
পারভেজ হোসেন ইমন তখন ধুন্দুমার ব্যাটিং করছেন। আগ্রাসী জুটি পেরিয়েছে ফিফটি। কিন্তু অ্যারন হার্ডির স্লোয়ারে টাইমিংয়ে গড়বড় করলেন পারভেজ। ক্যাচটি নিয়ে বুনো উদযাপনে মেতে উঠলেন মিচেল মার্শ। অস্ট্রেলিয়ান অধিনায়ক জানতেন, এই উইকেট কতটা গুরুত্বপূর্ণ। ম্যাচের মোড় বদলের মুহূর্ত হয়ে গেল সেটিই। ওই উইকেটের আগ পর্যন্ত বাংলাদেশের জয়ের সম্ভাবনা ছিল উজ্জ্বল। কিন্তু ক্রমে তা ফিকে হতে হতে একসময় গেল হারিয়ে।
ছুটির দিনে চট্টগ্রামের ফ্লা. লে. শহীদ মতিউর রহমান চৌধুরি ক্রিকেট স্টেডিয়ামে দর্শক ছিল হাজার বিশেক। ম্যাচজুড়ে গ্যালারি মাতিয়ে রাখা সেই দর্শকেরা ফিরে গেলেন হতাশ হৃদয়ে। ৭ রানের জয়ে এক ম্যাচ বাকি রেখে সিরিজ জয় নিশ্চিত করল অস্ট্রেলিয়া। পারভেজ যখন আউট হন, বাংলাদেশের প্রয়োজন ছিল ৪৩ বলে ৬৭ রান। উইকেট বাকি তখনও ৮টি। টি২০তে এই সমীকরণ মোটামুটি সহজই। কিন্তু বাংলাদেশ পারেনি সেটি মেলাতে।
জয়-পরাজয়ের ব্যবধান যতটা কম মনে হচ্ছে, লড়াই শেষ দিকে আদতে ততটা জমেনি। শেষ ওভারে বাংলাদেশের প্রয়োজন ছিল ২৩ রানে, শেষ তিন বলে ১৯। এরপর তাওহিদ হৃদয়ের ছক্কা ও চারে কিছুটা কমে ব্যবধান। টস জিতে ব্যাটিংয়ে নামা অস্ট্রেলিয়া ২০ ওভারে তোলে ১৯৬। ক্যারিয়ার সেরা ইনিংসে ৫২ বলে ৮৯ রান করেন ম্যাট রেনশ। পরে তিনি বল হাতেও দলকে এনে দেন প্রথম ব্রেক থ্রু। ঝড়ো শুরুর পরও বাংলাদেশ শেষ পর্যন্ত করতে পারে ১৮৯ রান।
অস্ট্রেলিয়ার ইনিংস শুরু হয় ঝড়ের আভাসেই। শেখ মেহেদি হাসানের বদলে একাদশে ফেরা নাসুম আহমেদের প্রথম ওভারেই ছক্কা ও চার মারেন জশ ইংলিস। পরের ওভারে আব্দুল গাফফার সাকলাইনকে তিনটি চার মারেন মিচেল মার্শ। বাংলাদেশ দ্রুতই পাল্টা ধাক্কা দেয় টানা দুই ওভারে উইকেট নিয়ে। ইংলিসকে (১১) ফেরান নাসুম। অভিষেক টি২০’র এক বছর পর দ্বিতীয়টি খেলতে নেমে দ্বিতীয় বলেই উইকেটের দেখা পান নাহিদ রানা।
পাওয়ার প্লের শেষ বলে মিচেল মার্শকে (২০) থামার মুস্তাফিজুর রহমান। ৪৪ রানে ৩ উইকেট হারায় অস্ট্রেলিয়া। আর সেই ফাঁস আলগা হয় টিম ডেভিডের পাল্টা আক্রমণে। নাহিদ রানার শর্ট বলে দারুণ পুল শটে ছক্কার পর বিশাল দুটি ছক্কা মারেন তিনি সাকলাইনের দুটি স্লোয়ারে। পরে নাহিদকে আরেকটি ছক্কা মারেন ১৪৭ কিলোমিটার গতির বলে ফ্লিক করে।
রেনশর শুরুটা ছিল মন্থর। ৮ ওভার শেষে তার রান ছিল ১৫ বলে ১৭। এরপর গা ঝাড়া দেন তিনি রিশাদ হোসেকে গ্যালারিতে পাঠিয়ে। এই লেগ স্পিনারকেই পরে টানা তিন ছক্কায় পঞ্চাশে পৌঁছে যান ২৯ বলেই। ৫০ বলে ৯৭ রানের জুটি থামান সাকলাইন। ২৬ লে ৪৫ রান করে থার্ড ম্যান সীমানায় ধরা পড়েন ডেভিড। এরপর রানের গতিতে একটু লাগাম দিতে পারে বাংলাদেশ। ১৫ ওভারের পর চার ওভারে রান আসে ৩১। এই সময়ে নিখিল চৌধুরিকে ফেরান নাসুম।
তবে প্রথম তিন ওভারে দারুণ বোলিং করা মুস্তাফিজ গড়বড় করে ফেলেন শেষ ওভারে। দুটি ছক্কায় ওভার থেকে ১৮ রান নিয়ে দুইশর কাছে যায় অস্ট্রেলিয়া। বাংলাদেশের রান তাড়া শুরু হয় বিধ্বংসী ব্যাটিংয়ে। প্রথম তিন ওভারেই ৪২ রান তুলে ফেলেন তানজিদ হাসান ওসাইফ হাসান। এই জুটি ভাঙেন এই সফরে অস্ট্রেলিয়ার অব্যর্থ অস্ত্র ম্যাট রেনশ। ১৫ বলে ৩০ রানে ফিরতি ক্যাচ দেন তানজিদ।
তবে বাংলাদেশের রানের রাশ টেনে ধরতে পারেনি অস্ট্রেলিয়া। পাওয়ার প্লেতে রান আসে ৭২। ক্যারিয়ারে অনেকবারের মতো আবারও শুরুটা ভালো করে উইকেট বিলিয়ে ফেরেন সৌম্য সরকার (৯ বলে ১৫)। কিন্তু পারভেজ ক্রিজে গিয়ে নতুন করে দম দেন ইনিংসে। টানা দুটি ছক্কা মারেন তিনি অ্যাডাম জ্যাম্পাকে। পাত্তা দেননি তিনি আগের ম্যাচে দারুণ বোলিং করা জোয়েল ডেভিসকেও। ১০ ওভারে একশ পেরিয়ে যায় দল।
বড় শটের চেষ্টাতেই শেষ হয় পারভেজের ইনিংস (২২ বলে ৩৬)। জুটি থামে ৬ ওভারে ৫৩ রান তুলে। পরের ওভারে ডেভিসের ওয়াইড ডেলিভারিতে বাজে শটে উইকেট হারান সাইফ (৩৩ বলে ৪২)। ফিনিশিংয়ের ভরসা শামীম হোসেন ৮ বল খেলে করতে পারেন ৭ রান।
এরপর হৃদয় (২২ বলে ৩৫) চেষ্টা করেছেন দলকে লড়াইয়ে রাখার। কিন্তু অপর প্রান্তে সাকলাইন পারেননি সময়ের দাবি মেটাতে। ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় টি২০ খেলতে নামা অলরাউন্ডার ১১ বল খেলে করতে পারেন ১৩ রান।
সিরিজের শেষ ম্যাচ রোববার এই মাঠেই।
সংক্ষিপ্ত স্কোর:
অস্ট্রেলিয়া: ২০ ওভারে ১৯৬/৫ (ইংলিস ১১, মার্শ ২০, কনোলি ১, রেনশ ৮৯*, ডেভিড ৪৫, নিখিল ৮, ডেভিস ১৩*; নাসুম ৪-০-২৭-০, সাকলাইন ৪-০-৫৩-১, নাহিদ ৪-০-৩৬-১, মুস্তাফিজ ৪-০-৩৪-১, রিশাদ ৪-০-৪৬-০)
বাংলাদেশ: ২০ ওভারে ১৮৯/৬ (তানজিদ ৩০, সাইফ ৪২, সৌম্য ১৫, পারভেজ ৩৬, হৃদয় ৩৫, শামীম ৭, সাকলাইন ১৩*; হার্ডি ৪-০-৪০-২, জনসন ২-০-৩৯-০, এলিস ৪-০-২৭-০, রেনশ ২-০-১৩-১, জ্যাম্পা ৪-০-৩৯-১, ডেভিস ৩-০-২১-১, নিখিল ১-০-৭-০)।
ফল: অস্ট্রেলিয়া ৭ রানে জয়ী।
সিরিজ: তিন ম্যাচ সিরিজে অস্ট্রেলিয়া ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে।
ম্যান অব দা ম্যাচ: ম্যাট রেনশ।