধ’ এবং ‘আক্রান্ত গজল’ বাংলা কবিতায় তাঁর নিজস্ব স্বরকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। তাঁর কবিতায় একদিকে ব্যক্তিমানুষের অন্তর্গত অনুভূতি, অন্যদিকে বৃহত্তর জীবন ও সমাজের নানা সংকটের প্রতিফলন দেখা যায়।
আবু হেনা মোস্তফা কামালের কবিতায় প্রেম আছে, বিষাদ আছে, নিঃসঙ্গতা আছে, আছে আত্মজিজ্ঞাসা। কিন্তু তাঁর কবিতার সবচেয়ে বড় শক্তি সম্ভবত তার গীতিময়তা। শব্দের ভেতর থেকে তিনি যে সুর তুলে আনতে পারতেন, সেটিই পরবর্তীকালে তাঁর গীতিকার পরিচয়কে আরও উজ্জ্বল করে। তাঁর কবিতা পড়লে মনে হয়, শব্দগুলো যেন কেবল অর্থ বহন করছে না; তারা নিজেরাও যেন সুরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
এই গীতিময়তাই তাঁকে নিয়ে যায় বাংলা গানের জগতে। গীতিকার হিসেবে আবু হেনা মোস্তফা কামাল অর্জন করেন ব্যাপক জনপ্রিয়তা। তাঁর লেখা ‘তুমি যে আমার কবিতা’, ‘অনেক বৃষ্টি ঝরে তুমি এলে’, ‘কত সাধনায় এমন ভাগ্য মেলে’সহ বেশ কিছু গান শ্রোতাদের হৃদয়ে স্থায়ী জায়গা করে নেয়। তাঁর গানের মধ্যে প্রেম আছে, প্রকৃতি আছে, আবেগ আছে, অপেক্ষা আছে, আর আছে মানুষের সহজ-সরল অনুভূতির কাব্যিক প্রকাশ।
একজন কবি যখন গান লেখেন, তখন তাঁকে শব্দের সঙ্গে সুরেরও সম্পর্ক তৈরি করতে হয়। আবু হেনা মোস্তফা কামাল এই কঠিন কাজটি অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবে করতে পেরেছিলেন। তাঁর গানের ভাষা সাহিত্যিক, কিন্তু দুর্বোধ্য নয়; আবেগময়, কিন্তু অতিরিক্ত ভারী নয়। তাঁর শব্দচয়ন শ্রুতিমধুর এবং অনুভূতিগুলো সহজেই শ্রোতার হৃদয়ে পৌঁছে যায়। এ কারণেই তাঁর গানের জনপ্রিয়তা শুধু একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আটকে থাকেনি।
বাংলাদেশের বেতার ও টেলিভিশনের সাংস্কৃতিক পরিসরেও তাঁর উপস্থিতি ছিল উজ্জ্বল। তাঁর কণ্ঠ, উচ্চারণ, বাচনভঙ্গি ও উপস্থাপনার দক্ষতা তাঁকে সাধারণ মানুষের কাছে পরিচিত করে তোলে। সাহিত্যিক হয়েও তিনি গণমাধ্যমের ভাষা বুঝতেন। তিনি জানতেন, গভীর কোনো সাহিত্যিক ভাবনাকে মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হলে ভাষাকে হতে হয় সহজ, স্বচ্ছ ও প্রাণবন্ত। তাঁর উপস্থাপনায় সেই গুণটি স্পষ্ট ছিল।
আবু হেনা মোস্তফা কামালের প্রাবন্ধিক পরিচয়ও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর ‘শিল্পীর রূপান্তর’ এবং ‘কথা ও কবিতা’ গ্রন্থে যে মননশীলতার পরিচয় পাওয়া যায়, তা তাঁর কবিসত্তার থেকে সম্পূর্ণ আলাদা নয়; বরং একই সৃষ্টিশীল ব্যক্তিত্বের আরেকটি দিক। তিনি সাহিত্যকে শুধু অনুভূতির জায়গা থেকে দেখেননি। সাহিত্য কেন সৃষ্টি হয়, সমাজের সঙ্গে তার সম্পর্ক কী, শিল্পীর দায়িত্ব কোথায়, একটি সাহিত্যকর্মের নান্দনিক মূল্য কীভাবে নির্ধারিত হয়; এসব প্রশ্নও তাঁর চিন্তার পরিসরে ছিল।
তাঁর প্রবন্ধের ভাষায় যেমন যুক্তি আছে, তেমনি আছে সৌন্দর্য। তিনি কঠিন তাত্ত্বিক বিষয়কেও সাহিত্যিক স্বচ্ছতায় উপস্থাপন করতে পারতেন। একজন গবেষক হিসেবে তথ্যের প্রতি তাঁর যত্ন ছিল, আবার একজন সাহিত্যিক হিসেবে তথ্যের বাইরে থাকা মানবিক ও নান্দনিক সত্যের প্রতিও তাঁর মনোযোগ ছিল। এই দুই প্রবণতার মিলন তাঁর প্রবন্ধকে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছে।
আবু হেনা মোস্তফা কামালের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিচয় তাঁর সাংস্কৃতিক নেতৃত্ব। তিনি বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালকের দায়িত্ব পালন করেছেন এবং পরবর্তীতে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। জাতীয় সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে তাঁর উপস্থিতি প্রমাণ করে যে তিনি কেবল নিজের সাহিত্যসৃষ্টির মধ্যেই আবদ্ধ ছিলেন না; বরং বৃহত্তর সাংস্কৃতিক পরিসর নিয়েও তাঁর ভাবনা ছিল।
বাংলা একাডেমি কিংবা শিল্পকলা একাডেমির মতো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত থাকা মানে শুধু প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে ভাষা, সাহিত্য, শিল্প, সংগীত ও সংস্কৃতির দীর্ঘমেয়াদি বিকাশের প্রশ্ন। আবু হেনা মোস্তফা কামালের চিন্তা ও কর্মজীবনে এই বৃহত্তর সাংস্কৃতিক দায়িত্ববোধের পরিচয় পাওয়া যায়।
তাঁর প্রতিভার স্বীকৃতিও এসেছে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে। সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে অবদানের জন্য তিনি ১৯৮৭ সালে একুশে পদকে ভূষিত হন। কিন্তু পুরস্কারের তালিকা দিয়ে তাঁর গুরুত্বকে পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। কারণ কোনো সৃষ্টিশীল মানুষের প্রকৃত মূল্যায়ন ঘটে তাঁর মৃত্যুর পরেও তাঁর সৃষ্টিকে মানুষ কতটা আপন করে নেয়, তার মধ্য দিয়ে। আবু হেনা মোস্তফা কামালের ক্ষেত্রে সেই উত্তর ইতিবাচক। তাঁর গান এখনো মানুষের মুখে, তাঁর কবিতা এখনো পাঠকের হাতে, তাঁর প্রবন্ধ এখনো গবেষণার বিষয়।
১৯৮৯ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর তাঁর জীবনাবসান ঘটে। মাত্র তিপ্পান্ন বছর বয়সে তাঁর চলে যাওয়া বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। তাঁর সামনে তখনও ছিল আরও অনেক কিছু করার সময়। আরও কবিতা লেখা যেত, আরও গান সৃষ্টি হতে পারত, আরও প্রবন্ধ ও গবেষণা প্রকাশিত হতে পারত, আরও অনেক শিক্ষার্থী তাঁর কাছ থেকে জ্ঞান লাভ করতে পারত। কিন্তু জীবন তাঁকে সেই দীর্ঘ সময় দেয়নি।
তবু তাঁর স্বল্পায়ু জীবন অসম্পূর্ণতার প্রতীক হয়ে থাকেনি। বরং অল্প সময়ের মধ্যে তিনি যে বৈচিত্র্যময় সৃষ্টিশীলতা দেখিয়েছেন, সেটিই তাঁকে অনন্য করেছে। তাঁর জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—একজন মানুষের জীবনের মূল্য শুধু সে কত বছর বেঁচেছে, তার ওপর নির্ভর করে না; সে কতটা গভীরভাবে বেঁচেছে এবং কতটা অর্থবহ উত্তরাধিকার রেখে গেছে, সেটিই বড় কথা।
আবু হেনা মোস্তফা কামালের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তাঁর বহুমাত্রিকতা। তিনি একদিকে কবি, অন্যদিকে শিক্ষক; একদিকে গীতিকার, অন্যদিকে গবেষক; একদিকে বক্তা, অন্যদিকে সাংস্কৃতিক প্রশাসক। কিন্তু এসব পরিচয় পরস্পর বিচ্ছিন্ন ছিল না। বরং একটির ভেতর দিয়ে অন্যটি সমৃদ্ধ হয়েছে। তাঁর শিক্ষকতা তাঁকে মানুষের কাছাকাছি নিয়ে গেছে, তাঁর সাহিত্য তাঁকে মানুষের অনুভূতির গভীরে পৌঁছে দিয়েছে, তাঁর গবেষণা তাঁকে চিন্তার জগতে নিয়ে গেছে এবং তাঁর সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড তাঁকে বৃহত্তর সমাজের সঙ্গে যুক্ত করেছে।
তাঁর সাহিত্যকর্মে যে মানবিকতা রয়েছে, সেটিও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। মানুষের আনন্দ-বেদনা, প্রেম-বিরহ, স্বপ্ন-হতাশা এবং জীবনসংগ্রাম তাঁর লেখায় নানা রূপে ফিরে এসেছে। তিনি মানুষের অনুভূতিকে কখনো কৃত্রিমভাবে বড় করে দেখাননি; বরং জীবনের স্বাভাবিক আবেগকেই শিল্পের ভাষায় রূপ দিয়েছেন। ফলে তাঁর কবিতা ও গান পাঠকের কাছে কৃত্রিম মনে হয় না। মনে হয়, এই অনুভূতি তো আমাদেরই—আমাদের জীবনেরই কোনো এক অপ্রকাশিত কথা।
সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সাহিত্য পাঠের ধরন বদলেছে, সংগীতের ভাষা বদলেছে, মানুষের রুচিও বদলেছে। কিন্তু কিছু সৃষ্টির আবেদন সময়ের সঙ্গে মুছে যায় না। আবু হেনা মোস্তফা কামালের সৃষ্টির ক্ষেত্রেও সেই কথাটি প্রযোজ্য। তাঁর গান নতুন প্রজন্মের শিল্পীরা গাইতে পারেন, তাঁর কবিতা নতুন পাঠকের কাছে নতুন অর্থ তৈরি করতে পারে এবং তাঁর প্রবন্ধ নতুন গবেষকদের নতুন প্রশ্নের দিকে নিয়ে যেতে পারে। এটাই একজন সৃষ্টিশীল মানুষের সবচেয়ে বড় সাফল্য।
আজ যখন শিক্ষাব্যবস্থা, সাহিত্যচর্চা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে, তখন আবু হেনা মোস্তফা কামালের জীবন ও কর্ম আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়ায়। তিনি দেখিয়েছেন, শিক্ষকতা কেবল চাকরি নয়, সাহিত্যচর্চা কেবল আত্মপ্রকাশ নয় এবং সংস্কৃতি কেবল বিনোদন নয়। এগুলো মানুষের চিন্তা, মনন ও মানবিকতা গঠনের শক্তিশালী মাধ্যম।
তাঁকে স্মরণ করার সবচেয়ে কার্যকর উপায় শুধু জন্মদিন বা মৃত্যুবার্ষিকীতে আনুষ্ঠানিক আয়োজন করা নয়; তাঁর লেখা পড়া, তাঁর গান শোনা, তাঁর প্রবন্ধ নিয়ে আলোচনা করা এবং নতুন প্রজন্মের কাছে তাঁর সাহিত্যকর্ম পৌঁছে দেওয়া। তাঁর জীবন ও সাহিত্য নিয়ে আরও গবেষণা হওয়া প্রয়োজন। তাঁর অপ্রকাশিত বা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা রচনা সংগ্রহ করে সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। তাঁর শিক্ষকসত্তা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড নিয়েও প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণা হতে পারে। কারণ একজন মানুষকে স্মরণ করার সবচেয়ে সুন্দর পদ্ধতি হলো তাঁর সৃষ্টিকে জীবিত রাখা।
আবু হেনা মোস্তফা কামাল আমাদের মাঝে নেই বহু বছর। কিন্তু কিছু মানুষ তাঁদের অনুপস্থিতিতেও উপস্থিত থাকেন। একটি পরিচিত গানের কলিতে, কোনো কবিতার আবেগে, পুরোনো কোনো রেডিও অনুষ্ঠানের স্মৃতিতে, কোনো শিক্ষকের বক্তৃতায় কিংবা সাহিত্যপ্রেমী মানুষের আলোচনায় তাঁরা ফিরে আসেন। আবু হেনা মোস্তফা কামালও তেমনই এক প্রত্যাবর্তনশীল নাম।
তাঁর জীবন ছিল স্বল্প, কিন্তু তাঁর স্বপ্ন ছিল বিস্তৃত। তাঁর সময় ছিল সীমিত, কিন্তু তাঁর সৃষ্টির পরিসর ছিল বহুমাত্রিক। তিনি চলে গেছেন, কিন্তু রেখে গেছেন শব্দের এক দীর্ঘ পথ। সেই পথে কবিতা আছে, গান আছে, গবেষণা আছে, শিক্ষকতার স্মৃতি আছে, আছে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি গভীর ভালোবাসা।
তাই আবু হেনা মোস্তফা কামালকে শুধু একজন প্রয়াত কবি হিসেবে স্মরণ করলে তাঁর প্রতি আমাদের দায় শেষ হয় না। তাঁকে স্মরণ করতে হবে একজন শিক্ষক হিসেবে, যিনি জ্ঞানকে ভালোবেসেছিলেন; একজন কবি হিসেবে, যিনি মানুষের অনুভূতিকে শব্দ দিয়েছিলেন; একজন গীতিকার হিসেবে, যিনি বাংলা গানে আবেগের নতুন সুর এনেছিলেন; একজন গবেষক হিসেবে, যিনি সাহিত্যকে চিন্তার আলোয় দেখেছিলেন; এবং একজন সংস্কৃতিসেবী হিসেবে, যিনি জাতীয় সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে নিজের মেধা ও শ্রম যুক্ত করেছিলেন।
স্বল্পায়ু জীবনের সেই দীপ্ত মানুষটি আজও বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির আকাশে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। সময় তাঁকে আমাদের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে, কিন্তু তাঁর সৃষ্টি তাঁকে দূরে যেতে দেয়নি। তাঁর কবিতার শব্দে, তাঁর গানের সুরে এবং তাঁর চিন্তার আলোয় তিনি আজও বেঁচে আছেন। আর যতদিন বাংলা ভাষা, বাংলা কবিতা ও বাংলা গান মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকবে, ততদিন আবু হেনা মোস্তফা কামালের নামও শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হবে।
লেখক: মোহাম্মদ মাহবুব হোসাইন
ফ্রান্স থেকে সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী।
mahbubhossain786@yahoo.com