মধ্যবর্তী নির্বাচনেই কি শেষ হবে ট্রাম্প-যুগ

মতামত

মধ্যবর্তী নির্বাচনেই কি শেষ হবে ট্রাম্প-যুগ
ফ্লোরিডায় নির্বাচনী প্রচারে ডোনাল্ড ট্রাম্প

পরিসংখ্যান ও জনমত জরিপের পূর্বাভাস বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড় ধাক্কা খেতে যাচ্ছে রিপাবলিকান পার্টি। হ্যারি ট্রুম্যানের পর আর কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের মধ্যবর্তী নির্বাচনে যাওয়ার আগে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো এত কম জনপ্রিয়তার রেটিং ছিল না। আর এই রেটিং এখনো ক্রমেই কমছে।

পূর্বাভাস অনুযায়ী, ডেমোক্র্যাটরা ১১ শতাংশ পয়েন্টের ব্যবধানে জয়ী হতে যাচ্ছে, যা গত প্রায় ২০ বছরের মধ্যে যেকোনো দলের জন্য সবচেয়ে বড় উত্থান। এটি খুবই সম্ভব যে ডেমোক্র্যাটরা সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পাশাপাশি কংগ্রেসে একটি বড় সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করবে।

এই সংখ্যাগরিষ্ঠতা বাস্তবে বড় ধরনের পার্থক্য গড়ে তুলবে। ট্রাম্প তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদে যেসব নীতি বাস্তবায়ন করেছেন—যেমন অভিবাসন তদারকি জোরদার, বাণিজ্য বিরোধ, সরকারি কর্মী বাহিনী ছাঁটাই, ইরান যুদ্ধ এবং তাঁর নিজের পরিবারের দুর্নীতি—সেগুলোর ওপর অবশেষে হয়তো সংসদীয় নজরদারি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে। দৃশ্যত পরিবর্তনের হাওয়া বইছে, এবং সবার মনে এখন একটাই প্রশ্ন: সত্যিই কি ট্রাম্প যুগের অবসান ঘটছে?

নিউইয়র্ক টাইমস-এর ডেভিড ওয়ালেস-ওয়েলস লিখেছেন, ‘কেউ আগাম কথা বলে কোনো নজর লাগাতে চাইছে না, তবে আমাদের কাছে থাকা সব আলামত ইঙ্গিত দিচ্ছে যে ঐতিহাসিক হোক বা না হোক, এই মধ্যবর্তী নির্বাচনগুলো সম্ভবত একটি রাজনৈতিক যুগের সমাপ্তি চিহ্নিত করতে যাচ্ছে।’

এর ফলে পরবর্তী সময়ে কী দাঁড়াবে, তা এক জটিল রাজনৈতিক বাস্তবতা। কারণ, ট্রাম্পের নিজস্ব শাসন থেকে হয়তো আমেরিকা মুক্তি পাবে, কিন্তু তাঁর উসকে দেওয়া বিভাজন এবং বিশৃঙ্খলায় ক্ষতবিক্ষত এক দেশ হিসেবেই থেকে যাবে।

যখন ট্রাম্পের বিদায় ঘটবে, তত দিনে তিনি আট বছর ক্ষমতায় থেকেছেন এবং ১২ বছরেরও বেশি সময় ধরে এক বিষাক্ত রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে অবস্থান করেছেন। একজন সাধারণ রাজনীতিবিদের জন্যও এটি দীর্ঘ সময়। আর যে রাজনীতিবিদ সব নিয়ম-নীতি ভেঙে নিজেকে সবকিছুর কেন্দ্রে বসিয়ে দেন, তাঁর ক্ষেত্রে এমন প্রভাব যেন মনে হয় তিনি কয়েক দশক ধরে প্রেসিডেন্ট পদে ছিলেন।

ডোনাল্ড ট্রাম্প
ডোনাল্ড ট্রাম্প

তিনি ইতিমধ্যে এমন কিছু নীতি প্রয়োগ করেছেন, যা বাতিল করা প্রায় অসম্ভব। এসব নীতি উল্টে দিতে প্রয়োজন বিপুল পরিশ্রমে গড়ে তোলা জটিল আইনি প্রক্রিয়া এবং প্রায় অসম্ভব এক দ্বিদলীয় ঐকমত্য। ইউএসএআইডি বিলুপ্ত হয়ে গেছে। ‘ডোজ’ (ডিপার্টমেন্ট অব গভর্নমেন্ট এফিশিয়েন্সি)-এর কার্যক্রমে যেসব সরকারি বিভাগ কার্যত নিষ্ক্রিয় বা বিলুপ্ত হয়ে পড়েছে, সেগুলোও হয়তো চিরতরে হারিয়ে গেছে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বৈশ্বিক শুল্কব্যবস্থা এবং ‘আইসিই’-এর জন্য নির্বাহী ও বাজেট–সংক্রান্ত ক্ষমতায়ন। আর সবচেয়ে কঠিন বিষয় হলো ইরান যুদ্ধ—যা দ্রুত শেষ করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া সত্ত্বেও এখন একটি অনির্দিষ্টকালের সংঘাত বলে মনে হচ্ছে। ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচন ডেমোক্র্যাটদের জন্য একটি জয় বয়ে আনলেও, তারা যে দেশের দায়িত্ব পাবে তা ট্রাম্পের হাতে স্থায়ীভাবে রূপান্তরিত এক যুক্তরাষ্ট্র।

আর সেটিও কিন্তু একটি বড় ‘যদি’। ট্রাম্প এমন এক একক ব্যক্তিত্ব যিনি শ্বেতাঙ্গ ইভানজেলিক্যাল খ্রিষ্টান থেকে শুরু করে শ্রমিক শ্রেণি লাতিনো এবং সিলিকন ভ্যালির বিলিয়নিয়ারদের মতো অত্যন্ত বৈচিত্র্যময় ও অসংগঠিত গোষ্ঠীকে একটি জোটে ধরে রাখতে পেরেছেন।

‘মাগা’ এমন একটি আন্দোলন, যা ট্রাম্পের সঙ্গেই আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা, এবং ট্রাম্প ক্ষমতায় থাকার কারণে এখন এই আন্দোলন কিছুটা দুর্বল মনে হচ্ছে।

ইসরায়েল থেকে বিনিয়োগ বা সমর্থন প্রত্যাহার এখন এমন এক সংঘাতের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে, যা কেবল রাজনৈতিক ও আদর্শগত অবস্থানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি দলের ভেতরে এক নতুন ধারার উত্থানকে নির্দেশ করে, যা দ্রুত পরিবর্তিত দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে তাল মেলাতে না পারা পুরোনো নেতৃত্বের সঙ্গে সম্পর্ক ছেদ করছে।

ব্রেক্সিট বা অন্যান্য প্রথাবিরোধী আন্দোলনের মতো, আপনি যখন নিজেই দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হন, তখন আপনার সেই ‘প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে লড়াই করার’ ক্ষমতা হারিয়ে যায়। দোষ দেওয়ার জন্য নতুন লোক বা ক্ষোভ ঝাড়ার জন্য নতুন বিষয় খোঁজা তখন আর বিদ্রোহের প্রকাশ থাকে না, বরং তা কেবল অভিযোগ ও নেতিবাচকতায় পর্যবসিত হয়।

তবে ট্রাম্পের পর যে প্রার্থীই আসুক না কেন—এমনকি তা যদি ক্যারিশমার চরম অভাব থাকা জেডি ভ্যান্সও হন—তিনি একই সাধারণ বক্তব্য ব্যবহার করে কিছুটা সফলতা পেতে পারেন।

সেই আক্রমণাত্মক এবং আক্রমণমুখী আচরণের মিশ্রণ ট্রাম্পের অনুসারীদের কাছে এখনো খাঁটি ও প্রথাবিরোধী মনে হতে পারে। এমনকি ডেমোক্রেটিক দলের পুরোনো ও ঝাপসা রাজনৈতিক কাঠামোর তুলনায় এটিকে অপেক্ষাকৃত স্পষ্ট এবং প্রাঞ্জল বলে মনে হতে পারে।

আর এই ডেমোক্রেটিক দলীয় ক্ষমতাকাঠামো নিজেই একটি বড় দুশ্চিন্তার কারণ। নির্বাচন আসতে এখনো কিছু সময় বাকি, কিন্তু ডেমোক্র্যাটরা নিজেরাই স্পষ্টভাবে সামনে এগোতে বা পেছনে ফিরতে পারছে না। দলের পুরোনো নেতৃত্ব এখন ক্লান্ত ও নিঃশেষিত; তারা হয় প্রবীণতন্ত্রের অংশ, নয়তো তার খুব কাছাকাছি।

দ্বিতীয় কাতারে আছেন কমলা হ্যারিস, যাঁর নির্বাচনী প্রচারণা ২০২৬ সালে কোনো নতুন প্রার্থীর প্রত্যাশা জাগায় না, বরং তিনি যেন এক প্রশাসনিক আমলা—যাঁর মধ্যে গুরুত্ব বা গাম্ভীর্য ছাড়া শুধু পুরোনো ধারার ধারাবাহিকতাই দৃশ্যমান।

আর প্রবীণদের কাতারে এমন একদল নেতা আছেন, যাঁরা বছরের পর বছর ক্ষমতা ধরে রেখে এখন কেবল নিজেদের অধিকারবোধ এবং বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন এক অহংকার প্রদর্শন করছেন—যেমন ন্যান্সি পেলোসি, চাক শুমার, হিলারি ক্লিনটন।

কেবল বারাক ওবামা এখনো কিছুটা প্রাণবন্ত প্রাসঙ্গিকতা ধরে রেখেছেন। তিনি তা ব্যবহার করেছেন মিশিগানের সিনেট প্রার্থী আব্দুল আল-সাইয়েদকে সমর্থন দিতে। আল-সাইয়েদ অতীতের সঙ্গে সম্পর্ক ছেদ করে এক নতুন রাজনৈতিক যাত্রা শুরু করছেন, যাঁকে ওবামা এক প্রজন্মের ব্যাটন হস্তান্তরের সঙ্গে তুলনা করেছেন। ওবামা বলেছেন, ‘আমরা যে কাজ শুরু করেছিলাম, উনি তা শেষ করবেন।’

কিন্তু মিশিগানের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যে আল-সাইয়েদ প্রথম মুসলিম সিনেটর হিসেবে ইতিহাস গড়ার দ্বারপ্রান্তে থাকলেও, ডেমোক্র্যাটদের শীর্ষ নেতারা তাঁকে হয় ইতস্তত ও অনিচ্ছাকৃত সমর্থন দিচ্ছেন, নয়তো তাঁর অবস্থান নিয়ে সরাসরি আক্রমণ করছেন। আক্রমণের মূল কারণ ইসরায়েল সম্পর্কিত তাঁর অবস্থান—আল-সাইয়েদ মনে করেন ইসরায়েল গাজায় গণহত্যা চালিয়েছে এবং তাদের সব সহায়তা বন্ধ করা উচিত।

পেনসিলভানিয়ার হ্যারিসবার্গে ‘মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন সমাবেশে’ সমর্থকদের হর্ষধ্বনির জবাব দিচ্ছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প l এএফপি
পেনসিলভানিয়ার হ্যারিসবার্গে ‘মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন সমাবেশে’ সমর্থকদের হর্ষধ্বনির জবাব দিচ্ছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প l এএফপি

নির্বাচনের মাত্র কয়েক দিন আগে, ডেমোক্রেটিক পার্টির কংগ্রেসম্যান হ্যালি স্টিভেন্স—যাঁকে গত আগস্টের প্রাথমিক নির্বাচনে হারিয়ে আল-সাইয়েদ প্রার্থিতা পেয়েছিলেন—তিনি আল-সাইয়েদ এবং ইসরায়েল–সংক্রান্ত তাঁর মন্তব্যের তীব্র সমালোচনা করছেন।

এর ফলে এক কুরুচিপূর্ণ সংঘাতের সৃষ্টি হয়; প্রথমে আল-সাইয়েদ জানান যে রোববার আয়োজিত দলের ঐক্যসভায় তিনি স্টিভেন্সকে পাশে চান না। আর দিনের শেষভাগে ঘটনা আরও চরম আকার ধারণ করে: স্টিভেন্স প্রকাশ্যে আল-সাইয়েদের রিপাবলিকান প্রতিদ্বন্দ্বী মাইক রজার্সকে সমর্থন জানিয়ে বসেন।

ইসরায়েল থেকে বিনিয়োগ বা সমর্থন প্রত্যাহার এখন এমন এক সংঘাতের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে, যা কেবল রাজনৈতিক ও আদর্শগত অবস্থানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি দলের ভেতরে এক নতুন ধারার উত্থানকে নির্দেশ করে, যা দ্রুত পরিবর্তিত দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে তাল মেলাতে না পারা পুরোনো নেতৃত্বের সঙ্গে সম্পর্ক ছেদ করছে।

স্টিভেন্সের নির্বাচনী প্রচারণার নেতৃত্ব দেওয়া ডেমোক্র্যাট নেতা ডেভিড ক্র্যামারের একটি উক্তিতে এটি চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে: ‘সবাই বলছে এটি একটি “বিশাল ছাদের দল”, কিন্তু আমাদের মাঝে মাঝে ভয় হয় এই ছাদটি হয়তো একটি সার্কাসে পরিণত হচ্ছে এবং আমাদেরই হয়তো বের করে দেওয়া হবে।’ ক্র্যামার নিজেও সিনেট নির্বাচনে রিপাবলিকান রজার্সকে ভোট দিচ্ছেন।

বিষয়টি সেখানেই পরিষ্কার। কিছু ডেমোক্র্যাট বামপন্থীদের শর্তে জয়ী হওয়ার এবং দল থেকে কোণঠাসা হওয়ার চেয়ে বরং নির্বাচনে হেরে যাওয়াকেও শ্রেয় মনে করেন।

এসব ঘটনা এমন এক ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দেয়, যেখানে ট্রাম্প হয়তো দৃশ্যপটে থাকবেন না, কিন্তু ট্রাম্পের অনুসারীদের হাতে যথেষ্ট গতিশীলতা এবং ডেমোক্রেটিক পার্টির ভেতরে এতটাই বিশৃঙ্খলা বজায় থাকবে যে মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের জয়ও ট্রাম্পবাদের জন্য কেবল একটি সাময়িক ধাক্কা হিসেবেই রয়ে যাবে, যা দিয়ে পুরোনো রাজনৈতিক ব্যবস্থার পুনর্বাসন বা নতুন কিছুর সূচনা সম্ভব হবে না।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প

আমরা আগেও এই পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছি। সত্যি বলতে, তখন ডেমোক্র্যাটদের জন্য পরিস্থিতি এর চেয়ে বহুগুণ ভালো ছিল। ২০২০ সালে ট্রাম্পের পরাজয় ঘটেছিল এমন এক প্রেক্ষাপটে, যেখানে জো বাইডেনের মতো এক পরিচিত ও শক্তিশালী ডেমোক্র্যাট প্রার্থী ছিলেন।

এই মধ্যবর্তী নির্বাচনগুলো হয়তো ট্রাম্প যুগের এক অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটাবে, কিন্তু এরপর যা আসছে তা সম্ভবত ‘দীর্ঘমেয়াদি ট্রাম্প’-এরই এক নতুন রূপ: যেখানে রিপাবলিকান পার্টি ট্রাম্পকে ছাড়া পথ চলতে ব্যর্থ, আর ডেমোক্রেটিক পার্টি ট্রাম্পের বিরোধিতা করা ছাড়া নিজস্ব কোনো সুনির্দিষ্ট কিছু খুঁজে পেতে এখনো অসমর্থ।

  • নাসরিন মালিক গার্ডিয়ানের কলামিস্ট। দ্য গার্ডিয়ান থেকে সংক্ষেপে অনূদিত।

ঢাকা ইনফো ২৪ একটি বহুমুখী তথ্য বাতায়ন যেখানে আপনি পাবেন ব্রেকিং নিউজ, লাইফস্টাইল গাইড এবং ক্যারিয়ার বিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ সব আপডেট। আপনার প্রতিদিনের তথ্যের চাহিদা মেটাতে আমরা আছি আপনার পাশে।

সূত্র: প্রথম আলো · মতামত