রংপুর: রংপুরের নর্থভিউ হোটেলের ছাদ থেকে এইচএসসি পরীক্ষার্থী নুজসাতের (১৮) মৃত্যুর ঘটনায় চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে। মৃত্যুর আগে নিজের মোবাইল ফোন ফ্যাক্টরি রিসেট করেছিলেন নুজসাত। তবে কল রেকর্ড বিশ্লেষণে গ্রেফতার প্রাইভেট শিক্ষকের সঙ্গে তার দীর্ঘ ৯-১০ মাসের প্রেমের সম্পর্কের সন্ধান পেয়েছে পুলিশ।
মঙ্গলবার (২৩ জুন) রংপুর মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী শাহরিয়ার আহমেদ সাকিনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। নতুন এই তথ্য নুজসাতের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। এদিন নুজসাতের বাবা নজরুল ইসলাম কোতোয়ালি থানায় আত্মহত্যার প্ররোচণার মামলা দায়ের করেন। মামলার পরই প্রধান আসামি হিসেবে গ্রেফতার হন নুজসাতের প্রাইভেট শিক্ষক শাহরিয়ার আহমেদ সাকিন।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, ঘটনার দিন নর্থভিউ হোটেলের সিসিটিভি ফুটেজে নুজসাতকে বিকেল ৪টা ৫৪ মিনিটে হোটেলের ছাদে উঠতে দেখা যায়। সেখানে কিছু সময় অবস্থান করে তিনি মোবাইল ফোন ব্যবহার করেন। বিকেল ৫টা ৪২ মিনিটের দিকে মোবাইল ফোন রেখে ছাদের রেলিংয়ের ওপর বসেন এবং এক পর্যায়ে নিচে পড়ে যান।
তদন্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে— নুজসাত মৃত্যুর আগে তার মোবাইল ফোনটি ফ্যাক্টরি রিসেট করে ফেলেছিলেন। ফলে ফোনের সব ডেটা মুছে যায়। তবে পুলিশ তার সিমের কল ডিটেইলস বিশ্লেষণ করে সাকিনের সঙ্গে শেষ মুহূর্তের যোগাযোগের প্রমাণ পেয়েছে।
রংপুর মহানগর পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার সনাতন চক্রবর্তী জানান, ‘তাদের মধ্যে প্রায় ৯ থেকে ১০ মাসের প্রেমের সম্পর্ক ছিল, যা জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছেন অভিযুক্ত। বিভিন্ন সময়ে তাদের দেখা-সাক্ষাৎ ও যোগাযোগের প্রমাণ মিলেছে।’
মামলার এজাহারে নুজসাতের বাবা নজরুল ইসলাম উল্লেখ করেন, ঘটনাস্থল থেকে তিনি মেয়ের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটি পান, যেখানে মেসেজসহ বিভিন্ন তথ্য ডিলিট করা অবস্থায় ছিল। পরে বিভিন্ন সূত্রে জানতে পারেন, মেয়ের প্রাইভেট শিক্ষক সাকিনের সঙ্গে তার মেয়ের একসঙ্গে তোলা ছবি এবং কথোপকথনের মেসেজ মোবাইল ফোনে ছিল।
এজাহারে তিনি অভিযোগ করেন, ‘সাকিনের মানসিক নির্যাতনের কারণেই আমার মেয়ের মৃত্যু হয়েছে বলে আমি সন্দেহ করছি।’ এ ছাড়া মামলায় আরও ৪-৫ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে।
থানা থেকে আদালতে নেওয়ার পথে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হলে সাকিন সব অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, ‘নুজসাত আমার ছাত্রী ছিল। চার জনের একটি ব্যাচে সে আমার কাছে পড়তো। এক পর্যায়ে বুঝতে পারি সে আমাকে পছন্দ করে। তখন ওই ব্যাচ থেকে সরে আসি। পরে তার মায়ের অনুরোধে তাকে অন্য ব্যাচে নিই। কিন্তু সেখানেও সে আমাকে পছন্দ করত এবং বিভিন্ন ব্যক্তিগত সমস্যার কথা বলে হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করত। পরে আমি তার সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দিই।’
সাকিন দাবি করেন, প্রায় তিন মাস আগে তিনি নুজসাতকে পড়ানো বন্ধ করেন এবং এই মৃত্যুর ঘটনায় তার কোনো দায় নেই। তবে পুলিশের দাবি ভিন্ন। উপ-পুলিশ কমিশনার সনাতন চক্রবর্তী বলেন, ‘তার বিরুদ্ধে আমলযোগ্য অপরাধের প্রাথমিক প্রমাণ পেয়েছি। ঘটনার সময় অভিযুক্ত হোটেলের আশপাশে ছিলেন না— এটি নিশ্চিত হওয়া গেছে। তবে দীর্ঘদিনের প্রেমের সম্পর্ক ছিল। ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটনে তদন্ত চলমান রয়েছে। তদন্ত শেষে মৃত্যুর পেছনের মূল কারণ সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যাবে।’
উল্লেখ্য, নুজসাত নগরীর খলিফাপাড়া এলাকার নজরুল ইসলামের মেয়ে এবং ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের এইচএসসি পরীক্ষার্থী ছিলেন। তার অকাল মৃত্যুতে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।