নদীভাঙনে সর্বস্ব হারানো মানুষের ঘরবাড়ি ও ফসলি জমি রক্ষার জন্য নেওয়া হয়েছে ভাঙন প্রতিরোধ প্রকল্প। কিন্তু সেই প্রকল্পের কাজেই উঠেছে ভয়াবহ অনিয়মের অভিযোগ। ভাঙন ঠেকানোর নামে আবারও ভাঙনকেই ডেকে আনা হচ্ছে বলে দাবি স্থানীয়দের।
অভিযোগ রয়েছে, নিম্নমানের জিওব্যাগ ব্যবহার এবং ভাঙনস্থলেই মেশিন বসিয়ে নদী থেকে বালু উত্তোলন করে চলছে প্রকল্পের কাজ। এতে কোটি টাকার প্রকল্পের স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, আর নতুন করে ভাঙনের আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন নদীপাড়ের মানুষ।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর উপজেলার দামোদরপুর ইউনিয়নের সিট জামুডাঙ্গা এলাকার মুন্সীপাড়া ও পাটনীপাড়ায় চলমান ঘাঘট নদীভাঙন রক্ষা প্রকল্পে নানা অনিয়মের চিত্র। ভাঙনরোধে নদীতে ফেলা হচ্ছে জিওব্যাগ। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, ব্যবহৃত হচ্ছে নিম্নমানের ফেব্রিক্সের জিওব্যাগ, যা অল্পদিনেই ছিঁড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দীর্ঘদিনের নদীভাঙনে ওই এলাকার বহু পরিবার ঘরবাড়ি ও আবাদি জমি হারিয়েছে। এখনো অনেক পরিবার ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। স্থানীয়দের দীর্ঘ আন্দোলন ও দাবির পর অবশেষে ভাঙনরোধে জরুরি প্রকল্প হাতে নেয় পানি উন্নয়ন বোর্ড। কিন্তু কাজ শুরু হতেই দেখা দিয়েছে নতুন বিতর্ক।
অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্পে বালু সরবরাহের দায়িত্ব পাওয়া স্থানীয় ঠিকাদার হাসেন আলী হাসান অন্য স্থান থেকে বালু না এনে সরাসরি ভাঙনস্থলেই শ্যালো মেশিন বসিয়ে রাতভর বালু উত্তোলন করছেন। এতে নদীর তলদেশে নতুন করে গভীর খাদ সৃষ্টি হচ্ছে এবং নদীতীর আরও দুর্বল হয়ে পড়ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা মিম ও দুলালী বেগম অভিযোগ করে বলেন, “হাসেন আলী দীর্ঘদিন ধরে নদী থেকে অবৈধভাবে বালু তুলে ব্যবসা করছেন। এখন পানি উন্নয়ন বোর্ডের কিছু অসাধু কর্মকর্তার সঙ্গে যোগসাজশ করে ভাঙনরোধ প্রকল্পের কাজও পেয়েছেন। প্রকল্পের সুযোগে আবারও নদী থেকেই বালু তুলে জিওব্যাগ ভরছেন। এতে সাময়িকভাবে ভাঙন বন্ধ হলেও কিছুদিন পর ব্যাগ ধসে পড়ে নতুন করে ভাঙন শুরু হয়।”
তারা আরও বলেন, রাতভর চলা মেশিনের বিকট শব্দে নদীপাড়ের মানুষের ঘুম হারাম হয়ে গেছে।
তবে অভিযোগ অস্বীকার না করে অভিযুক্ত হাসেন আলী হাসান বলেন, “আগেও ভাঙনস্থল থেকে বালু তুলে কাজ হয়েছে। এবারও একইভাবে নদী থেকেই বালু উত্তোলন করে কাজ করা হচ্ছে।”
এ বিষয়ে উপজেলা প্রশাসনের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের বক্তব্যেও দেখা গেছে দায় এড়ানোর প্রবণতা। উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) জসিম উদ্দিন বলেন, “ভাঙনরোধ প্রকল্পে নদী থেকে বালু উত্তোলনের বিষয়টি দেখার দায়িত্ব আমার নয়। এ বিষয়ে ইউএনও স্যারের সঙ্গে কথা বলতে পারেন।”
অন্যদিকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ মাহমুদুল হাসান বলেন, “বিষয়টি পানি উন্নয়ন বোর্ডের। তারপরও অভিযোগ খতিয়ে দেখার চেষ্টা করব।”
সবচেয়ে বিতর্কিত মন্তব্য এসেছে পানি উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে। গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শরিফুল ইসলাম অভিযোগের বিষয়ে সরাসরি জবাব না দিয়ে বলেন, “বারো-তেরো লাখ টাকার কাজেও আপনারা যান। এটা জরুরি ফান্ডের কাজ।” একপর্যায়ে তিনি এ বিষয়ে সংবাদ প্রকাশ না করারও অনুরোধ জানান বলে জানা গেছে।
স্থানীয়দের প্রশ্ন, নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের নিরাপত্তার জন্য নেওয়া প্রকল্পে যদি শুরুতেই অনিয়মের অভিযোগ ওঠে, তবে সেই প্রকল্প কতটা কার্যকর হবে? তারা দ্রুত তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং টেকসই ভাঙনরোধ কাজ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।
ভাঙন ঠেকাতে নেওয়া প্রকল্পই যদি ভাঙনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে নদীপাড়ের মানুষের শেষ আশ্রয় কোথায়—এ প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে ঘাঘটের তীরে।
রোহান/সা.এ.