রাবি: র্যাগিংয়ের ভিডিও ধারণ করাকে কেন্দ্র করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) মার্কেটিং বিভাগের শিক্ষার্থীদের হামলায় তিন সাংবাদিক ও রাকসুর দুই নেতা আহত হয়েছেন। ভুক্তভোগীদের দাবি, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ও বিভাগের সভাপতির উপস্থিতিতেই এ হামলার ঘটনা ঘটে।
বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) সন্ধ্যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের রবীন্দ্র ভবনের সামনে এ ঘটনা ঘটে।
মারধরের শিকার হয়েছেন রাবি প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ও দ্য ডেইলি ক্যাম্পাস’র প্রতিনিধি মারুফ হোসেন মিশন, ঢাকা পোস্ট’র জুবায়ের জিসান, দৈনিক মানবকণ্ঠ’র আবু বকর অনিক, রাকসুর এজিএস সালমান সাব্বির এবং বিতর্ক ও সাহিত্য সম্পাদক ইমরান লস্কর।
প্রত্যক্ষদর্শী ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, মার্কেটিং বিভাগের কয়েকজন জুনিয়র শিক্ষার্থী সাংবাদিকদের জানান, সিনিয়ররা তাদের মিটআপের নামে দীর্ঘ সময় দাঁড় করিয়ে রেখে র্যাগিং করছেন। এ তথ্যের ভিত্তিতে এক সহকারী প্রক্টর ও সাংবাদিকেরা রবীন্দ্র ভবনের পাশের সাইকেল গ্যারেজ এলাকায় যান। সেখানে গিয়ে তারা দেখতে পান, জুনিয়র শিক্ষার্থীদের কয়েকটি সারিতে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে। এ সময় ঘটনাটির ভিডিও ধারণ করেন এক সাংবাদিক।
ভিডিও ধারণের পর উপস্থিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। সাংবাদিকদের দাবি, ভিডিও মুছে ফেলার জন্য তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয় এবং একপর্যায়ে হুমকি ও গালাগাল করা হয়। পরে ঘটনাস্থলে আরও সাংবাদিক এবং রাকসুর দুই নেতা গেলে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করা হলেও উত্তেজনা কমেনি।
প্রায় দেড় ঘণ্টা পর ঘটনাস্থলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. মাহবুবুর রহমান, মার্কেটিং বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক ড. এম. বোরাক আলী ও শিক্ষক ড. নুরুজ্জামান উপস্থিত হন। আলোচনা শেষে প্রক্টর অফিসে গিয়ে বিষয়টি সমাধানের সিদ্ধান্ত হয়। তবে সেখান থেকে বের হওয়ার সময় সাংবাদিক ও রাকসু নেতাদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ ওঠে।
অভিযোগ অনুযায়ী, মার্কেটিং বিভাগের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী হাবিবুর রহমান হিমেল প্রথমে সাংবাদিক আবু বকর অনিককে থাপ্পড় ও লাথি মারেন। পরে আরও কয়েকজন শিক্ষার্থী যোগ দিয়ে সাংবাদিক ও রাকসু নেতাদের ওপর চড়, কিল, ঘুষি ও লাথি মারেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে প্রক্টর কয়েকজনকে তার গাড়িতে তুলে প্রক্টর অফিসে নিয়ে যান।
এ ঘটনায় অভিযুক্ত হিসেবে মার্কেটিং বিভাগের শিক্ষার্থী হাবিবুর রহমান হিমেল, সামি, ওমি, আহমেদ রিয়াদ, জিহাদ, সামির ও আতিকসহ কয়েকজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
ভুক্তভোগী মারুফ হোসেন মিশন বলেন, ‘আমি র্যাগিংয়ের খবর পেয়ে প্রক্টর স্যারকে কল করে জানাই। কিছুক্ষণ পরে একজন সহকারী প্রক্টর ঘটনাস্থলে চলে আসে এবং আমিও তার পিছু পিছু যাই। পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে আমি ভিডিও ধারণ করি। সেখানে সারিবদ্ধভাবে জুনিয়রদের দাঁড় করিয়ে র্যাগ দিচ্ছিল সিনিয়ররা। আমাকে ভিডিও ডিলিট করতে চাপ দেয় ও গালাগালি করতে থাকে এবং ডিলিট করতে রাজি না হওয়ায় তেড়ে মারতে আসে কয়েকবার। এক পর্যায়ে আমাকে ও আমার ক্লাবের দুই সাংবাদিককে এবং রাকসুর এজিএস ও বিতর্ক সম্পাদককে চড়-কিল-ঘুসি মারে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এক পর্যায়ে প্রক্টর তার নিজের গাড়িতে করে প্রক্টর অফিসে নিয়ে যান। এ ঘটনায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাই।’
এদিকে অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে অভিযুক্ত শিক্ষার্থী হাবিবুর রহমান হিমেল বলেন, ‘এটা আপনি ভুল তথ্য পেয়েছেন। একটা জটলা হয়েছিল, কথা কাটাকাটি হয়েছে জাস্ট। সেখানে কোনো মারামারির ঘটনা ঘটেনি।’
তবে একই বিভাগের শিক্ষার্থী মাহির বলেন, ‘মারধরের ঘটনা ঘটেছে। তবে আমি মারধর করিনি।’
রাকসুর বিতর্ক ও সাহিত্য সম্পাদক ইমরান লস্কর বলেন, ‘ওখানে মারধরের ঘটনা ঘটেছে। আমি থামাতে গেলে আমার ওপরও আঘাত আসে। আমরা রাকসুর পক্ষ থেকে প্রশাসনের কাছে এ ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক বিচারের দাবি জানাই।’
মার্কেটিং বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক ড. এম. বোরাক আলী বলেন, ‘এ ঘটনার তো মিটমাট হয়ে গেছে। আপনি বিভাগে আসেন। সরাসরি কথা হবে। সরাসরি কথা বললে বেশি ইন্টারেক্টিভ হবে।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর অধ্যাপক জহুরুল ইসলাম বলেন, ‘মারধরের অধিকার তাদেরকে কেউ দিইনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের কেউ কাউকে মারতে পারে না। এটা তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ভঙ্গ করেছে। অবশ্যই তাদের শাস্তি হওয়া উচিত।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘আমি নিজে সেখানে ছিলাম। গতকাল সাংবাদিকদের সঙ্গে যে ঘটনা ঘটেছে, তা অত্যন্ত দুঃখজনক এবং নিন্দনীয়। প্রক্টর, সরকারি প্রক্টর এবং তার বিভাগের শিক্ষকদের নিয়ে আমরা সমাধানের চেষ্টা করেছি। এ ছাড়া ভিসি স্যার নিজে তার বিভাগের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেছেন। তারপরও এরকম একটা ঘটনা আমাদের মধ্যে সংশয় জাগায়। আমি মনে করি, এ ধরনের ঘটনায় যারা দোষী তাদেরকে শাস্তির আওতায় আনা উচিত। আমি বিশ্বাস করি, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সেটা করবে।’
র্যাগিংয়ের অভিযোগ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘তাদের যেভাবে আমরা পেয়েছি, তাতে র্যাগিংয়ের সকল লক্ষণ আছে।’
সাংবাদিক ও রাকসু নেতাদের মারধরের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমার সামনে সাংবাদিক ও রাকসু নেতাদের মারধর করা হয়েছে। এটা খুবই জঘন্যতম অন্যায় হয়েছে। এটার বিষয়ে দোষীদের শাস্তির মুখোমুখি করা হবে।’