নোয়াখালী সদর উপজেলার এওজবালিয়া ইউনিয়নের পূর্ব চাকলা গ্রামের দিনমজুর ইউছুফ মিয়া ও আমেনা বেগমের তিন সন্তানই শারীরিক ও বিকাশজনিত নানা সমস্যায় আক্রান্ত। অর্থের অভাবে উন্নত চিকিৎসা করাতে না পেরে প্রায় দুই মাস আগে মারা গেছে তাদের বড় ছেলে দিদার হোসেন মামুন। এখন বাকি দুই সন্তান শারমিন আক্তার আঁখি ও ইয়াছিন হোসেনকে নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে এই দম্পতির।
স্থানীয় সূত্র ও পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রায় ২২ বছর আগে বিয়ে হয় ইউছুফ মিয়া ও আমেনা বেগমের। বিয়ের দুই বছর পর তাদের প্রথম সন্তান দিদার হোসেন মামুনের জন্ম হয়। দুই বছর বয়সের পর থেকেই তার শারীরিক ও বিকাশজনিত বিভিন্ন সমস্যা দেখা দেয়। সে স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে ও কথা বলতে পারত না।
সন্তানের চিকিৎসার জন্য বিভিন্ন জায়গায় ছুটেছেন ইউছুফ ও আমেনা। কিন্তু দিনমজুরি করে পাওয়া সামান্য আয় দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার ব্যয় বহন করা তাদের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ে।
পরবর্তীতে তাদের মেয়ে শারমিন আক্তার আঁখি ও ছেলে ইয়াছিন হোসেনের জন্ম হয়। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের মধ্যেও বড় ভাইয়ের মতো শারীরিক ও বিকাশজনিত সমস্যা দেখা দেয়। বর্তমানে দুই সন্তানই স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা ও কথা বলতে পারে না। দৈনন্দিন কাজেও তাদের বাবা-মায়ের সহায়তা প্রয়োজন হয়।
পরিবারের দাবি, তিন সন্তানের চিকিৎসা ও পরিচর্যার পেছনে নিজেদের জমানো অর্থ ব্যয় করার পাশাপাশি ধারদেনাও করেছেন ইউছুফ মিয়া। একপর্যায়ে সহায়-সম্বল হারিয়ে সন্তানদের চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া তার পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়ে।
ইউছুফ মিয়া বলেন, ‘আমার সামর্থ্য যতটুকু ছিল, সন্তানদের চিকিৎসার জন্য সব করেছি। এখন আর পারছি না। এক ছেলেকে চিকিৎসার অভাবে হারিয়েছি। বাকি দুই সন্তানকে নিয়ে খুব কষ্টে আছি। সরকার ও বিত্তবান মানুষ সহযোগিতা করলে সন্তান দুটির চিকিৎসা করাতে পারতাম।’
আমেনা বেগম বলেন, ‘আমার সন্তান দুটি খুব কষ্টে আছে। আমি মা হয়ে চোখের সামনে এই কষ্ট দেখতে পারি না। টাকার অভাবে চিকিৎসা করাতে পারছি না। সবাই যদি একটু সহযোগিতা করেন, আমার সন্তানগুলোর চিকিৎসা করাতে চাই।’
পরিবার জানায়, চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী সন্তানদের উন্নত চিকিৎসা ও নিয়মিত পরিচর্যার প্রয়োজন ছিল। কিন্তু অর্থের অভাবে তা চালিয়ে যেতে পারেননি তারা। প্রায় দুই মাস আগে চিকিৎসার অভাবে বড় ছেলে মামুনের মৃত্যু হয়। এরপর থেকে বাকি দুই সন্তানকেও নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন বাবা-মা।
প্রতিবেশীরা জানান, অভাব-অনটনের সংসার হলেও সন্তানদের চিকিৎসা ও পরিচর্যায় কখনো অবহেলা করেননি ইউছুফ ও আমেনা। নিজেদের সামর্থ্যের শেষটুকু দিয়ে সন্তানদের পাশে থাকার চেষ্টা করেছেন তারা। এখন তাদের প্রয়োজন আর্থিক সহায়তা ও উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা।
পরিবারের দাবি, বড় ছেলে মামুন সরকারি প্রতিবন্ধী ভাতার আওতায় ছিল। তবে বাকি দুই সন্তান আঁখি ও ইয়াছিন এখনো কোনো সরকারি ভাতা বা অনুদানের আওতায় আসেনি।
এওজবালিয়া ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য ইব্রাহিম খলিল কাজল বলেন, ‘ইউছুফ মিয়া প্রতিবন্ধী সন্তানদের নিয়ে অনেক কষ্টে জীবনযাপন করছেন। আমরা ইউনিয়ন পরিষদ থেকে তার বড় ছেলে মামুনকে ভাতার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলাম। কিন্তু চিকিৎসার অভাবে দুই মাস আগে সে মারা যায়।’
তিনি বলেন, ইউছুফ মিয়ার বাকি দুই সন্তান আঁখি ও ইয়াছিনের প্রতিবন্ধী কার্ডের প্রক্রিয়া এখনো সম্পন্ন হয়নি। কার্ডের প্রক্রিয়া শেষ হলে তাদের সরকারি ভাতার আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে। তবে দুই সন্তানের উন্নত চিকিৎসার জন্য সরকার ও বিত্তবানদের এগিয়ে আসা প্রয়োজন।