তাহিরপুরে পাহাড়ি ঢলে নেমে আসা কয়লা সংগ্রহের হিড়িক
আব্দুল আলীম ইমতিয়াজ, তাহিরপুর (সুনামগঞ্জ)
X
আব্দুল্লাহ আল জাবের-ফাতিমা তাসনিম জুমা
বর্তমানে উপজেলার সীমান্ত এলাকার প্রায় পাঁচ হাজার মানুষ এই কুড়ানো কয়লা বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। প্রতি বছরের মতো এবারও আগাম বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ি ঢলে ভারতের মেঘালয় থেকে নেমে আসা পানিতে যাদুকাটা, মাহারাম, বৌলাই, রক্তি ও পাটলাই নদীতে প্রবল স্রোত প্রবাহিত হচ্ছে।
সুনামগঞ্জের হাওর অধ্যুষিত অন্যতম উপজেলা তাহিরপুর। ধান উৎপাদনের জন্য প্রসিদ্ধ এই উপজেলার প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশের আজও স্থায়ী কর্মসংস্থান হয়নি। ফলে পাহাড়ি ঢলের পানিতে এবং স্থলবন্দরের রাস্তায় পড়ে থাকা কয়লা কুড়িয়ে তাদের জীবন চলছে।
গত কয়েক দিনের ভারী বর্ষণে উপজেলার নিম্নাঞ্চলের ৫০টিরও বেশি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। আর এই ঢলের পানির সঙ্গেই সীমান্তের ওপার থেকে ভেসে আসছে প্রচুর পাহাড়ি কয়লা।
উপজেলার উত্তর শ্রীপুর ইউনিয়নের কলাগাঁও ছড়াসংলগ্ন এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ঢলের পানির সঙ্গে থরে থরে কয়লা ভেসে আসছে। বৃষ্টি ও স্রোত উপেক্ষা করে সীমান্তঘেঁষা জনপদের শতাধিক বাসিন্দা তা সংগ্রহ করতে পানিতে নেমে পড়েছেন। ঠেলা জাল দিয়ে নদী থেকে কয়লা ছেঁকে তুলছেন তারা। তীরে থাকা পরিবারের অন্য সদস্যরা সেই কয়লা বস্তাবন্দি করছেন। পরে সনাতন পদ্ধতিতে কয়লা থেকে নুড়ি ও বালু ঝেড়ে তা স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করা হচ্ছে।
বছরের এই সময়ে ছড়া থেকে কয়লা সংগ্রহ করলেও শুষ্ক মৌসুমে তারা স্থলবন্দরের সড়কে ট্রলি বা ট্রাক থেকে পড়ে যাওয়া কয়লা কুড়িয়ে বিক্রি করেন।
চারাগাঁও গ্রামের নারী কয়লা সংগ্রাহক জরিনা খাতুন বলেন, “ভারী বর্ষণে চারাগাঁও ছড়া দিয়ে যখন ঢলের পানি নামে, তখন মেঘালয় পাহাড় থেকে বালুমিশ্রিত কয়লা ভেসে আসে। আমরা ঠেলা জাল দিয়ে স্রোতের বিপরীতে তা সংগ্রহ করি। একেক বেলায় সর্বোচ্চ ৫ থেকে ১০ বস্তা কয়লা পাওয়া যায়। বালু ও নুড়ি পরিষ্কার করে প্রতি বস্তা ২৫০–৩০০ টাকায় বিক্রি করি।” স্থায়ী কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হলে এই ঝুঁকিপূর্ণ কাজ ছেড়ে সন্তানদের সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য উৎপাদনমুখী কাজে যুক্ত হওয়ার আকুতি জানান তিনি।
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, মেঘালয় পাহাড়ে উত্তোলিত কয়লার একটি অংশ বৃষ্টি ও ঢলের স্রোতে বালুর সঙ্গে মিশে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে। প্রায় ৫০ বছর ধরে এই অঞ্চলের মানুষ এভাবে কয়লা সংগ্রহ করে আসছেন। তবে গত ৫ বছর ধরে শ্রমিকদের এই কুড়ানো কয়লা অবাধে বিক্রির সুযোগ কমে গেছে।
চারাগাঁও স্থল শুল্ক স্টেশনের কয়লা আমদানিকারক সাদ্দাম হোসেন বলেন, পাহাড়ি ঢলের সঙ্গে ভেসে আসা দরিদ্রদের কুড়ানো কয়লা বিক্রি করতেও স্থানীয় বিজিবি ক্যাম্পের অনুমতি নিতে হয়। এই ‘বাংলা কয়লা’ যদি তারা অবাধে বিক্রি করতে পারত, তবে দরিদ্র মানুষগুলো লাভবান হতো।
তাহিরপুর কয়লা আমদানিকারক গ্রুপের সভাপতি হাজী খসরুল আলম সীমান্ত এলাকার এই নারী ও পুরুষ শ্রমিকদের তালিকা তৈরি করে সরকারি প্রণোদনা দেওয়ার দাবি জানান। একই সঙ্গে তিনি জানান, গত ২১ জুন আকস্মিক পাহাড়ি ঢলে তার চারাগাঁও ডাম্পে রাখা ১০০ টন কয়লা ভেসে গেছে, এতে তার প্রায় ১৬ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।
এদিকে স্থানীয় সচেতন মহল এই জনগোষ্ঠীর ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, স্থায়ী কর্মসংস্থান ও শিক্ষার অভাব থাকলে নতুন প্রজন্মও এই ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় ধাবিত হবে। একসময় এই উৎস বন্ধ হয়ে গেলে কর্মহীন এই বিশাল জনগোষ্ঠী চোরাই কয়লা পাচারের মতো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়তে পারে।
তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মেহেদী হাসান মানিক বলেন, বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ না থাকায় সীমান্ত এলাকার একটি বড় অংশ যাদুকাটা নদী ও ২০টি পাহাড়ি ছড়া থেকে কয়লা সংগ্রহ করে জীবিকা নির্বাহ করছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাদের জীবনধারা পরিবর্তনে যেকোনো পদক্ষেপ বাস্তবায়নে সহায়তা করা হবে।