নতুন মোড়কে পুরোনো নিয়ন্ত্রণ: ডিজিটাল আইনের সংস্কার কি তবে কথার কথাই?

নতুন মোড়কে পুরোনো নিয়ন্ত্রণ: ডিজিটাল আইনের সংস্কার কি তবে কথার কথাই?

বিতর্কিত সাইবার ও ডিজিটাল আইন সংস্কারের জোরালো প্রতিশ্রুতির মুখে সরকার যখন নতুন আইনি কাঠামোর রূপরেখা সামনে আনছে, তখন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার পর্যবেক্ষক এবং প্রবাসী গণমাধ্যমকর্মীদের মাঝে নতুন করে শঙ্কা দানা বাঁধছে। মুক্তমত প্রকাশের পথ সুগম করা এবং অতীতের নিপীড়নমূলক ধারাগুলো চিরতরে বিলোপের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও, নতুন খসড়া ও প্রশাসনিক পদক্ষেপে পুরোনো নজরদারি এবং সমালোচকদের কণ্ঠরোধ করার মানসিকতাই এখনো প্রবলভাবে দৃশ্যমান।
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন কিংবা পরবর্তী সাইবার নিরাপত্তা আইনের নামে বিগত বছরগুলোতে বাংলাদেশে ভিন্নমত দমনের যে নজিরবিহীন সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল, ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর তা থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে আসাই ছিল সময়ের মূল দাবি। কিন্তু নতুন আইনের ক্ষেত্রে নাগরিক সমাজ, ডিজিটাল অধিকার কর্মী এবং মাঠপর্যায়ের সাংবাদিকদের সঙ্গে উন্মুক্ত ও কার্যকর সংলাপের অভাব স্পষ্ট। অভিযোগ উঠেছে, একটি সত্যিকারের স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক সাইবার পরিবেশ নিশ্চিত করার বদলে আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আগের দমনমূলক কাঠামোরই পুনরাবৃত্তি ঘটানো হচ্ছে।
প্রস্তাবিত নতুন নীতিমালায় তথাকথিত ‘অপতথ্য’, ‘রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি’ কিংবা ‘ধর্মীয় ও সামাজিক অনুভূতি’ সংক্রান্ত অস্পষ্ট এবং অনির্ধারিত শব্দগুলোর উপস্থিতি সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, আইনের এই ধরনের ফাঁকফোকর ব্যবহার করেই সবসময় অনুসন্ধানী সাংবাদিক, অধিকারকর্মী এবং সাধারণ অনলাইন ব্যবহারকারীদের হয়রানি করা হয়েছে। নতুন আইনেও যদি কোনো নির্দিষ্ট ব্যাখ্যা ছাড়া নির্বাহী বা পুলিশি প্রশাসনকে অনলাইন কনটেন্ট মুছে ফেলা, প্ল্যাটফর্ম বন্ধ করা কিংবা বিনা পরোয়ানায় নজরদারির ঢালাও ক্ষমতা দেওয়া হয়, তবে তা পুরোনো কালো আইনেরই নামান্তর হয়ে থাকবে।
প্রবাসী সাংবাদিক ও অধিকার সংগঠনগুলোর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ডিজিটাল পরিসরে সাইবার ক্রাইম, হ্যাকিং কিংবা আর্থিক জালিয়াতি মোকাবিলার চেয়ে এখনো রাজনৈতিক সমালোচনা ঠেকানোকেই রাষ্ট্র বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদ (আইসিসিপিআর)-এর মানদণ্ড অনুসারে যেখানে বাকস্বাধীনতা ও ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা সুরক্ষা মৌলিক নীতি হওয়ার কথা, সেখানে নতুন নীতিমালার মূল নজর রয়ে গেছে রাষ্ট্রের একক নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার দিকেই।
কেবল নামকাওয়াস্তে আইন বদলে আন্তর্জাতিক মহল বা সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করার কোনো সুযোগ নেই। যদি সমালোচনার অধিকার, তথ্যের অবাধ প্রবাহ এবং অনুসন্ধানী সাংবাদিকতাকে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য করার মানসিকতা রাষ্ট্র পরিহার করতে না পারে, তবে এই নতুন আইনও ইতিহাসে আরেকটি নিপীড়ক হাতিয়ার হিসেবেই চিহ্নিত হবে। আইনি বেড়াজাল তৈরি করে অসন্তোষ ধামাচাপা দেওয়ার চেয়ে জনগণের প্রশ্ন তোলার অধিকারকে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়াই এখন সরকারের সদিচ্ছার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

শাহ রিয়ার রিজবি – ফ্রান্স প্রতিনিধি, ঢাকা ইনফো২৪

শাহরিয়ার রিজবি একজন বাংলাদেশি সাংবাদিক, যিনি অনলাইন সংবাদমাধ্যম DhakaInfo24-এর সঙ্গে যুক্ত।Shahriar Rijvi is a Bangladeshi journalist working with DhakaInfo24.